শ্রীশ্রীমা
………
( ২ )
আমার সঙ্গে কোন ভক্তের পরিচয় ছিল না ।তাই নীরবে অধীর প্রাণে প্রার্থনা রত হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম । পূর্বের দর্শনের কথাই বিশেষ মনে আনাগোনা করছিল ।
একি দেখলুম ! কে এই জ্যোতির্ময়ী দেবী , যিনি আমাকে ছোট্ট শিশু সন্তান রূপে কোলে নিয়ে আদর করেছিলেন ! তিনি কোথায় গেলেন ! আর তো দেখতে পাইনা ! তাঁর অভাব বোধ মন কে খুব পীড়িত করল ।
এদিকে ভক্ত রা বলাবলি করতে লাগল— মা পুরুষ ভক্ত দের সাথে কথা বলেন না , ইত্যাদি । আমি নতুন গিয়েছি , এসব কিছুই জানিনা , তাই শুধু শুনে যাচ্ছি । মনে একমাত্র আকাঙ্ক্ষা — আহা ! মা যদি আমার সাথে একটু কথা বলেন । আমি তো মা বলে ডাকব , তিনি কি সাড়া দেবেন না ? একটা কথাও বলবেন না ? মন এ-চিন্তায় শতধা দ্বিখণ্ডিত হচ্ছিল ।
আমি আপন চিন্তায় মগ্ন হয়ে চুপচাপ বসে ছিলাম । এমন সময় দেখা গেল ভক্তদের মধ্যে সাড়া পড়ে গিয়েছে ।উপরে উঠার সিঁড়ির দিকে সবাই চলেছেন সারিবদ্ধ ভাবে । সিঁড়ি পর্যন্ত গিয়ে সকলে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন । আমি পড়ে গেলাম সকলের পিছনে । সকলের শেষে আমি প্রণাম করব । শেষ টায় আবার ভয় হল — মা যদি ততক্ষণে চলে যান , যদি প্রণাম করতে না পারি ! কিন্তু তখন আর এগিয়ে অন্যরকম কিছু করার উপায় ছিল না । ঐ লাইনে সকলের পিছনে চুপচাপ প্রার্থনা রত হয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছি ।
ভোরবেলায় যে জ্যোতির্ময়ী মূর্তির দর্শন পেয়েছিলাম তিনি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন চিন্তার মধ্যে । ভক্ত সঙ্গে এগিয়ে চলেছি মাতৃ দর্শনে । ক্রমে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে দেখা গেল একটি ঘরের দরজার চৌকাঠের সামনে এক-একজন ভূমিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করছে এবং অন্য দিক দিয়ে নেমে যাচ্ছে । এগিয়ে চলেছি — আমার পিছনে আর কেউ নেই ।
ঘরের দরজার সামনে প্রণামের স্থানে এসে দেখি শ্রীশ্রীমা আপাদমস্তক এক খানি গরদের সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে অবগুণ্ঠিতা হয়ে বসে আছেন — শ্রীশ্রী মায়ের মুখও দেখা যায় না ,সবই ঢাকা । মনটা দমে গেল –অপেক্ষা করার সময় ছিলনা । আমি নতজানু হয়ে ভূমিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলাম । হয়তো এক মিনিট মাথা নিচু করে ছিলাম — চোখ ভরা জল ।
মাথা তুলতেই দেখি মা চাদর টি সম্পুর্ন সরিয়ে দিয়েছেন , মুখে অবগুণ্ঠনও নেই । সস্নেহে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে ।
একি দেখছি ! ভোরবেলায় যাঁকে ধ্যানে দেখেছি তিনি ই তো বসে আছেন আমার দিকে সস্নেহে তাকিয়ে । আনন্দে বিহ্বল হয়ে গেলাম । তাঁর পাদস্পর্শ করতে হাত বাড়াতেই মা হাসি মুখে আমার চিবুক ধরে চুমু খেলেন এবং মুখে হাত বুলিয়ে আমার চোখের জল মুছিয়ে দিলেন । আর মধুর স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন , ” বাবা , প্রসাদ খেয়েছ ?” আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু বললাম , ‘ হাঁ ” মা ” খেয়েছি ‘ ।
” তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হল তো ? খুশি হলে তো ? ” পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন । ব্যাস এই দুটি মাত্র কথা ।
” স্বামী অপূূর্বানন্দ”
