স্বামীজীর পত্র

মায়ার সংসারে কর্ম কোলাহলে
শ্রীপদ দুখানি রয়েছি যে ভুলে
বিবেক বৈরাগ্য তুমি নাহি দিলে
মোহ ভ্রান্তি কিসে কাটিবে ।
স্বামীজীর লেখা এই পত্র খানি আমার বড় প্রিয়…
(জনৈক আমেরিকান বন্ধুকে লিখিত)
আলামেডা, ক্যালিফোর্নিয়া,
১২ই এপ্রিল, ১৯০০
  … ‘মা’ আবার প্রসন্না হচ্ছেন; অবস্থা অনুকূল হয়ে আসছে – তা হতেই হবে।
   কর্ম চিরকালই অশুভকে সঙ্গে নিয়ে আসে। আমি নিজ স্বাস্থ্য হারিয়ে সঞ্চিত অশুভরাশির ফলভোগ করেছি। এতে আমি খুশি, এতে আমার মন হালকা হয়ে গেছে – আমার জীবনে এমন একটা স্নিগ্ধ কোমলতা ও প্রশান্তি এসেছে, যা এর আগে কখনও ছিল না।
   আমি এখন কেমন করে একই কালে আসক্ত ও অনাসক্ত থাকতে হয়, তাই শিখছি এবং ক্রমশঃ নিজের মনের উপর আমার প্রভুত্ব আসছে।
   মায়ের কাজ মা-ই করছেন; সেজন্য এখন বেশি মাথা ঘামাই না। আমার মতো পতঙ্গ প্রতি মুহূর্তে হাজার হাজার মরছে; কিন্তু মায়ের কাজ সমভাবেই চলেছে। জয় মা… মায়ের ইচ্ছাস্রোতে গা ভাসিয়ে একলা আজীবন চলে এসেছি। যখনই এর ব্যতিক্রম করেছি, তখনই আঘাত পেয়েছি। মায়ের ইচ্ছাই পূর্ণ হোক।…
   আমি সুখে আছি, নিজের মনের সব দ্বন্দ্ব কাটিয়ে শান্তিতে আছি; আমার অন্তরের বৈরাগ্য আজ আগের চেয়ে অধিক সমুজ্জ্বল। আত্মীয়স্বজনের প্রতি ভালবাসা দিন দিন কমে যাচ্ছে, আর মায়ের প্রতি আকর্ষণ ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে।
   দক্ষিণেশ্বরের বটবৃক্ষমূলে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে সেই যে আমরা দীর্ঘ রাত্রি জেগে কাটাতাম, তারই স্মৃতি আবার মনে জাগছে। আর কর্ম? কর্ম আবার কি? কার কর্ম? আর কার জন্যই বা কর্ম করব?
   আমি মুক্ত। আমি মায়ের সন্তান। মা-ই সব কর্ম করেন, সবই মায়ের খেলা। আমি কেন মতলব আঁটতে যাব? আর কি মতলবই বা আঁটব?
   আমার পরিকল্পনার অপেক্ষা না রেখেই মা-র যেমন অভিরুচি, তেমনি ভাবে যা কিছু আসবার এসেছে ও চলে গেছে। মা-ই তো যন্ত্রী, আমরা তাঁর হাতের যন্ত্র ছাড়া আর কি?
আয়ু সূর্য মোর বসিতেছে পাটে
কোথা ব্রহ্মময়ী এসো তুমি ছুটে
তনয়ে তারো মা এ ঘোর সংকটে
তুমি বিনে কে আর তরিবে
কোথা ভবদারা দুর্গতি হরা
কতদিনে তোর করুণা হবে ।।
কবে দেখা দিবি কোলে তুলে নিবি
সকল যাতনা জুড়াবে….

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started