Kolpotaru Sri Ramkrishna swami chetonananda II *রহস্যময় কল্পতরু(১)*

*রহস্যময় কল্পতরু(১)*
     পয়লা জানুয়ারি। কল্পতরুর মেলা বসেছে। চারদিকে হৈ চৈ। ঈশ্বর কল্পতরু। তাঁর কাছে বাসনা পূরণ করতে এসেছে মানুষ বহু দূর থেকে। মেলার মাঠের এক কোণে এক বিরাট আমগাছ। সেই গাছের তলায় বসে এক ভূয়োদর্শী কথক কল্পতরুর ইতিকথা বলে চলেছেন। তাঁর কেশ শুভ্র, বর্ণ গৌর, চর্ম কুঞ্চিত, গলায় কন্ঠি, মুখে মধুর হাসি।
      কথক গল্প শুরু করলেন :
       আজকের প্রসঙ্গ— রহস্যময় কল্পতরু। এ এক অচিন গাছ। কেউ দেখেনি। তবে লোকে শুনেছে — এ গাছের কাছে যে যা চায় তাই পায়। এ এক মজার ব্যাপার। বছরে একদিন এ সুযোগ আসে। সারা বছর মানুষ ঐ দিনটির জন্য আশায় বুক বেঁধে বসে থাকে।
      সৃষ্টির প্রারম্ভে স্রষ্টার বুকে জেগেছিল বাসনা। তিনি বাসনা নিয়ে বহুভাবে লীলা করে মানুষকে দিলেন সেই চঞ্চলা বাসনা। আর নিজে রইলেন ‘অকাম, নিষ্কাম, আপ্তকাম, আত্মকাম’ হয়ে। মানুষকে বললেন, “এবার তোমরা, বাসনা নিয়ে খেল। খুব মজা পাবে। আমি নিজের জন্য একটুও বাসনা রাখলাম না , সব তোমাদের দিয়ে ফতুর হলুম। আমি যদিও বাসনাশূন্য তবুও আমি বাসনার ঈশ্বর।আমি কল্পতরু। “
      বাসনা মায়াবী, ছলনাময়ী।  তার আদি নেই, অন্ত নেই। মানুষ বৃদ্ধ হলেও সে বৃদ্ধ হয় না। সে চির যৌবনা। সে তুফানী। সে মানবমনে তুফান তুলে হেলে দুলে নাচতে ভালোবাসে। বাসনা-মদিরা পান করে মানুষ কেবল বলে — দাও আরো দাও।রূপযৌবন দাও। টাকাকড়ি দাও। বাড়িগাড়ি দাও। ভোগ্যবস্তু দাও। নীরোগ শরীর দাও। মনোরমা ভার্যা দাও। রূপবান স্বামী দাও। সুখ দাও। সন্তান দাও।
     বাসনার ফর্দ নিয়ে মানুষ যায় মন্দিরে। দেখ গিয়ে তারকেশ্বরে। শিবের মন্দিরের চিরিদিকে ঝুলছে। ইট-পাথরের ডেলা। এগুলি আর্ত ও অর্থার্থীর প্রার্থনা। গলায় দড়ি দিয়ে দুলছে। মন্দিরের পাথুরে মেঝেতে দুমদাম মাথা ঠোকার শব্দ হচ্ছে। ওসব চন্ডীর নীরব মন্ত্র– ‘রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি!’
   এ কথা বলে কথক গল্পরতা দুই আধুনিকার দিকে তাকিয়ে একটু কটাক্ষ করলেন।
      কল্পলতা — এই হেমা, চল এখান থেকে। ঢের হয়েছে। আমরা সাধারণ সংসারী, আর কামনাবাসনা নিয়েই মানুষের জীবন। আমাদের ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলে গেছেন — ঈশ্বর কল্পতরু। তাঁর কাছে চাইতে হয়। তিনি মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন। তাঁর কাছে চাইব ছাড়া কি বামুনপাড়ার লোকের কাছে চাইব? চল ঐ প্যান্ডেলে গিয়ে একটু কীর্তন শুনি।
       হেমাঙ্গিনী— বোস না রে আর একটু।কীর্তন তো অনেক শুনেছি। আজ বিশেষ দিনে একটু রহস্যময় কল্পতরুর কথা শোনা যাক।
      কথক— এ কথা ঠিক শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ভগবান কানখড়কে। সব শোনেন। তাঁর কাছে যে যা আন্তরিক প্রার্থনা করে সে তাই পায়। আবার সাবধান করে দিয়েছেন, কল্পতরুর কাছে যা তা চাইলে বিপদে পড়তে হবে।
      একবার এক পথিক মরুপথে চলতে চলতে তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত হয়ে পড়ল। পথ পার্শ্বে একটা গাছ দেখে সে বসে পড়ল।
      সে ভাবতে লাগল: এ সময় কেউ যদি একটু ঠান্ডা জল ও খাবার দেয় তবে প্রাণটা বাঁচে। অমনি একটা লোক জল ও খাবার এনে দিল। পথিক খুব খুশি। তার পা দুখানি ব্যথায় টনটন করছিল। তার মনে জাগল– এ সময় যদি কোন নারী এসে একটু পা টিপে দেয় তো একটু সুখে নিদ্রা যাই। ক্লান্তিটাও চলে যাবে। অমনি এক যুবতী এসে তার পদসেবা করতে শুরু করল। পথিক আনন্দে আটখানা। এ তো তাজ্জব ব্যাপার। যা ভাবি তাই এসে যাচ্ছে। সে শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল— এ সময় যদি একটা বাঘ এসে পড়ে তা হলে কি হবে? অমনি একটা বাঘ এসে পথিককে খেয়ে ফেলল।
       এসব রহস্যময় কল্পতরুর খেলা। সংসারী মানুষ ঈশ্বরের কাছে বিষয়, ধন, জন, মান,যশ চাইছে এবং পাচ্ছে ; কিন্তু শেষে রয়েছে বাঘের ভয় অর্থাৎ রোগ, শোক, তাপ, অপমান, দুশ্চিন্তা। চিতা মানুষকে একবার পোড়ায়, কিন্তু দুশ্চিন্তা অহরহ দগ্ধ করে।
        নিখিলবাবু কথকের কথা অন্যমনস্ক হয়ে শুনছিলেন। তিনি বই খুলে ঠাকুরের কল্পতরু হওয়ার কাহিনিটা একটু ঝালাই করে নিচ্ছিলেন। তাঁর মনে উঠল– আজকের এই শুভ দিনে ঠাকুর বলেছিলেন,  “চৈতন্য হোক।” তাতে কত লোকের ভাব,  সমাধি, দর্শন হয়েছিল। আজ যদি রহস্যময় কল্পতরুর কাছে ‘ অহর্নিশ ব্রহ্মসুখে রমন্তঃ’ হবার ইচ্ছাটা প্রকাশ করি তো বেশ হয়।
     কথক– শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন সমাধির যাদুকর। নিজে তিনি দিন রাত ভাবে গর্গর মাতোয়ারা হয়ে থাকতেন এবং কেউ চাইলে স্পর্শ দ্বারা বা জিভে মন্ত্র লিখে সমাধি করিয়ে দিতে পারতেন। সাধারণ সাধক নিজে অনুভব করেন, কিন্তু অপরকে অনুভূতি করিয়ে দিতে পারেন না।
      মথুর একদিন আব্দার করে ঠাকুরের কাছে ভাবসমাধি চায়। ঠাকুর বললেন— তুমি তো বেশ সেবা করছ এবং মায়ের পাদপদ্মে ভক্তিও আছে। ঐ নিয়ে থাক।
         মথুর নাছোড়বান্দা। শেষে কয়েকদিন পর তার ভাব হলো। তার চোখ দু টি জবাফুলের মতো লাল হলো,  বুক থরথর করে কাঁপতে লাগল, ঈশ্বরীয় কথা কইতে কইতে কান্না। সে তিনদিন বেহুঁশ হয়ে রইল। যেন ভূতে পেয়েছে। কাজকর্ম কিছুই করতে পারল না। অবশেষে শ্রীরামকৃষ্ণেরর পায়ে ধরে বলল, “বাবা, ঘাট হয়েছে। তোমার ভাব তুমি ফিরিয়ে নাও, আমার চাইনে। ” ঠাকুর বুকে হাত বুলিয়ে ভাব প্রশমন করে দিলেন।
         
              শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে
                 স্বামী চেতনানন্দ

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started