"মায়া বই কি! মায়া না হলে আমার এ দশা কেন? আমি বৈকুণ্ঠে নারায়ণের পাশে লক্ষ্মী হয়ে থাকতুম। ভগবান নরলীলা করতে ভালবাসেন কিনা!"*

*- :      শ্রী শ্রী মায়ের জীবনকথা      : -*

*”ওঁ যথাগ্নের্দাহিকা শক্তিঃ রামকৃষ্ণে স্থিতা হি যা।*
*সর্ববিদ্যাস্বরূপাং তাং সারদাং প্রণমাম্যহম।।”*
   আরও আগের কথা – ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের ১ ফেব্রুয়ারি। শ্রীমা জয়রামবাটীতে আছেন।
   ভক্ত জানিতে চাহিলেন যে ঠাকুর সনাতন পূর্ণব্রহ্ম কিনা। মা তাহা সমর্থন করিলে ভক্ত আবার বলিলেন, “তা প্রত্যেক স্ত্রীলোকেরই স্বামী পূর্ণব্রহ্ম সনাতন। আমি সেভাবে জিজ্ঞাসা করছি না।” মা উত্তর দিলেন, *”হ্যাঁ, তিনি পূর্ণব্রহ্ম সনাতন – স্বামী ভাবেও, এমনি ভাবেও।”*
   ভক্ত তখন ভাবিতেছেন, সীতারাম বা রাধাকৃষ্ণ যেমন অভিন্ন, ঠাকুর এবং মাও তেমনি অভিন্ন, অথচ সম্মুখে দেখিতেছেন মায়ের লোকোচিত ব্যবহার।
   মনের সন্দেহ মিটাইবার জন্য তিনি বলিতেছেন, “তবে যে তোমাকে এই দেখছি যেন সাধারণ স্ত্রীলোকের মতো বসে রুটি বেলছ, এসব কি? মায়া, না কি?”
   মা বলিলেন, *“মায়া বই কি! মায়া না হলে আমার এ দশা কেন? আমি বৈকুণ্ঠে নারায়ণের পাশে লক্ষ্মী হয়ে থাকতুম। ভগবান নরলীলা করতে ভালবাসেন কিনা!”*
   আবার প্রশ্ন হইল, “তোমার কি আপনার স্বরূপ মনে পড়ে না?” তদুত্তরে মা বলিলেন, *”হ্যাঁ, এক একবার মনে পড়ে; তখন ভাবি, এ কি করছি! এ কি করছি! আবার এইসব বাড়ি-ঘর ছেলেপিলে (সামনের সব দেখাইয়া) মনে আসে ও ভুলে যাই।”*
   আবার তিনি যে স্বেচ্ছায় মায়াবরণ স্বীকার করিয়াছেন ইহা তাঁহার জানাই ছিল; তাই এক এক সময় বলিতেন, *”এতো একটা মোহ নিয়ে আছি, এ একটা মায়া নিয়ে আছি বই তো নয়।”*
   অবতারলীলা মানবসদৃশ হইলেও, উহা ঠিক মানবের দৈনন্দিন কার্যাবলীর সহিত তুলিত হইতে পারে না; কেননা অনেকাংশেই উহা অন্যরূপ।
   শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী পাঠ করিলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, যদিও তিনি মুহুর্মুহু সমাধিস্থ হইতেন, তথাপি ব্যুত্থিতাবস্থায় তাঁহার প্রতিকার্যে একটা সৌষ্ঠব ও সুশৃঙ্খলা ছিল।
   জনকল্যাণ ও লোকশিক্ষার্থে ধৃতবিগ্রহ পুরুষোত্তমের জীবনের সর্বক্ষেত্রই অপরের পক্ষে আদর্শস্থানীয় ছিল – বর্তমান কালে যুগাবতারের ইহা এক মহা অবদান।
   শ্রীমায়ের জীবনী আলোচনা করিলেও আমাদের মনে পুনঃ পুনঃ এই কথাই উদিত হয়। শুধু তাহাই নহে, আমাদের ইহাও মনে হয় যে, শ্রীরামকৃষ্ণ চরিত্রে যেমন দৈনন্দিন জীবনের উপযুক্ত অসাধারণ আদর্শের অভাব না থাকিলেও আধ্যাত্মিকভাব, মহাভাব ইত্যাদি অবিরাম প্রকটিত হইয়া আধুনিক জড়বাদসর্বস্ব মানবকে সবলে ভগবদভিমুখ করিয়াছে, শ্রীমায়ের জীবনে তেমনি চরম সমাধি, ত্যাগবৈরাগ্য ও ভাবগাম্ভীর্যের বিন্দুমাত্র ন্যুনতা না থাকিলেও তাঁহার চরিত্রে স্নেহ, সেবা, ঔদার্য, লজ্জা, বিনয় প্রভৃতি গুণরাজি অপূর্বভাবে প্রকাশ পাইয়া ভোগলোলুপ ব্যক্তিতন্ত্র লোকসমাজে এক নবীন প্রেরণা আনয়ন করিয়াছে। ফলত একটু অনুধাবন করিলেই দেখিতে পাওয়া যায় যে সাধারণ মানব আপনাকে লইয়াই বিব্রত; কিন্তু দেবমানবের সবটুকু জীবন পরার্থে।
*”জননীং সারদাং দেবীং রামকৃষ্ণং জগদ্‌গুরুম্।*

*পাদপদ্মে তয়ো শ্রিত্বা প্রণমামি মুহুর্মুহুঃ।।”*

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started