–কেউ কখনো সন্ধ্যায় বেলুড় মঠে গেলে দূর থেকে শুনতে পাবেন—শ্রবণ-সুখকর একটি সঙ্গীতধ্বনি ভেসে আসছে।’
খণ্ডন ভব-বন্ধন জগ-বন্দন বন্দি তোমায়।’ রোজই সন্ধ্যারতির সময় বেলুড় মঠে, রামকৃষ্ণ সংঘের সব শাখা কেন্দ্রে ও শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্ত-সংঘ গুলিতে, সর্বত্র সন্ধ্যা সমাগমে এই গীত পরিবেশিত হয়।স্বামী বিবেকানন্দ নিজেই ধ্যানবুত্থিত চিত্তে এই স্তবটি রচনা ও সুরারোপ করেছেন। এই অনবদ্য আরাত্রিক ভজনটির একটি সুন্দর ইতিহাস আছে।—– স্বনামধন্য নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ স্বামীজিকে বারংবার অনুরোধ করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের একটি প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থ লেখার জন্য। কিন্তু স্বামীজির ওপর ঠাকুর তো অন্য দায়ভার চাপিয়েছিলেন।স্বামীজি অবশ্য গিরিশের অনুরোধ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অন্য যুক্তি দেখিয়েছিলেন।বলেছিলেন–” তিনি(শ্রীরামকৃষ্ণ) এত মহান ছিলেন, এত বড় ছিলেন যে আমি তাঁকে কিছুই বুঝতে পারিনি।…. শেষে শিব গড়তে বানর গড়ে ফেলব? তা আমি পারব না।” বাক্যমনাতীত-কে শব্দের মধ্যে কি বাঁধা যায়? কিন্তু আক্ষরিক অর্থে স্বামীজি শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী রচনা না করলেও সূত্রাকারে সেই অসীমকে সীমার মধ্যে বেঁধে ফেললেন যে!তত্ত্ব-সম্পৃক্ত স্তবগানের সুরের তরঙ্গে অনন্তকে করলেন ব্যক্ত মানবীয় ভাষায়। এ যেন ‘জগতে আনন্দ-যজ্ঞে’ স্বামীজির দিব্যাহুতি।——— আলমবাজার থেকে মঠ যখন উঠে এল বেলুড় নীলাম্বর মুখার্জীর বাগানবাড়িতে তখন সন্ধ্যারতির সময় মৃদঙ্গ-সহ শিবস্তুতি গীত হতো———— “ভজ শিব ওঙ্কার, জয় শিব ওঙ্কার~~ নাথ ভোলে মহাশম্ভো, হর হর মহাদেব।~~~~~ ব্রহ্মা বিষ্ণু সদাশিব,হর হর মহাদেব।।”——— কিছুদিন পর স্বামীজি রচনা করলেন মাত্র প্রথম দুটি পঙতি—“খণ্ডন ভব-বন্ধন জগ-বন্দন বন্দি তোমায়। নিরঞ্জন নররূপধর নির্গুণ গুণময়।।” ——এবং শেষাংশ– নমো নমো প্রভু বাক্যমনাতীত মনোবচনৈকাধার। জ্যোতির জ্যোতি উজল হৃদিকন্দর, তুমি তমোভঞ্জনহার।।~~ধে ধে ধে লঙ্গ রঙ্গ ভঙ্গ বাজে অঙ্গ সঙ্গ মৃদঙ্গ। ~~গাইছে ছন্দ ভকতবৃন্দ আরতি তোমার।~~জয় জয় আরতি তোমার/হর হর আরতি তোমার/শিব শিব আরতি তোমার।। সেটি ছিল ১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দ। কিন্তু শশী মহারাজ অর্থাৎ স্বামী রামকৃষ্ণানন্দজী দীর্ঘক্ষণব্যাপী দৃপ্তভঙ্গীতে নৃত্যসহ আরতি করতেন।এই সংক্ষিপ্ত ভজনটি পর্যাপ্ত বোধ না হওয়ায় স্বামীজি প্রথম শ্লোকের সঙ্গে আরও সাতটি শ্লোক জুড়ে একটি অষ্টপদী রচনা করলেন। একদিন শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মতিথিপূজা উৎসবে স্বামীজী স্বয়ং মৃদঙ্গ বাজিয়ে এই আরাত্রিক ভজন গাইলেন। ~~~~~~~~~ আজ স্বামীজির জন্মদিন। এই শুভদিনটিতে আমরা সেই দৃশ্যটির ধ্যান করার চেষ্টা করি,— স্বামীজি মৃদঙ্গ বাজিয়ে গাইছেন—-খণ্ডণ ভব-বন্ধন জগ-বন্দন বন্দি তোমায়………..। আর শশী মহারাজ অপূর্ব নৃত্যের সঙ্গে প্রভু শ্রীরামকৃষ্ণের আরতি করছেন।——- জয় শ্রীরামকৃষ্ণ।জয় শ্রীশ্রী মা সারদাদেবী। জয় স্বামী বিবেকানন্দ।জয় শ্রীরামকৃষ্ণের সকল পার্ষদবৃন্দ।। ——(সংগৃহীত)।।—-
