CHATAK MAKOR Sankranthi II চটক মকর সংক্রান্তি

★★★ চটক মকর সংক্রান্তি ★★★*********************************

সকাল থেকে মোবাইলটা চটচট করছে।

ওটাকে বন্ধ করে মান্ধাতার আমলের একটা ডাইরী আর কলম নিয়ে বসেছি। মকরসংক্রান্তিতে কিছু একটা লিখতে হবে!

সেদিনের, মানে, তখন আমার বয়স বারো/তেরো হবে। একসপ্তাহ আগে থেকে মা আতপচাল ভিজিয়ে, তাকে ছেঁকে, গামছায় বেঁধ, টাঙিয়ে রাখত। সারাদিন পরে ভিজে চাল শিলে বেটে, মানে, গুঁড়ো করে, চালের আটা বানিয়ে রাখতো। আজকেরদিনে পিঠে……
-হা হা হা!  শুনছো, তোমার ছেলের কথা?!(কোন গন্ডগোল হলেই ‘আমার ছেলে’! ভাল কিছু বললে বা করলে তখন, ‘আমার”ছেলের কান্ড দেখ।’) যাকগে-
-কি শুনব? (লেখা মাথায়!)
-বলে, মা, একদিন আমাকে ‘রবীন্দ্র কালামান্ডী’ নিয়ে যাবে? হা হা হা…..
-মানে?
-মানে, তোমার পুত্রই জানে?
-কিরে, বাবা?
-হাসছো কেন? এইতো লেখা আছে, RABINDRA KALAMANDIR.
-হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ (আবার ফোনটা বাজছে)
-বলো!? (আমার শালী!)…পরে ফোন করছি।…
আজকেরদিনে পিঠে বানানোর জন্য শপিং মলে রেডিমেড্ চালের গুঁড়ো পাওয়া যায়। সবার শেষে খাওয়াদাওয়া সেরে মা, মুখে একটা পান গুঁজে শিলনোড়া নিয়ে বসতো। আজ অবশ্য মিক্সিও আছে। ঘন্টা তিনেক লড়াই করার পর যখন অন্ধকার হয়ে আসতে, আমার ওপর হুকুম, “দুপুরে তো একটুও ঘুমোলি না। স্কুলতো ছুটি। সন্ধ্যে হয়ে আসছে, গরুগুলো তো আনতে হবে…!” আমি মাঠ থেকে গরু এনে জাবনা দিয়ে যখন পড়তে বসবো, মা তখন গা-ধুয়ে লালপাড়ের একবস্ত্রে সন্ধ্যা প্রদীপ দেখাচ্ছে। আমাদের ভাইবোনদের দাঁড় করিয়ে প্রদীপ দেখাতো। আমরা নামেই পড়তে বসতাম। সংক্রান্তির দিন বাড়িতে লক্ষ্মী পুজো। ঐ দিন কতকিছু নতুন রান্না হবে। সব নতুন জিনিস। মানে, নতুন চাল, নতুন গুড়, নতুন হাঁড়ি(মাটির) নতুন ধান, নতুন গোলা, নতুন আল্পনা….

(কয়েকটা নোটিফেকেশান)

“মকর সংক্রান্তির পিঠে পায়েস পাঠালাম”
“পৌষপার্বণের শুভেচ্ছা”
“মকরসংক্রান্তির অভিনন্দন”
“পিকনিকে হেব্বি মস্তি..”

“রসে ভরা পিঠে পায়েস/খাও তুমি করে আয়েস”
রাগবো? না হাসবো? না কাঁদবো? না ফোনটাই ভেঙ্গে ফেলবো!? যেকটা এই সব মেসেজ পাঠিয়েছে, একটাও পিঠে কখনো দেখেছে কিনা (মানে, দোকান থেকে কেনার কথা বলছি না।) কে জানে?! ফেসবুক আর নেটের দৌলতে তিনদিন আগে থেকেই শুভেচ্ছার কাঁড়ি। সব “ইন্ এ্যাডভান্স”! কেনরে বাবা রোজই তো অন হচ্ছিস! কি যেন লিখছিলাম…..?”
নতুন আল্পনা।

একবার, মনে আছে, আমি বোন(ঐ… ১৩/১৪ বছর বয়স হবে) বায়না করলাম পুলি পিঠে বানাবো। মা তো হেসেই খুন। “রুটি বেলতে পারিস না, নারকেল কুড়তে পারিস না, ফ্যান গালতে পারিস না, পিঠে বানাবি?” তবু বায়না। দিল একটা চালের গুঁড়ির দলা। সে আবার কত কায়দা। ফুটন্ত জলে মাখতে হবে। মাখার পর ভুল করেও ডিঙ্গোনো যাবে না। গরম থাকতে থাকতে পিঠে বানাতে হবে। সব দেখছি। সেদিন দুপুর থেকে বাবাও হাত লাগিয়েছিল “চুষি” বানাতে। তাকে আবার রোদে শোকাতে হবে। ১০ গ্রাম চালের আটা দিয়ে এককৌট চুষি। আজকে ক’জন চুষি বানায় জানি না। আমিও বানাতাম। তবে সে চুষি পাতে…
আবার কি এলো?!

  1. একবাটি পায়েস/
  2. পাটিসাপটা
  3. চন্দ্রপুলি/
  4. /গোকুলপিঠে
  5. /রসবড়া/
  6. পায়েসপুলি/
  7. মালপোয়া/
  8. আসকে পিঠে/
  9. পাটালী……

সব মকরসংক্রান্তির সরস শুভেচ্ছা। ছবিতে।
শালা মাথটা না গরম হয়ে….
-শুনছো?
-বলে ফেলো।
-লেখা লিখি থামাও। দেখতো একটা নারকোল পাও কিনা। গাছেরগুলো তো পাঁচভূতে খাচ্ছে। ২/১ টা কিনেই..

  1. -সে তো গিয়ে নিয়ে এলেই হয়। তোমরাই তো গ্রামের বাড়ি…
  2. -বাজে বোকো না। একটুও সময় পাই!?
  3. -থাক আর খেপতে হবে না। আর কি আনতে হবে?
  4. -ওটুকু এনেই উদ্ধার করো।
  5. -একটু দাঁড়াও, যাচ্ছি।
যা বলছিলাম, মানে লিখছিলাম..
সে চুষি পাতে দেওয়ার মতো নয়। তবুও বাবা সাপোর্ট করত। মাকে বোঝাতো, “করুক না। আজ খারাপ হচ্ছে, কাল তো ভাল হবে! আর তুমিও কি পেট থেকে পড়েই শিখেছিলে!?”

  1. আজকাল তো পিঠে/
  2. মালপোয়া/
  3. পাটিসাপটা/
  4. সরুচাগলি/
  5. গুড়পিঠে/
  6. ভাজা পিঠে এমনকি দুধপুলি/
  7. রসবড়া/

আস্কে সব রেডিমেড বিক্রি হয়। ঐ যে বলছিলাম না…
মোবাইলটা চটচট করছে! এই সব রসালো ছবির গুঁতোয় হয়েছে। “চাটু যেন নাহি জানে পিষ্টকের স্বাদ!” তেমন আরকি। দু’দিন আগে থেকে(সবেই এ্যাডভান্স!) দায়সারা শুভেচ্ছা জানানো। কে/কাকে আগে ‘উইশ্’ করবে। হ্যাপা বলতে তো ফ্রী ‘ওয়াই ফাই’/জিও নেট্/নিদেনপক্ষে নেট্ কানেকশান্। না-থাকলেই মাটি।
সারা বাঙালী সম্প্রদায় অন্যান্য অনুষ্ঠানের মতো মকরসংক্রান্তিও ঘটা করে উদযাপন করছে। তখন একসংসারের ৫-১৫ জনের দাপটে ঘরদোরে দক্ষযজ্ঞ বেঁধে যেত। এখন ৫-১৫ হাজার ‘ফ্রেন্ড্’কে কাঁড়িকাঁড়ি খেজুর গুড়ের প্রোডাক্ট্ পাঠিয়েও চুলের ক্লিপটাও সরে না।
বলি বাঙালী প্রযুক্তির গড্ডালিকায় ভাসছে, যুগের সাথে তাল মেলাতে দরকারও আছে। তা’বলে, নিজের ঐতিহ্য কি সব ভুলে গেল?
নাকি আজও চলে-
চাল বাটা/পুলি বানানো/চুষি বানানো/বাউনি বাঁধা/আল্পনা? বা-
নারকোল কোরা/নতুন চাল/নতুন গুড়/নতুন উনোনের কাঠের জ্বালে চারপাশ ঘিরে অপেক্ষা? কখন নামবে ‘পিঠের ঝাঁপি’!

-কৈ গো বাজারের ব্যাগটা দাও।
-বাবা, ফাটাফাটি লিখেছো। কিন্তু ‘রবীন্দ্র কলামান্ডী’!?

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started