" দেখ গিরিশবাবু, মনে হয় এই জগতের দুঃখ দূর করতে আমায় যদি হাজারো জন্ম নিতে হয় তাও নেব। তাতে যদি কারও এতটুকু দঃখ দূর হয় তো তা করব।

বাগবাজারে বলরাম বসুর বাড়িতে স্বামীজীর সাথে শিষ্য শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীর শাস্ত্র আলোচনা চলছে। এমন সময় সেখানে উপস্থিত হলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ এবং আলোচনা শুনতে লাগলেন নিবিষ্টচিত্তে। এরপর গিরিশবাবু ও স্বামীজীর মধ্যে কিছু কথা হওয়ার পর গিরিশবাবু হঠাৎ করে স্বামীজীকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন – ” হ্যাঁ হে নরেন, বেদবেদান্ত তো ঢেপ পড়লে, কিন্তু এই যে দেশে ঘোর হাহাকার, অন্নাভাব, ব্যভিচার, ভ্রূণহত্যা, মহাপাতকাদি চোখের সামনে দিনরাত ঘুরছে, এর উপায় তোমার বেদে কিছু বলেছে? ঐ অমুকের বাড়ির গিন্নি, এককালে যার বাড়িতে রোজ পঞ্চাশখানি পাতা পড়ত, সে আজ তিন দিন হাঁড়ি চাপায়নি; ঐ অমুকের বাড়ির কুলস্ত্রী কে গুন্ডাগুলো অত্যাচার করে মেরে ফেলেছে; ঐ অমুকের বাড়িতে ভ্রূণহত্যা হয়েছে, অমুক জোচ্চুরি করে বিধবার সর্বস্ব হরণ করেছে – এ সকল রহিত করার কোন উপায় তোমার বেদে আছে কি? স্বামীজী নির্বাক, তাঁর চোখ ভরে এল জলে, মনের ভাব গোপন করতে তিনি উঠে চলে গেলেন। গিরিশবাবু শিষ্যকে বললেন – দেখলি বাঙাল, কত বড় প্রাণ ! তোর স্বামীজীকে কেবল বেদজ্ঞ পন্ডিত বলে মানি না ; কিন্তু ঐ যে জীবের দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল, এই মহাপ্রাণতার জন্য মানি। চোখের সামনে দেখলি তো মানুষের দুঃখকষ্টের কথাগুলো শুনে করুণায় হৃদয় পূর্ণ হয়ে স্বামীজীর বেদবেদান্ত কোথায় উড়ে গেল ।”
           এর কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে স্বামীজী গিরিশবাবুকে বললেন : ” দেখ গিরিশবাবু, মনে হয় এই জগতের দুঃখ দূর করতে আমায় যদি হাজারো জন্ম নিতে হয় তাও নেব। তাতে যদি কারও এতটুকু দঃখ দূর হয় তো  তা করব। মনে হয়, খালি নিজের মুক্তি দিয়ে কি হবে? সকলকে সঙ্গে নিয়ে ঐ পথে যেতে হবে । কেন বল দেখি এমন ভাব ওঠে? ”
             গিরিশবাবু – “তা না হলে আর তিনি (ঠাকুর) তোমায় সকলের চেয়ে বড় আধার বলতেন!”
         মানুষের জন্য স্বামীজীর হৃদয়ে সদা জাগ্রত ছিল এই বেদনাবোধ । পৃথিবীর যে প্রান্তেই থেকেছেন, ভারতের নিরন্ন, পিড়ীত, দূর্গত মানুষের কথা ভেবে গেছেন -এ যেন তাঁর নিজের দায়।

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started