একবার এক বিশেষ ঘটনা ঘটেছিল। মা কলকাতা থেকে দেশে এসেছেন। মায়ের জন্মতিথি পড়েছে। এদিকে সাধু, গৃহী ভক্ত সকলে মিলে মায়ের আবির্ভাব তিথিপূজার আয়োজন করছেন। আমি লোকমুখে সে-খবর পেলাম। কিন্তু
মঠ থেকে কোন নিমন্ত্রন এল না। মা-ও লোক পাঠালেন না অন্যবারের মতো। মনে ভারী অভিমান হলো। ভাবলাম, থাকগে – এবার আর যাব না মাকে দর্শন করতে। অনেক বড় বড় ভক্ত পেয়ে মা নিশ্চয় ভুলে গেছেন আমার মতো সামান্য ভক্তকে।
মঠ থেকে কোন নিমন্ত্রন এল না। মা-ও লোক পাঠালেন না অন্যবারের মতো। মনে ভারী অভিমান হলো। ভাবলাম, থাকগে – এবার আর যাব না মাকে দর্শন করতে। অনেক বড় বড় ভক্ত পেয়ে মা নিশ্চয় ভুলে গেছেন আমার মতো সামান্য ভক্তকে।
তখন পৌষ মাস। দারুণ শীত পড়েছে। সেদিন একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়েছি। গভীর রাত্রে স্বপ্ন দেখলাম, মা এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে যেন বলছেনঃ “রাজন, তোর জ্ঞান না শুনলে আমার তৃপ্তি হয় না রে!” ব্যাস। এই কথা বলেই তিনি যেন কোথায় অন্তর্ধান করলেন। ঘুম ভেঙ্গে গেল। মনে হলো, মা স্বয়ং এসে নিমন্ত্রণ করে গেলেন। আমাকে যেতেই হবে জয়রামবাটীতে, মায়ের আবির্ভাব-তিথিতে তাঁকে প্রনাম করতে, তাঁকে গান শোনাতে। খুব ভোরে উঠেই রওনা দেওয়ার জন্য তৈরি হতে লাগলাম। একটু বেলা বাড়লে বাজারে গিয়ে দোক্তা কিনে আনলাম মায়ের জন্য। এগারোটার মধ্যে খাওয়াদাওয়া সেরে ষ্টেশনে রওনা হলাম গাড়ি ধরার জন্য। ঠিক বারোটায় ট্রেন। বেলা একটার সময় পৌঁছে গেলাম বিষ্ণুপুর ষ্টেশনে। বিষ্ণুপুর থেকে হাঁটতে শুরু করলাম জয়রামবাটী অভিমুখে। তখন বাস ছিল না, অন্য যানবাহনও ছিল না। আমি পায়ে হেঁটেই চলেছি মাতৃদর্শনে।
শীতকালের বেলা ছোট। জয়রামবাটী পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। হাড়কাঁপানো শীত পড়েছে। মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ, গলায় কম্ফর্টার আর সর্বাঙ্গে শাল জড়িয়ে আমি যখন সন্ধ্যার অন্ধকারে জয়রামবাটীতে মায়ের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম, তখন হঠাৎ আমায় দেখে চেনার কোন উপায় ছিল না যে আমি রাজেন দত্ত। মা বসে আছেন একটি চৌকিতে পূর্বদিকে মুখ করে। সামনে-পিছনে, আশে-পাশে একদল ভক্ত মেয়ে-পুরুষ। আবার মঠে পৌঁছেই মাকে প্রণাম করলাম না, এমনকি মায়ের সামনে গিয়েও দাঁড়ালাম না। মাথায় এক দুর্বুদ্ধি এসেছিল – মাকে পরীক্ষা করব। শুধু তাই নয়, গত রাত্রে মাকে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেটা নিছক আমার মনের বিকার কি-না, তাও পরীক্ষা করব। আরো দশজন লোকের সঙ্গে আমি মায়ের পিছনের দিকে বেশ খানিকটা দূরে গিয়ে বস্লাম। সেখান থেকে শুনতে পেলাম, একজন ভক্ত বলছেনঃ “একটা গান হলে ভাল হতো”। একজন সাধু বল্লেনঃ “কে আর গাইবে? রাজন দত্ত থাকলে গাইত”।
মা বলে উথলেনঃ “রাজন এসেছে। পিছনে বসে আছে। ডেকে নিয়ে এসো। গান গাইবে”। মায়ের কাটা কাটা কথাগুলো আমার কানে এক-একটা তীরের মতো এসে বিঁধতে লাগল। আমি একদিকে যেমন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম, তেমনই আর একদিকে লজ্জায় মরে যেতে লাগলাম। কেউ আমাকে দাকার আগেই ছুটে গিয়ে দাঁড়ালাম মায়ের সামনে। দুটি পায়ে হাত বুলিয়ে প্রণাম করে হাত জোড় করে বল্লামঃ “আমায় ক্ষমা করো মা”। মায়ের সঙ্গে আমি তুমি করেই কথা বলতাম। আমার চিবুকে হাত দিয়ে মিষ্টি হাসি হেসে মা বল্লেনঃ “কই, দোক্তা দে”।
আবার মাথায় দুর্বুদ্ধি। বলে ফেল্লামঃ “এবার তাড়াতাড়িতে দোক্তা আনতে ভুলে গেছি”। কৌতুকভরা দুটি চোখে মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বল্লেনঃ “তোর বাঁ দিকের পকেটে দোক্তা আছে, দে বাবা দে!”
আমার সর্বাঙ্গ তখন কাঁপছে। একবার মনে হচ্ছে, কী মূর্খ আমি! কার সঙ্গে ছলনা করছি? আবার মনে হচ্ছে, আমি ধন্য! স্বয়ং জগন্মাতা আমার সঙ্গে লীলা করছেন। বাঁ দিকের পকেট থেকে দোক্তার প্যাকেটগুলো কম্পিত হাতে বের করে মায়ের হাতে দিলাম। মা খুশি হয়ে বল্লেনঃ “বেঁচে থাক, বাবা। নে একটা গান শোনা দেখি!”
সেদিন একটার পর একটা গান গেয়েছিলাম। কতগুলো গান গেয়েছি, তা ঠিক মনে নেই। আমার গানেই যেন সেদিন মায়ের তিথিপূজা সম্পন্ন হয়েছিল। ধন্য আমার মনুষ্যজন্ম! ধন্য মা। – রাজেন্দ্রানাথ দত্ত।
(শ্রীশ্রীমায়ের পদপ্রান্তে)।।
