ব্রহ্মজ্ঞ_গুরুর_কৃপাশিষ_তাঁর_সন্ন্যাসী_সন্তানের_ওপর

#ব্রহ্মজ্ঞ_গুরুর_কৃপাশিষ_তাঁর_সন্ন্যাসী_সন্তানের_ওপর |
        
এইটি কোন নিছক গল্প কথা নয় আর নয় কোন মন গড়া ঘটনা এইটি একটি পরম সত্যের মতন উজ্জ্বল এক দিব্য জীবনের আলোর প্রারম্ভ যা এক সদ গুরুর আশীর্বাদে হয়ে ওঠে পবিত্রতায় ভরা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত | হয়তো কখনও কখনও আমাদের জীবনকেও কোথাও ছুঁয়ে গেছে এরকম দিব্য অনুভূতির স্পর্শ |
সালটি ১৯৬০-৭০ দশকের হবে, তখন শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সঙ্ঘগুরু ছিলেন শ্রীমৎ স্বামী বীরেশ্বরানন্দজী মহারাজ |
একটি ছোট ছেলেকে হাতে ধরে এক মা নিয়ে এসেছেন বেলুর মঠের ঠাকুরের দিব্য দর্শনে | ঠাকুরের মন্দিরে ঠাকুরকে প্রণাম করার সময় ছোট ছেলেটি হঠাৎ ষাষ্টাঙ্গে প্রনাম করে ফেলল, এতে মা-টিও বেশ চমক খেয়ে গেল এবং শুধু তাই নয় আশেপাশের ভক্তরা এমনকি কিছু মহারাজরাও তার এই বিনম্র চিত্তে প্রনাম দেখে বেশ খানিক অবাক হয়ে পড়ল | খুব সুন্দর এই দৃশ্য দেখে এক মহারাজ এগিয়ে এসে ছেলেটির মাথায় ঠাকুরের প্রসাদী ফুল ছুঁয়ে আর প্রসাদ দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
– তা হ্যাঁ বাবা, ঠাকুরের কাছে কি চাইলে তুমি ?
– ছেলেটির চট জলদি উত্তর দিল
” #আমাকে_তোমার_চরণে_রেখ “|
বেশ প্রাণ ছোঁয়া উত্তর শুনে মহারাজ হেসে মাকে জিজ্ঞাসা করলেন আপনার শিক্ষা অতি সুন্দর, ঠাকুর এমনই সব ছোট ছেলেদেরকে এই সৎ শিক্ষা দিতেন, যাতে কাঁচা মনেতেই ঠাকুর-মায়ের ছাপ পরে যায় | আর সংসারে থেকেও যাতে ঈশ্বরকে নিয়ে চলতে পারে | খুব আনন্দ পেলাম আপনার এই শিক্ষা দেখে |
     মা-টি সব শুনে বললেন, মহারাজ আমাকে ক্ষমা করবেন, আমি এসব আমি কিছুই শেখায় নি আর ওরই জেদাজেদিতে আমি বেলুড়ে এসেছি | সত্যি কথা বলতে কি আমি এত সব কিছুই জানি না | ও যা করেছে তা নিজে থেকেই করেছে |
   এই শুনে মহারাজ তো বেশ অবাক হল আর বললেন মা এই ছেলেকে ঠাকুরের চরণে নিবেদন করুন, এই শিশু যে ঠাকুরের কাজের উদ্দেশ্য এসেছে, এ ওর পূর্ব সংস্কার | এই সব বলে মহারাজ ঠাকুরের প্রসাদ দিয়ে অনেক আদর করে মা আর ছেলেকে বিদায় দিলেন |
ছেলেটি ঠাকুর মন্দির থেকে যেতে চাইছে না দেখে  মা ছেলের হাত ধরে টানতে টানতে ঠাকুরের মন্দির থেকে নিয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছেন আর ছেলেটি ঠাকুরের মন্দিরের সমস্ত দিক এদিক-ওদিক চাইতে চাইতে কি যেন বিরবির করে বলতে বলতে যাচ্ছে | মা খেয়াল করে দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞাসা করল, কি বলছিস?
– তাতে ছেলেটি উত্তর দিল, মা আমি বলছি – “#কোথাও_যদি_স্বর্গসুখ_থাকে_তো_এইখানেই_আছে |
মা তো কোন কিছু না বুঝে ছেলেকে বুঝিয়ে নিয়ে যাবার জন্য বলে ফেললেন, আচ্ছা তুই একটু বড় হয়ে যা তারপর তোকে এইখানেই স্বর্গসুখের জায়গায় দিয়ে যাব, এইবার তো খুশী!
হঠাৎ ছেলে দাঁড়িয়ে পড়ে মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, মা তুমি কিন্তু ঠাকুরের সামনে কথা দিচ্ছ | মাও ছেলেকে শান্ত করতে বলেই ফেলল, হ্যাঁ, বাবা আমি তোমায় কথা দিচ্ছি , এখন চল বাড়ি |
  দুরে দাঁড়িয়ে মহারাজ মা ছেলের কথাপকথন শুনে হেসে মনে মনে বলতে থাকল, ঠাকুর একে খেয়ে নিয়েছে এখন শুধু অপেক্ষা |
ছেলেটি যখন স্কুলের গন্ডি পাস করে  কলেজে উত্তীর্ণ হল এবং কলেজের পড়া শেষ করে একদিন মাকে সেই ছোট্ট বেলার কথাটি মনে করিয়ে দিল, যে মা ঠাকুরের সামনে কথা দিয়েছিলেন যে ঠাকুরের চরণে নিবেদন করে দেবেন! তা সেই সত্য রক্ষার কি হলো? মা তো শুনেই অবাক হয়ে গেল, কোন সেই ছোটবেলার কথা আর তেমন গুরুত্ব দিয়েও বলে নি, আর সেই কথা তুলে মাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে| এটাতো তো সেইদিনকে এক খেলার ছলে বলেছিল, কোন গুরুত্ব তো তেমন ছিল না | কিন্তু ছেলে কোন অজুহাতই শুনল না, ঠাকুরের কাছে যে মিথ্যা হয়ে যাবে তা কখনই হতে পারে না | তাই মাকে সঙ্গে নিয়েই তৎকালীন সঙ্ঘাধখ্য শ্রীমৎ স্বামী বীরেশ্বরানন্দজীর কাছে গিয়ে সব কথা বললেন | মায়ের খুব কষ্ট হচ্ছে দেখে মহারাজজী বুঝিয়ে মাকে বললেন , “আপনি_তো_মা_ঠাকুরকে_আপনার_সবচেয়ে_প্রিয়_বস্তুটি_উৎস্বর্গ_করছেন_কজন_পারে_এইভাবে_সর্বস্ব_তুলে_দিতে_ঠাকুরের_শ্রীচরণে” |
              যাইহোক মাকে বুঝিয়ে ঘড়ে পাঠিয়ে দিলেন আর ছেলেটিকে মঠে রেখে তার বেশ কিছু পরে স্বামীজীর জন্মতিথিতে ব্রহ্মচর্য্য আর আশীর্বাদ দিয়ে উদ্ভোধনে পাঠালেন | ছেলেটির এবার ব্রহ্মচর্য্য নিয়ে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে কাজ শুরু হল |
  
  উদ্ভোধনে এসে সেই কোন ভোর থেকে উঠে ঠাকুরের ঘড় পরিস্কার করা, পূজোর জন্য সব গুছিয়ে রাখা আবার গুরুজন সন্ন্যাসীদের কাপড় কাচা , রান্নার তদারকী করা আরো সব অনেক কিছু কাজ তার দ্বায়িত্ব এসে পড়ল এবং যতদুর পর্যন্ত ঠিক ঠিক কাজ করার চেষ্টা করে চলেছিল | কিন্তু সবাই তো আর একরকম হয়ে ওঠে না তাই যে মহারাজজী ঠাকুরের পুজা করতেন সে বড় সামান্য কথায় রেগে যেতেন তাই বেশ রাগ করতেন ছেলেটির ওপর | সর্বদাই খেঁচ খেঁচ করতেন যে ঠাকুর ঘড় ঠিক মতন মোছা হয় নি, এটা ঠিক করে রাখনি, তোমার দ্বারা এ জীবন কিচ্ছু হবে না ইত্যাদি সব | ছেলেটির এত সব কাজ অভ্যেস ছিল না সে সচ্চল ঘড়ে বড় হয়ে উঠেছে | তাই সব কথা মুখ বুজে সহ্য করত | হাঁটু গেড়ে ঘড় মুছতে মুছতে তার হাঁটুতে ঘা হয়ে গেছিল তবুও ঠাকুরের কাজ মনে করে সব হাসি মুখে মেনে নিত |
   ঘটনা ঘটল এবার – একদিন প্রবীন মহারাজদের কাপড় কেচে ওপরের ছাদে দড়িতে শুকাতে দিতে গিয়ে নজরে পড়ল ঠিক ঐ সময় পাশের বাড়ির এক গৃহবধুও ছাদের কাপড় শুকোতে দিতে এসেছে | সেই বধুটির ভিজে কাপড়টি একটু কেমন অবিন্যস্ত ভাবে রয়েছে হঠাৎ চোখ তার বুকের ওপর পরতেই ভেতরের কাম যেন উঠলে উঠল আর শুরু হল ঠিক ওই সময়কেই বেছে নেওয়া যা কাপড়ের আড়াল থেকে ঐ দৃশ্য দেখার | অবশ্য ঐ বধুটি এর বিন্দু বিসর্গও জানে না | রাতে শুয়ে শুয়েও ঐ দৃশ্য মনের অন্তরালে ভেসে উঠছে | তখন আর ঠাকুরের কথা, কোথায় আছি সেইসব কথা আর খেয়াল থাকল না | বেশ কিছুদিন এইভাবে যাওয়ার পর একদিন মনে মনে বেশ অনুতপ্ত হল আর বিবেকের তাড়নায় ভাবতে থাকল এ কি করছি আমি! আমার বোধহয় এই সন্ন্যাসী জীবন আর গ্রহণ করা হবে না | তাই প্রেসিডেন্ট মহারাজের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে সব কিছু বলে ঘরে ফিরে যাব | পরের দিন ওখানকার অধ্যক্ষ মহারাজকে বলে বেলুড়ে গেলেন প্রেসিডেন্ট মহারাজের সাথে দেখা করতে | প্রনাম করার সময় বীরেশ্বরানন্দজী একবার মাত্র দেখে নিয়ে বললেন তোমার মুখটি এমন কালো পরে গেছে কেন? সব কুশলে আছ তো? ছেলেটি বলল গুরুদেব আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে , মহারাজ হাত দেখিয়ে থাকতে বললেন তাই সে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকল কিন্তু সামনে অনেকে থাকার জন্য কিছু বলা হয়ে উঠল না | মহারাজ শুধু বলে দিলেন এ আজকে রাতে আমার সঙ্গে থাকবে খবর পাঠিয়ে দাও |
   রাতে খাবার পর মহারাজ আর ছেলেটি শুতে গেল কিন্তু কোন কিছু কথা বলার অবকাশই যে হচ্ছে না | মহারাজ খাটে আর ছেলেটি মেঝেতে শুয়ে আছে |  ছেলেটির চোখে ঘুম নেই সে যে ফেরৎ দিতে এসেছে এই ব্রহ্মচর্যের জীবন | এই সব উল্টোপাল্টা ভাবছে হঠাৎ মহারাজ চোখ বুজে বলে উঠলেন ” হ্যাঁ গো তোমার ছোটবেলায় মায়ের দুধ খাবার সময় ওই দৃশ্য কি মনে পড়ে?”
   ব্যাস ছেলেটি আর যায় কোথায়, ছেলেটি হঠাৎ এই কথা শুনে ভাবতে থাকল, তিনি এই কথা জানলেন কি করে? যার জন্য এই কথা বলেন, ধরপর করে উঠে মহারাজের শ্রীচরণে এসে মাথা দিয়ে কাঁদতে থাকল, চোখের জলে মহারাজের পা ভিজে যেতে থাকল | মহারাজ পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ওঠ আয় দেখি আমার কাছে , তোর মুখ দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি কেন তোর মুখটি কালো পরে গেছে ! বলে ছেলেটির মাথা স্পর্শ করে জপ করে দিলেন আর বললেন ” এর পর যখন ঐ দৃশ্য দেখবি , মনে করবি ওটি তোর মা | ঠিক আছে , এখন যা শ্রীশ্রীমায়ের কথা চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড় |
  সকাল হল, ছেলেটির মনে হল যেন তার জীবনে এক নতুন প্রভাত হয়ে ফিরে এল | ব্রহ্মজ্ঞ গুরুর স্পর্শে আর কোন দিন সেই চিন্তা বা দৃশ্য মাথায় আসে নি বা স্বপ্নেও দেখেনি | পরবর্তীকালে সেই ছেলেটি এক উচ্চ মানের সাধু হয়ে ঠাকুর মায়ের ও গুরুদেবের শ্রীচরণে জীবন গড়ে উঠল |
এমন সদ গুরুর আশীর্বাদে যে জীবন জগদ্ধিতায়-চ হয়ে যায় এখনও আমরা পেয়ে থাকি | এ আমাদের কাছে এক আশীর্বাদের প্রেরণা যা আমাদের নীচু মনকে খুব সহজে উঁচু করে তোলে | এটি একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত আমাদের কাছে |
জয় মা, জয় ঠাকুর, জয় স্বামিজী, জয় শ্রীমৎ স্বামী বীরেশ্বরানন্দজী, প্রনাম |
(কৃতজ্ঞতা – আমাদের আশ্রমের প্রবীন ও আমার পিতৃতুল্য শ্রীগোলক সেন মহাশয়ের থেকে প্রাপ্ত এই ঘটনা | যা উনি শুনেছিলেন শ্রীমৎ স্বামী বীরেশ্বরানন্দজী মহারাজের ষ্মরণ সভায় | আর যে মহারাজজীর সম্বন্ধে এই ঘটনা তা আজও আমাদের কাছে তার পরিচয় গোপনই রয়ে গেছে )

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started