অণুগল্প —
ডাক্তার করুণাময় পাঁজার নামডাক খুব। মেমারি স্টেশন থেকে বাসে ফুলডাঙা-দেবীপুরে নেমে কাউকে বললেই দেখিয়ে দেবে ডাক্তারবাবুর সাবেকী বাড়ি। দীঘি, বাগান সমেত অনেকটা জমির ওপরে ডাক্তার করুণাময় পাঁজার বসতবাড়িটি। বার-বাড়িতে চেম্বার। অপেক্ষমান রুগীদের জন্য সারিসারি বেঞ্চি পাতা। তবু ভিড় রোজই উপছে পড়ে রাস্তায়।
ডাক্তারবাবু সকাল আটটায় রুগী দেখা শুরু করেন। টানা ছ ঘন্টা রুগী দেখে ভেতরবাড়িতে খেতে ঢোকেন। আবার বিকেল চারটে থেকে চেম্বার শুরু হয়ে যায়।
ডাক্তারবাবু সকাল আটটায় রুগী দেখা শুরু করেন। টানা ছ ঘন্টা রুগী দেখে ভেতরবাড়িতে খেতে ঢোকেন। আবার বিকেল চারটে থেকে চেম্বার শুরু হয়ে যায়।
তখনো সন্ধে নামেনি। ভিড় পাতলা হয় নি মোট্টে। হঠাৎ সদলবলে দারোগা তারাপদবাবুকে আসতে দেখে করুণা ডাক্তারের কম্পাউন্ডার সিদ্ধিনাথ অবাক হল। সে এগিয়ে এসে বলল, ডাক্তারবাবু রুগী দেখছেন। খবর দেবো কি?
মেমারি থানার নতুন দারোগা তারাপদ ঘোষাল চিন্তিত মুখে বললেন, হুঁ, খবর দাও। আমি অবশ্য ভেতরে গিয়েই দেখা করব।
করুণা ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললেন, করেছেন কি পুলিশ-সাহেব? একেবারে পাইক-বরকন্দাজ নিয়ে সম্মুখ সমরে? কোমরে দড়ি পরাতে এলেন নাকি?
তারাপদ দারোগা একটু হেসে বললেন, না, কিন্তু ব্যাপারটা গুরুতর। চলুন ভেতরে চলুন, বলছি।
মেমারি থানার নতুন দারোগা তারাপদ ঘোষাল চিন্তিত মুখে বললেন, হুঁ, খবর দাও। আমি অবশ্য ভেতরে গিয়েই দেখা করব।
করুণা ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললেন, করেছেন কি পুলিশ-সাহেব? একেবারে পাইক-বরকন্দাজ নিয়ে সম্মুখ সমরে? কোমরে দড়ি পরাতে এলেন নাকি?
তারাপদ দারোগা একটু হেসে বললেন, না, কিন্তু ব্যাপারটা গুরুতর। চলুন ভেতরে চলুন, বলছি।
দারোগা বাবুর সঙ্গে একজন হাবিলদার আর দুজন কন্সটেবল এসেছে। তাদের বাইরে রেখে ওঁরা চেম্বারে ঢুকলেন। দুজনেই সমবয়স্ক, বুদ্ধিমান এবং নিজের পেশায় নিবেদিতপ্রাণ। খুব অল্প সময়ের মধ্যে দুজনের বন্ধুত্বও তৈরী হয়েছে। তারাপদ ঘোষাল আর ভণিতা না করে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি পিশাচ পুষছেন?
– পিশাচ? পুষবো? কেন বলুন তো ঘোষাল সাহেব?
– সেটা তো আমারও প্রশ্ন। খবর আছে, আপনার দীঘিতে মড়া ভেসে বেড়াচ্ছে দিনমানে। আপনি সকালে সন্ধ্যায় দীঘির ধারে এসে তাকে ডাকেন, আর সেই মড়া জ্যান্ত হয়ে পুকুরঘাটে চলে এসে আপনার সঙ্গে চা-বিস্কুট খায়, খেয়ে আবার জলে নেমে মড়ার মত ভেসে চলে।
– তাহলে খবর তো একরকম পেয়েই গেছেন। তা এখন ধরবেন কাকে? আমাকে? পিশাচকে চা-বিস্কুট খাওয়াই বলে? নাকি মড়াটাকে? সে চা-বিস্কুট খায় বলে?
– না, খুলে বলুন। ওপরমহল থেকে খোঁজ করতে পাঠিয়েছে আমায়। আমি তো চিনি আপনাকে, তাই সরাসরি জানতে চাইছি, ব্যাপারখানা কি? একটা মড়া নিস্পন্দ হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে আপনার কালো দীঘিতে, আবার জ্যান্ত লোকের মত আপনার সঙ্গে কথাবার্তা কইছে, এ তো পিচেশের কাজ, ইংরিজীতে যাদের বলে zombie. জীবন্মৃত প্রেতযোনি। আমাদের এস পি মাসুদ সাহেবকে তো ভালোই চেনেন, এ অঞ্চলেরই লোক। উনিই বললেন, ঘোষাল, দেখে এসো তো ব্যাপারখানা। পাঁজা-ডাক্তারের কালো দীঘির কালবোশ মাছ খুব বিখ্যাত, আর তিমি-র সাইজের মহাশোল। একবার ওখানে মাছ ধরার নেমন্তন্ন পাওয়া যাবে ভেবে রেখেছিলুম কিন্তু সেখানে এ রকম পৈশাচিক ব্যাপার-স্যাপার ঘটতে থাকলে তো ভারী মুশকিল।
ভ. করুণা পাঁজা বললেন, আশা করি পিশাচের গল্পে আপনি বিশ্বাস করেননি, ঘোষাল বাবু –
– তা করিনি, কিন্তু রহস্যটা জানবার জন্য কৌতূহলে যে ফেটে পড়ছি না এমনও নয়। খুলে বলুন, আপনার রহস্যময় ভাসমান অশরীরীটি কোন্ গোত্রের?
– উনি আমার স্ত্রীর গুরুদেবের আত্মীয়। যোগী মানুষ। পড়াশুনো করেছেন দেশে ও বিদেশে। একটু একা থাকতে চাইছেন আজকাল। জলযোগ ওঁর সাধনা। জল-যোগ শুনে কুম্ভকর্ণ বা মধ্যমপান্ডব বৃকোদরের সঙ্গে এঁর জলযোগের তুলনা করবেন না। ইনি খান যৎসামান্য। ভালোবাসেন ফিলসফি অভ্ সায়েন্স নিয়ে আড্ডা দিতে। জলচিকিৎসা নিয়ে বই লিখছেন। নিজের আশ্রম আছে কোথায় যেন। কদিনের জন্য এসেছেন এখানে। অভুত লোক। নিস্পন্দ হয়ে ভেসে থাকতে পারেন কয়েক ঘন্টা। আবার যখন কথা বলেন, আপনাকে উদ্দীপনায় চন্মনে করে দেবেন। চলুন, আলাপ করিয়ে দিই আপনার সঙ্গে।
পুকুরঘাটে আলাপ হল ওঁর সঙ্গে। ঝক্ঝকে চোখ। দাড়িগোঁফে আচ্ছন্ন মুখমণ্ডল। খুব সহজ ভাবে কথা বলছিলেন মানুষটি। চা খেতে খেতে সদ্যস্বাধীন ভারতবর্ষের কথাও উঠল।
সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। তারাপদ খানিক চুপ করে থেকে বললেন, আপনি ঘরছাড়া আজ অনেক বছর। জানি না কেন আপনি আত্মগোপন করে আছেন। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। আমি থানার দিকে রওনা দিচ্ছি। গিয়ে রিপোর্ট দাখিল করতে হবে। এইটুকু সময় আপনার হাতে রইল। যদি পলাতক হয়েই থাকতে চান, এগিয়ে যান। প্রশ্ন করব না আপনি কোথায় যাচ্ছেন। শুধু, আপনাকে একবার প্রণাম করতে পারি?
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস আপত্তি করলেন না। হেসে বললেন, পুনরাগমনায় চ। জয় হিন্দ।
হতচকিত ডাক্তার করুণাময় পাঁজাকে স্তম্ভিত করে রেখে লম্বা লম্বা পা ফেলে মুহূর্তে অন্তর্হিত হলেন ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের সিংহ