শাঁকচুন্নী কী কালো রে
“স্বামীজী, আমার পিছনে খুবলাগতেন”। স্বামীজীরসম্বন্ধে শৈশবের স্মৃতিচারণা করছেনশ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম গৃহীভক্ত এবংস্বামীজীর বিশেষ অনুরাগী বসুমতীসাহিত্য মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বত্বাধিকারী সুপুরুষউপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সহধর্মিণী। শ্রীরামকৃষ্ণ ও সারদাদেবীর আত্মীয়াএবং দক্ষিণেশ্বরে তাঁদেরই স্নেহে পরিপালিতা ভবতারিনীদেবী।
“আমাকে স্বামীজী শাঁকচুন্নী বলে খেপাতেন। খুবকালো ছিলাম দেখতে। কুচকুচেকালো। ভাতের হাঁড়ির কালিকেওহার মানাত। কিন্তু তিনিযখন ‘কালো’ বলে খেপাতেনতখন ভীষণ রেগে যেতাম।তিনি এসেছেন শুনলে লুকিয়েপড়তাম। কিন্তু ঠিক খুঁজেবের করতেন। আর নিজেইহাসতেন। আবার ভালওবাসতেন খুব।আমাকে কাছে ডেকে হাতভর্তি করে জামরুল, পেয়ারা, কালোজাম দিতেন।
কি তার ভালবাসা! এখনযখন ভাবি, চোখ জলেভরে যায়।
এক গ্লাস জল আমারহাতে তাঁর চাই–ই–চাই। আবার খেপানোরজন্য বলতেন, ‘তোর এই কালোহাতে জল খেতে আমারঘেন্না করে’। সেজন্যজল চাইলে আমি দিতামনা। কিন্তু সে কথাশোনে কে! বলতেন, ‘দ্যাখশাঁকচুন্নী, সাধুকে সেবা কর।সাধুকে জল খাওয়ালে গায়েররঙ ফর্সা হয়। খাইয়েদ্যাখ, তুই আমার মতফর্সা হয়ে যাবি। ফর্সাযদি নাও হোস তবেফুটফুটে শিবের মত বরনিশ্চয়ই পাবি। নে, এখনজল খাওয়া, পারিস তোএক ছিলিম তামাক খাওয়া’।
শেষ পর্যন্ত জল এনে দিতাম।
বিয়ের পরে যখন আমায়স্বামী বলছেন, ‘নরেন এসেছে, সুপারিকেটে দাও’।
আমি বলেছিলাম, ‘আমি পারব না।ও আমায় কালো মেয়েবলেছে’। ছোট্টমেয়ে। দুষ্টু মন। ‘ওইযে কালো মেয়ে’ বলেছে, সে কথাটা ঠিক মনেছিল!
বিদেশ থেকে ফিরে এলেনস্বামীজী। বিশ্ববিখ্যাত বিবেকানন্দ কিন্তু তখনো সেইনরেনই ছিলেন।
হঠাৎই একদিন আমাদের কাশীরবাড়ীতে এসে হাজির। সবাইতো একেবারে থ! সূর্যের মতোদেখতে, যেন আগুন জ্বলছে! যারা তাঁর সঙ্গে এসেছিল, তাদেরকে বললেন, ‘তোমরা সব যাও।আমি আজ এখানে থাকব’। সবাইচলে গেল।
বললেন, ‘কই রে শাঁকচুন্নী!’ খুব জোরে জোরে কথাবলতেন। ‘আমাকে অভ্যর্থনা করলিনি!’ আমি তো কেঁদে ফেলেছি।পুরনো কথা মনে পড়েগেল।
আমাকে কাঁদতে দেখে আমারদুখানা হাত জড়িয়ে ধরেবললেন, ‘আমি আজ এলাম, আর তুই এখন কাঁদবি! তবে আমি যাই। এখানেএলাম দুটো প্রান খুলেকথা বলব; আগের মতকরে হাসব। তুই রেঁধেতোর ওই কালোহাত দিয়েসাধুসেবা করবি। নে, সবধরা–চূড়া খুলে শুলুমতোর মেঝেতে। আগে তো একছিলিম তামাক খাই, পরেঅন্য কথা’।
এই বলে টানটান হয়েশুয়ে পড়লেন। তখন কোথায়গেল আমার কান্না! খাবারব্যবস্থা করতে ছুটোছুটি শুরুকরলাম। আমি যেখানে রান্নাবসিয়েছি, এসে বসলেন মাটিতেই।বললাম, ‘আসন দিই?’
বললেন, ‘না। রাখ তোআদিখ্যেতা। হ্যাঁরে শাঁকচুন্নী, শেষ পর্যন্ত তোরহাতের চচ্চড়ি খেতে এলামরে! এত থাকতে তোরচচ্চড়ি বড়ি দিয়ে মনেপড়ে গেল। ওইটি রাঁধবিবুঝলি।‘
কে বলবে, এ আমেরিকাকাঁপিয়ে দিয়ে এসেছে।
আমি যতই বলি, ‘ওপরেগিয়ে বস না।‘
বলেন, ‘সে কি রে, আমি কি তোর শ্বশুরঘরেরলোক যে অমন করছিস? একটা গান করি। বাদ্যযন্ত্রকিছু আছে?’
আমি বললাম, ‘আমি কি ওসবনিয়ে এসেছি নাকি?’
‘তবে থালাটা দে।‘
থালা বাজিয়েই একটা গান ধরলেন।সে যে কি মধু! কান ভরে আছে এখনো।
গান ধরেছেন – ‘শ্যামা মা কেআমার কালো রে,
কালো রূপে দিগম্বরী হৃদপদ্মকরে আলো রে!’
আর কী হাসি! বাবা! কী আনন্দই না ঝরেপড়ছে। আমি তো রাঁধছি, ওই গান শুনে উঠেপালাচ্ছি। তখন বললেন, ‘তবেঅন্য গান শোন। ঠাকুরকেযে গানে মুগ্ধ করেছিলামসেই প্রথম দিনের গানটাকরি’।
‘মন চল নিজ নিকেতনে!
সংসার – বিদেশে বিদেশীর বেশেভ্রম কেন অকারণে’।
একটার পর একটা গানগেয়ে চললে
ঈশ্বরের জন্য কান্না
রান্না হলো, স্নান করতেবললাম।
নিচে গিয়ে নিজেই কুয়োথেকে জল তুলে বেশকরে স্নান সারলেন।
‘শাঁকচুন্নী, দে এবারে, সামনেবস, সাধুসেবা কর। চচ্চড়ি দে।ছোলার ডাল মোটা করেরেঁধেছিস। বাহ, তোর তবেমনে আছে আমি কিচাই’।
আর মুখে দক্ষিনেশ্বরের কাহিনী।ঠাকুর কেমন করে গাইতেন, নাচতেন, আবার রেগে গিয়েবকতেন, তারপরই হাত ভর্তিপ্রসাদ দিতেন – এইসব।
তারপর মেঝেতে শুয়ে ঘুম।
বললেন ‘ডাকিস নি’।
লম্বা ঘুম দিয়ে বিকেলেউঠে বললেন, ‘ওরে শাঁকচুন্নী, অনেকবছর এমন ঘুম ঘুমোইনি’।
সন্ধ্যা কাটিয়ে চলে গেলেন।আমি দুচোখে ওঁর পথচেয়ে রইলাম।
বললেন, ‘একদম মন খারাপকরবিনি। তোর কিসের দুঃখ!
তোর ভাবনা তিনি, তাঁরভাবনা তুই।
ঠাকুর তোর পা ছড়িয়েকান্না ভালোবাসতেন, তোকে খেপিয়ে কাঁদাতেন, আজো তাই। তুই পাছড়িয়ে বসে কাঁদিস।
দক্ষিনেশ্বরে ছোটবেলায় কাঁদতিস তোর নিজের জন্য, এখন কাঁদিস তাঁর জন্য। নিজেরকান্না আর্তনাদ, ঈশ্বরের জন্য কান্না তাঁরগুণকীর্তন”।