১৮৯৯ খ্রীষ্টাব্দে প্লেগের পুনরায় প্রাদুর্ভাব ঘটলে এই রোগের প্রতিরোধের ব্যাপারে সকল দায়িত্ব স্বামীজী নিবেদিতার ওপর অর্পণ করলেন। এই উদ্দেশ্যে রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃক গঠিত কমিটিতে নিবেদিতা হলেন সম্পাদিকা এবং স্বামী সদানন্দ প্রধান কার্যাধ্যক্ষ। স্বামী সদানন্দকে নিয়ে নিবেদিতা বাগবাজার অঞ্চলে প্লেগ নিবারণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে প্লেগ সম্বন্ধে বক্তৃতা দিয়ে তিনি মানুষকে এই রোগ সম্বন্ধে সচেতন করার চেষ্টা করতে থাকেন। সমস্ত বস্তিগুলি পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব ছিল স্বামী সদানন্দের ওপর আর নিবেদিতা প্রতিদিন প্রত্যেকটি কাজ পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় নিদের্শাদি দিতেন। একদিন তিনি নিজেই ঝাড়ুহাতে রাস্তা পরিষ্কার করতে উদ্যত হলে পাড়ার যুবকগণ লজ্জিত হয়ে সেই কাজের দায়িত্ব নিজেরাই গ্রহণ করে। ঘরে ঘরে গিয়ে তিনি প্লেগাক্রান্ত রোগীদের সেবা করতেন। এ সম্বন্ধে ডাঃ রাধাগোবিন্দ কর লিখ ছেনঃ “একবার একজন রোগীর ঔষধপথ্যাদির ব্যয়-নির্বাহার্থে তাঁহাকে কিছুদিনের জন্য দুগ্ধপান পরিত্যাগ করিতে হইয়াছিল। তখন দুগ্ধ ও ফলমূলই ছিল তাঁহার আহার। এই সময়ে একদিন চৈত্রের মধ্যাহ্নে রোগি- পরিদর্শনান্তে গৃহে ফিরিয়া দেখিলাম, দ্বারপথে ধূলি-ধূসর কাষ্ঠাসনে একজন ইউরোপীয় মহিলা উপবিষ্টা। ইনিই ভগিনী নিবেদিতা। …সেইদিন প্রাতে বাগবাজারে কোনো বস্তিতে আমি একটি প্লেগাক্রান্ত শিশুকে দেখিতে গিয়েছিলাম। রোগীর ব্যবস্থা সম্বন্ধে অনুসন্ধান ও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যই সিস্টার নিবেদিতার আগমন। আমি বলিলাম, ‘ রোগীর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন !’ …অপরাহ্নে পুনরায় রোগী দেখিতে যাইয়া দেখিলাম, সেই অস্বাস্থ্যকর পল্লিতে, সেই আর্দ্র-জীর্ণ কুটিরা নিবেদিতা রোগগ্রস্ত শিশুটিকে ক্রোড়ে লইয়া বসিয়া আছেন। দিনের পর রাত্রি, রাত্রির পর দিন তিনি স্বীয় আবাস পরিত্যাগ করিয়া সেই কুটিরে রোগীর সেবায় নিযুক্ত রহিলেন। … তিনি স্বয়ং একখানি ক্ষুদ্র মই লইয়া গৃহে চুনকাম করিতে লাগিলেন। রোগীর মৃত্যু নিশ্চিত জানিয়াও তাঁহার শুশ্রূষায় শৈথিল্য সঞ্চারিত হইল না। দুইদিন পরে শিশু এই করূনাময়ীর স্নেহতপ্ত অঙ্কে অন্তিম নিদ্রায় নিদ্রিত হইল!” মৃত্যুর পূর্বে শিশুটি তাঁকে নিজের মা মনে করে ‘মা’ বলে জড়িয়ে ধরেছিল।- (ভারত উপাসিকা নিবেদিতা, পৃ-২৯)