বালগোপালের উপাসিকা কয়েকজন মারহাট্টি মহিলা মাদ্রাজের এক বাড়িতে থাকতেন। কোনো মহাপুরুষের দর্শন পেলে তাঁকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে সাক্ষাৎ গোপাল বুদ্ধিতে পূজা করতেন নতুবা অপর কোনো পুরুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। তাঁরা রাজা মহারাজকে একদিন তাঁদের বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইলেন, কিন্তু মহারাজ রাজি হলেন না। তাঁদের পীড়াপীড়িতে তিনি মহাপুরুষ মহারাজকে পাঠিয়ে দিলেন। সঙ্গে আমি, রামলাল দাদা ও মঠের কয়েকজন কর্মী গেছিলাম। মহারাজ আমাদের মুখে সবই শুনলেন। মেয়েরা জনে জনে ঠাণ্ডা জলে পা ধুইয়ে দেয় শুনেই বললেন, “ওরে বাবা আমি যাব না।” কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে যেতেই হলো। মহারাজের সঙ্গে ছিলাম আমি ও শর্বানন্দ। সিংহাসনে বালগোপালের অপূর্ব সুন্দর পটমূর্তি স্থাপিত। আরেকটি দিকে একটি সুসজ্জিত আসনে তাঁরা মহারাজকে বসালেন। সামনে পূজার উপকরণ – ফুলচন্দন, ধূপদীপ, নৈবেদ্য, রূপোর ভৃঙ্গারে জল, ছোট ছোট ভৃঙ্গারগুলিতে সুগন্ধি জল, রূপোর কেঁড়েতে দুধ, প্রত্যেকটি কেঁড়ের মুখে একটি করে সোনার গ্লাস। প্রথমত মহারাজকে প্রণাম করে তাঁরা গুরুবন্দনা গাইলেন। তারপর গোপালের পূজা করে মুখের কাছে দুধের গেলাস ধরে মানসে দুধ খাওয়ালেন। মেয়েরা দেখতে দেবীর মতো। তাঁদের পরিধানে নানা রঙের শাড়ি আঁটসাঁট করে পরা। মাথায় এলো চুল। মহারাজকে প্রণাম করে তাঁরা অর্ধবৃত্তাকারে দাঁড়ালেন। জলচৌকির ওপরে রূপোর পাত্রে মহারাজের পা দুখানি রেখে ও নিজে হাঁটু গেড়ে বসে তাঁদের একজন পা ধোয়াবার উপক্রম করতেই মহারাজের পূর্ব নির্দেশানুসারে আমি বলে উঠলুম, “মহারাজের পায়ে জল দেবেননা।” আমার দিকে তাঁরা বিমূঢ়ভাবে তাকালেন। মহারাজ বললেন, “আচ্ছা, একদিনই তো, আমার কিছু হবে না, তুই আর বারণ করিসনা।” আশ্বস্ত হয়ে মেয়েরা পূজা শুরু করলেন। মেয়েটি সুগন্ধি জলে মহারাজের পা ধুইয়ে নিজের চুল দিয়ে পা মুছিয়ে দিলেন। তারপর একটা ভেল্ভেটের গদির ওপর পা দুখানি স্থাপন করে তাতে ফুল চন্দন ও একগাছি মালা দিলেন। এইভাবে প্রত্যেকটি মেয়ে – ১০–১২ জন হবে – পা ধুইয়ে মুছিয়ে পাদপূজা করলেন। তারপর জলের পাত্র সরিয়ে প্রত্যেকে এক একটি দুধের পাত্র ও গেলাস নিয়ে মহারাজকে ঘিরে গান ও নৃত্য শুরু করলেন – *“দুধ পিও মেরে রাজগোপালা, দুধ পিও মেরে নন্দদুলালা….”* গাইতে গাইতে এক একজন করে সামনে এসে কেঁড়ে থেকে গেলাসে দুধ ঢেলে মহারাজকে খাওয়াচ্ছেন। এইভাবে কতবার করে এক একজন মহারাজকে দুধ খাওয়ালেন। *মহারাজ তখন ভাবমগ্ন, তাঁকে জীবন্ত গোপালবিগ্রহ মনে হচ্ছিল। একটা দিব্যভাবে ও সুগন্ধে ঘরটি ভরে গিয়েছিল। মেয়েদেরও হুঁশ ছিল না। আমি মহারাজের কাছে দাঁড়িয়েছিলুম। তাঁদের শাড়ির আঁচল ও চুল আমার গায়েও লাগছিল। আমার তখন পুরুষবুদ্ধিটি একেবারে লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কেবলই মনে হচ্ছিল, এই কি বৃন্দাবন? ইনিই কি ব্রজের গোপাল? এঁরাই কি ব্রজবালা?* সময়ের হুঁশ কারুরই ছিল না। মেয়েদের কেঁড়ের দুধ যখন শেষ হলো, তখন নৃত্যগীত থামল। মহারাজের ভাবের গাঢ়তা কমে এলে মহারাজ একটু উত্তেজিত ভাবে বললেন, “ঈশ্বর, তুই একটা গান গা।” অদ্ভুত ভাবাবেগে আমি দেশকালপাত্র বিচার না করেই গান ধরলুম, “ডমরু হরকর বাজে বাজে।” ভাবান্তর হয়ে গেল। মহারাজ প্রকৃতিস্হ হলেন। ওই দিনের ঘটনার বিবরণ শুনে শরৎ মহারাজ বলেছিলেন, *“এখানেই মহারাজের স্বরূপ স্মৃতি উদ্দীপিত হয়ে গিয়েছিল।”*