*- : স্বামীজীর পত্রাবলী : -*
*”নমঃ শ্রীযতিরাজায় বিবেকানন্দ সুরয়ে।* *সচ্চিৎসুখস্বরূপায় স্বামিনে তাপহারিণে।।”*
।।ঔঁ।।
।।ঔঁ।।
(শ্রীমতী মৃণালিনী বসুকে লিখিত)
দেওঘর, বৈদ্যনাথ,
বাবু প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি,
২৩শে ডিসেম্বর, ১৯০০
দেওঘর, বৈদ্যনাথ,
বাবু প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি,
২৩শে ডিসেম্বর, ১৯০০
মা,
তোমার পত্র পাইয়া বড়ই আনন্দিত হইলাম; তুমি যা বুঝিয়াছ, তাহা ঠিক।
‘স ঈশ অনির্বচনীয়ঃ প্রেমস্বরূপঃ’ – সেই ঈশ্বর অনির্বচনীয় প্রেমস্বরূপ, এই নারদোক্ত লক্ষণটি যে প্রত্যক্ষ এবং সর্ববাদিসম্মত, আমার জীবনের ইহা স্থিরসিদ্ধান্ত।
অনেকগুলি ব্যক্তির একত্র নাম ‘সমষ্টি’, এক-একটির নাম ‘ব্যষ্টি’। তুমি আমি ‘ব্যষ্টি’, সমাজ ‘সমষ্টি’।
তুমি আমি পশু পক্ষী কীট পতঙ্গ বৃক্ষ লতা পৃথিবী গ্রহ নক্ষত্রাদি এক একটি ‘ব্যষ্টি’, আর এই জগৎটি ‘সমষ্টি’ – বেদান্তে ইহাকেই বা হিরণ্যগর্ভ বা ঈশ্বর বলে। পৌরাণিক ব্রহ্মা, বিষ্ণু, দেবী ইত্যাদি নাম।
ব্যষ্টির ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আছে কি না এবং কত পরিমাণে হওয়া উচিত, সমষ্টির নিকট ব্যষ্টির একেবারে সম্পূর্ণ আত্মেচ্ছা, আত্মসুখ ত্যাগ করা উচিত কি না – এই প্রশ্নই সমাজের অনাদি কালের বিচার্য।
এই প্রশ্নের সিদ্ধান্ত লইয়াই সকল সমাজ ব্যস্ত; আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজে ইহাই প্রবল তরঙ্গ-রূপ ধারণ করিয়া সমুত্থিত হইয়াছে।
যে মতে ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সমাজের প্রভুতার সম্মুখে বলি দিতে চায়, তাহার ইংরেজী নাম সোশ্যালিজম, ব্যক্তিত্বসমর্থক মতের নাম ইন্ডিভিজুয়ালিজম।
সমাজের নিকট ব্যক্তির – নিয়মের ও শিক্ষার শাসন দ্বারা চিরদাসত্বের ও বলপূর্বক আত্মবিসর্জনের কি ফল ও পরিণাম, আমাদের মাতৃভূমিই তাহার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।
এদেশে লোকে শাস্ত্রোক্ত আইন অনুসারে জন্মায়; ভোজনপানাদি আজীবন নিয়মানুসারে করে, বিবাহাদিও সেইপ্রকার; এমন কি মরিবার সময়ও সেই সকল শাস্ত্রোক্ত আইন অনুসারে প্রাণত্যাগ করে।
এই কঠোর শিক্ষার একটি মহৎ গুণ আছে, আর সকলই দোষ। গুণটি এই যে, দুটি-একটি কার্য পুরুষানুক্রমে প্রত্যহ অভ্যাস করিয়া অতি অল্পায়াসে সুন্দর রকমে লোকে করিতে পারে।
তিনখানা মাটির ঢিপি ও খানকতক কাষ্ঠ লইয়া এদেশের রাঁধুনী যে সুস্বাদু অন্ন-ব্যঞ্জন প্রস্তুত করে, তাহা আর কোথাও নাই।
একটা মান্ধাতার আমলের এক টাকা দামের তাঁত ও একটা গর্তের ভিতর পা, এই সরঞ্জামে ২০ টাকা গজের কিংখাব(*) কেবল এদেশেই হওয়া সম্ভব।
একখানা ছেঁড়া মাদুর, একটা মাটির প্রদীপ, তায় রেড়ির তেল, এই উপাদান-সহায়ে দিগ্গজ পন্ডিত এদেশেই হয়। খেঁদাবোঁচা স্ত্রীর উপর সর্বসহিষ্ণু মহত্ত্ব ও নির্গুণ মহাদুষ্ট পতির উপর আজন্ম ভক্তি এদেশেই হয়! এই তো গেল গুণ।
কিন্তু এই সমস্তগুলিই মনুষ্য প্রাণহীন যন্ত্রের ন্যায় চালিত হয়ে করে; তাতে মনোবৃত্তির স্ফূর্তি নাই, হৃদয়ের বিকাশ নাই, প্রাণের স্পন্দন নাই, ইচ্ছাশক্তির প্রবল উত্তেজনা নাই, তীব্র সুখানুভূতি নাই, বিকট দুঃখেরও স্পর্শ নাই, উদ্ভাবনী-শক্তির উদ্দীপনা একেবারেই নাই, নূতনত্বের ইচ্ছা নাই, নূতন জিনিসের আদর নাই।
এ হৃদয়াকাশের মেঘ কখনও কাটে না, প্রাতঃসূর্যের উজ্জ্বল ছবি কখনও মনকে মুগ্ধ করে না। এ অবস্থার অপেক্ষা কিছু উৎকৃষ্ট আছে কি না, মনেও আসে না, আসিলেও বিশ্বাস হয় না, বিশ্বাস হইলেও উদ্যোগ হয় না, উদ্যোগ হইলেও উৎসাহের অভাবে তাহা মনেই লীন হইয়া যায়।
(ক্রমশঃ)
(ক্রমশঃ)
*কিংখাব* – জরির কাজ-করা ফুল-কাটা রেশমী কাপড় বিশেষ।
*”ওঁ পরতত্ত্বে সদালীনো রামকৃষ্ণ সমাজ্ঞয়া।*
*যো ধর্মস্থাপনরতো বীরেশং তং নমাম্যহম্।।”*
*যো ধর্মস্থাপনরতো বীরেশং তং নমাম্যহম্।।”*