খুবই সুন্দর এক মর্মস্পর্শী ঘটনা। পড়লে খুব ভাল লাগবে।–Swami Bhuteshananda

খুবই সুন্দর এক মর্মস্পর্শী ঘটনা। পড়লে খুব ভাল লাগবে।     একটি ধর্মীয় সভার অনুষ্ঠানে একবার শুনতে গেছিলাম | সেখানে উপিস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সম্মানীয় সব গন্যমান্য ব্যাক্তিরা আর শ্রীরামকৃষ্ণ মিশন থেকে আসা এক প্রবীন মহারাজ | সকলেই ঠাকুর, মা, স্বামীজীর বিভিন্ন বাণী নানানভাবে বর্ণময় করে তুলে আমাদের সকলেরই একটা উচ্চভাবের সঙ্কুলানে অবস্থান করে দিয়েছিলেন কিন্তু সবচেয়ে বেশী করে মনে দাগ কেটেছিল মহারাজের একটি জীবন্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে | সেটাই আজ আমাদের এই মুহুর্তে নিয়ে যাবে সেই অবস্থার সময়ে কিছুক্ষনের জন্য |

   সবার কথা বলা হয়ে যাবার পর  মহারাজের মুখের সামনে টেবিলে মাইক্রোফোনটিকে ঠিক করে দেওয়া হল | মহারাজ ঠাকুর, মা, স্বামীজীর প্রনাম মন্ত্র বলে তাঁহাদের উদ্দেশ্য সশ্রদ্ধ প্রনাম জানিয়ে বলতে শুরু করলেন | যে ঠাকুর , মা, স্বামীজীর আদর্শকে ধরে থাকলে একটি সামান্য মানুষ , অতি পাপী মানুষও কেমনভাবে দেবতায় রুপান্তরিত হয় তাহারই এক প্রাঞ্জল বর্ননা|
   মহারাজ বলতে থাকলেন — বেশ কিছু বছর আগেকার ঘটনা — একটি সকাল বেলায়, সকালের প্রতিনিয়ত কাজের পরিসমাপ্তি করে কিছু লেখা পড়ার কাজে বসেছি হঠাৎই একটি ২০-২২ বছরের এক যুবক এসে আমায় প্রনাম করে একটি খামে করা চিঠি দিল | আমি কিছু জিজ্ঞেস করব তার আগেই ছেলেটি বলল মহারাজ ওর মধ্যেই সব লেখা আছে আপনি আগে পড়ুন তারপর আমাকে যেমন বলবেন আমি তাই করব , আমি এখানে অপেক্ষা করছি |
   চিঠিটা খুলতেই দেখি অল্প কিছু কথা লেখা |
    মহারাজ আমার ভক্তিপূর্ণ প্রনাম গ্রহণ করবেন | ঠাকুর, মা, স্বামীজীর শ্রীচরণে অসংখ্য প্রনাম জানাই |
    আপনার দ্বারা আমার এই জীবনকে যে পবিত্রতাই পৌঁছে দিয়েছিলেন সেই শরীরের বোধহয় এবার যাবার সময় হয়েছে | শুধু যাবার আগে আপনাকে একবার শেষ দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে আর একটা প্রনাম করতে ইচ্ছা হচ্ছে কারন যে জীবনের গতিটাকে আপনি নিজ হাতে পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন সেই মানুষটাকে একবার শেষ দেখা দেখতে ইচ্ছা করছে যে বড় |
  
হঠাৎ এমন একটা চিঠি পেয়ে কেমন যেন আনমোনা হয়ে গেলাম , কিছুই তো বুঝতে পাড়ছিলাম না | পঙ্কজের কথা আমার খুব ভাল মনে আছে| কিন্তু কি বা হলো এমন যে আসন্ন মৃত্যু পথযাত্রী হয়ে শেষ দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করছে | সামনের ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছিল ? তাতে ছেলেটি জানাল সপ্তাহ খানেক আগে তাদের গ্রামের একটি বাড়ীতে হঠাৎ আগুন লেগে যায় , সেই খবর পেয়ে যে যার মতন সাহায্য করার মতন এগিয়ে যায় | তাতে করে কেউ জল ঢালছে, কেউ জিনিসপত্র উদ্ধার করার চেষ্টা করছে ইত্যাদি | বাড়ীর সকলেই অক্ষত অবস্থায় বেড়িয়ে আসলেও একটি ঘড়ের মধ্যে দুটি বাচ্ছা ঘুমোছিল তাদের কথা কেউ মনে রাখেনি | হঠাৎ বাচ্ছাদের কান্নার আওয়াজে সবাইয়ের সংজ্ঞাত ফেরে কিন্তু ওই জ্বলন্ত ঘরের মধ্যে ঢুকবেই বা কি করে ? এই অবস্থায় সবাই পিছিয়ে গেলেও পঙ্কজ চুপ করে থাকে নি | ওই আগুনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পরে উদ্ধার করে কিন্তু বাচ্চাদুটোকে অক্ষত নিয়ে আসলেও নিজে সেই আগুনের কাছে অক্ষত রাখতে পারে নি , ৮০ শতাংশের বেশী পুড়ে গেছিল | এতখানি পুড়ে গেলেও তার চোখে মুখে ছিল এক পরিতৃপ্তি | আমরা সকলে মিলে ধরাধরি করে হাসপাতালে ভর্তি করে দি | কিন্তু সেখানকার ডাক্তারবাবুরা দেখেই বলে দিয়েছিলেন এ সুস্থ হবার পর্যায়ে নেই সুতরাং যতদিন পারুক বেঁচে থাকুক | আর আপনাকে দেখাই ওর শেষ ইচ্ছা — তাই আমাকে দিয়ে আপনাকে নিয়ে আসার জন্য পাঠিয়েছেন | আপনি কি যাবেন মহারাজ ?
   ছেলেটির কথায় আমি কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলাম পঙ্কজের কথা চিন্তা করতে করতে | আমি বললাম তুমি একটু বস আমি তৈরী হয়ে আসছি , আমি নিশ্চয় যাব তোমার সঙ্গে |
    পথে চলেছি — তার কথায় ভেসে উঠছে মনেতে ! প্রথম যেদিন সংশোধনাগারে যাই আমার পরিচয় হয়ে ওঠে এই পঙ্কজের সঙ্গে | অনাথ ছেলে যা হয়, খারাপ সঙ্গে পড়ে চুরি-ছিনতাই এসব করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে | তারপর সেখানে আমার কাছ থেকে প্রথমে দেখে মায়ের একটি ছবি, দীর্ঘক্ষন কোন কথা বলে নি , সেই অবস্থায় মায়ের ছবির দিকে চেয়ে নিশব্দে কাঁদতে কাঁদতে অস্ফুষ্ট স্বরে মা এই একটি শব্দ বেড়িয়েছিল | কথায় কথায় জানতে পারলাম সে অনাথ তাই মা বুঝি ধরা দিলেন এইসব সন্তানের কাছে মা হয়ে | হ্যাঁ ঠিকই তো – তিনি নিজ মুখেই তো বলেছেন আমি সতেরও মা আবার অসতেরও মা | এই অসত সন্তানগুলিই আজ মায়ের খুব প্রয়োজন | বাবা, মায়ের স্নেহচর্যায় বড় তো হয়ে ওঠে নি | তাই ঠাকুর, মায়ের, স্বামীজীর বাণী শুনিয়ে  উদ্বুদ্ধ করি আর জীবনের মানব জীবনকে পরিবর্তন করিয়ে শুরু হয় মানবের উত্তোরনের পথ আর  এভাবেই হয় পড়াশোনা আর জীবিকানির্বাহের  জন্য শুরু করা | সব শরীরের মধ্যে ওর চোখ দুটো ছিল খুব উজ্জল | প্রথম দিকের কথাটি খুব করে মনে পড়ছে আজ,  মায়ের ছবিটা দেখে প্রথমেই মা বলে সে তার কি কান্না | আমাকে বলল আমার মায়ের মুখটাও মনে পরে না, খুব আবছা একটা চিত্র ভেসে ওঠে , সেই ছবি আর এই ছবি একদম যেন হুবাহু মিলে যায় | সেই থেকে তার জীবন ধারন কেমন যেন পরিবর্তন হয়ে গেল | ভাল ব্যবহার আর পড়াশোনা করার জন্য পুলিশ অফিসারের স্নেহের দৃষ্টিতে ধরা পড়ল আর আমাকে খুবই ভালবাসত | আমি যদি কোন কথা বলতাম ও তৎক্ষনাৎ সেই কাজ করত | ছোট বয়স তো | আর জীবনে স্নেহ ভালবাসা পাই নি তাই | জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আমারই নির্দেশে নানান সেবামূলক কাজ শুরু করে দিল আর আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত | আর আমিও তাকে ঠাকুর মায়ের বাণীতে উদীপ্ত করতাম | এই চিন্তা করতে করতে গাড়িটা হসপিটালের সামনে এসেই থামল |
   দ্রুত পায়ে সঙ্গের ছেলেটি নিয়ে যেতে লাগল কারন সময় যে বড় কম | পঙ্কজের কাছাকাছি যেই গেছি তখন তার শ্বাস টান শুরু হয়েছে , ডাক্তারের স্যালাইনের বোতলটি তোরজোর করছে আমি কাছে যেতেই তার চোখে মুখে এক উদীপ্ত সরল শিশুর ন্যায় হাসি খেলে উঠল কয়েক মুহূর্ত ব্যাস — শেষ ! হাসতে হাসতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে শেষ হয়ে গেল তার ইহলোকের__কাজ |
    পারলাম না তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে — যেন তার সেই নির্মল হাসিখানা আমাকে বলে দিয়ে যাচ্ছে , আমি পেরেছি মহারাজ যন্ত্রনাকে__হাসি_করে_ফেলতে | আমি সেই জয় নিয়ে আসতে পেরেছি আমার সেই হারিয়ে যাওয়া মায়ের , আবার ফিরে পাওয়া আমার মায়ের আশীষের সাথে |
    পিছনের জানালা দিয়ে জানালার রডটি ধরে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে মুখ লুকিয়ে নিলাম কারন সাধু হয়েছি বলে কি চোখের জলকে আটকান যায় ! না পারি না !  তাই সকলের অগোচরে পঙ্কজের মুখটাকে অনন্ত আকাশের মধ্যে খুঁজছিলাম | সেই তাকেই বলেছিলাম একদিন,  ভাল কাজ করলে আকাশের বুকে তারা হয়ে থেকে যায় | তাই সন্ধ্যার আকাশে কোন তারাটি আমাদের সেই পঙ্কজ | সত্যিই তার নামের সার্থকতা তার কর্মের মধ্যে দিয়েই দেখিয়ে গেল , যেমন পদ্মফুল পাঁকে হয় কিন্তু তার সৌরভ চারিদিকে মাতোয়ারা করে দেয় আর মায়ের পূজাতে লাগে | তার জীবনখানি দিয়েও সেই মায়ের পূজাতেই লাগল | ধন্য তার জীবন |
    দুরের বাড়ি গুলি থেকে সন্ধ্যার শাখের শব্দ ভেসে আসতে থাকল , কোথাও কাছে হয়তো মসজিদ আছে আর সেখান থেকে উৎসারিত হচ্ছে পবিত্র আল্লার নামের আজানের ধ্বনি | প্রকৃতি তার রং বিস্তার করে বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছে সন্ধ্যার সময় হয়েছে কিন্তু আমি তন্ময় হয়ে শুধু চেয়েই আছি সেই তারাগুলির দিকে এখনও |
বলতে বলতে মহারাজ আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না , টপ টপ করে চোখের জল পড়তে থাকল | শুধু মহারাজ নয় সেই সভার মধ্যে উপিস্থিত সকলের চোখেই জল | কি এক অসাধারন ঘটনা বিবৃত হল এখানে, এই মুহুর্তে |  একদম নিস্তব্ধ হয়ে উঠল সেই সভা | একজন দৌড়ে গিয়ে মহারাজকে ধরে আস্তে আস্তে চেয়ারে বসিয়ে দিল আর মহারাজ দু হাত দিয়ে পঙ্কজের জন্য বারিত অশ্রু মুছতে থাকল |
সভার শেষে একটি বাচ্ছা ছেলে এসে কবিগুরুর একটি গান গাইতে থাকল —
আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে
এ জীবন পুণ্য কর দহন দানে |
আমার এই দেহখানি তুলে ধর
তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ কর
নিশিদিন আলোক শিখা জ্বলুক গানে ||
আঁধারের গায়ে গায়ে পরশ তব
সারা রাত ফোটাক তারা নব নব |
নয়নের দৃষ্টি হতে ঘুচবে কালো
যেখানে পড়বে সেথায় দেখবে আলো
ব্যাথা মোর উঠবে জ্বলে ঊর্ধ পানে
আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে
এ জীবন পুণ্য কর দহন দানে |
  ধন্য তুমি পঙ্কজ, তোমার নামের জয়গান করি , আজ তুমিই আমাদের জানিয়ে দিয়ে গেলে মানব জীবনের উদ্দেশ্যকে ভোগের জন্য নয় ত্যাগের জন্য | এক নামহীন গোত্রহীন জীবনকে তুমি দেখালে মা, ঠাকুর, স্বামীজীর আদর্শে কিভাবে জীবন গড়ে তোলা যায় |
তার নামের দহন জ্বালিয়ে আমরা অশ্রু সজল নয়নে এক ব্যাথা ভরা আনন্দ নিয়ে আস্তে আস্তে নীরবে সভা থেকে বেড়ালাম, একটি অনবদ্য নতুন জীবনের স্বাদ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যের পথ ধরে |
জয় মা, জয় ঠাকুর, জয় স্বামীজী ||

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started