শ্রীশ্রী মাতৃ–স্মরণিকা : -*
*”ওঁ যথাগ্নের্দাহিকা শক্তিঃ রামকৃষ্ণে স্থিতা হি যা।*
*সর্ববিদ্যাস্বরূপাং তাং সারদাং প্রণমাম্যহম।।“*
*।।জন্মজন্মান্তরের মা।।*
*যা দেবী সা সারদা*
– স্বামী চেতনানন্দ।
ঠাকুরের দেহত্যাগের পর মা কামারপুকুরে এক বছর ছিলেন। ওই কালে বিকৃত–মস্তিষ্ক হরিশ একদিন মায়ের পিছু নেয়। মা ধানের গোলার চারদিকে সাতবার ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন।
তাঁর আত্মকথা : “তখন… নিজ মূর্তি ধরে দাঁড়ালুম। তারপর ওর বুকে হাঁটু দিয়ে জিব টেনে ধরে, গালে এমন চড় মারতে লাগলুম যে, ও হেঁ হেঁ করে হাঁপাতে লাগল। আমার হাতের আঙ্গুল লাল হয়ে গিছল।“
শ্রীমা ‘নিজ মূর্তি‘ শব্দটি কোন অর্থে প্রয়োগ করেছিলেন, এখন তা নিশ্চয় করা দুঃসাধ্য। তবে জীবনীকারদের মতে তিনি বগলামূর্তিতে হরিশের কুপ্রবৃত্তিকে কঠোরহস্তে দমন করেছিলেন।
সুরেন্দ্রনাথ সেন স্বামী বিবেকানন্দের কাছে দীক্ষার জন্য যান। স্বামীজী তাঁকে দীক্ষা না দিয়ে বলেন, “ঠাকুর বললেন, আমি তোর গুরু নই। তিনি দেখিয়ে দিলেন, তোকে যিনি দীক্ষা দেবেন তিনি আমার চাইতেও বড়।“
সুরেন্দ্র সেন মর্মাহত হলেন। কিছুকাল পরে তিনি এক রাত্রে স্বপ্ন দেখেন যে, একটি উজ্জ্বল দেবীমূর্তি তাঁকে বলছেন, “একটি মন্ত্র নাও। আমি সরস্বতী।“
সুরেন্দ্র সেন পরবর্তী কালে জয়রামবাটীতে মায়ের কাছে দীক্ষা নেন। মার দেওয়া মন্ত্র শুনে তাঁর স্বপ্ন–দীক্ষার কথা মনে জেগে উঠল এবং বিস্ময়ে দেখলেন যে তাঁর স্বপ্নদৃষ্ট দেবীমূর্তি ও মায়ের মূর্তি এক।
১৯১২ সালে শ্রীমা মঠে দুর্গাপূজা দেখতে যান। দেবীর বোধন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মায়ের গাড়ি মঠে পৌঁছাল। গোলাপ–মা মাকে হাত ধরে গাড়ি থেকে নামালেন।
নামবার পরেই সমস্ত দেখে মা বললেন, “সব ফিটফাট, আমরা যেন সেজেগুজে মা দুর্গাঠাকরুন এলুম।” স্বামীজীর ভাষায় মা সত্যি ছিলেন ‘জ্যান্ত দুর্গা‘।
কোয়ালপাড়ার হরিপদ মাঝি তাঁদের কুলগুরুর কাছে দীক্ষা পান। শ্রীমা তাঁকে খুব স্নেহ করতেন। একদিন মা তাঁকে বললেন, “তোমার ইষ্টমন্ত্রটি উচ্চারণ করে শুনাও তো আমাকে।“
হরিপদ অসঙ্কোচে মায়ের আদেশ পালন করা মাত্র – সম্মুখে দাঁড়ানো দেবী সারদাকে দর্শন করলেন অশেষ মহিমান্বিত শ্রীদুর্গারূপে। ইষ্টসাক্ষাৎকার অমন আচম্বিতে হওয়ামাত্র তিনি মায়ের শ্রীপদে আত্মসমর্পণ করেন।
এখন চন্ডীর আলোকে আমরা মা সারদার দেবী রূপ দেখার চেষ্টা করব।
চন্ডীর পঞ্চম অধ্যায়ে দেবগণ শুম্ভ–নিশুম্ভকে (অহং ও মম–র প্রতীক) বধের জন্য দেবীর স্তুতি শুরু করলেন। গ্রন্থের ১৪ থেকে ৮০ মন্ত্রে ২৩টি রূপ বর্ণিত হয়েছে।
আমাদের দেশে আবালবৃদ্ধ–বনিতার মুখে ‘যা দেবী সর্বভূতেষু… নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ‘ শোনা যায়।
প্রথম ‘নমস্তস্যৈ‘ পদের দ্বারা মায়ের কারণাতীত তুরীয় প্রকৃতিকে প্রণাম করা হয়েছে।
এতবার প্রণামের উদ্দেশ্য কী? শাস্ত্র বলেন, অহংকারই মূল অসুর। এই অসুর মারার একমাত্র অস্ত্র আছে ‘নমঃ‘, অর্থাৎ ‘ন মম‘ – আমার নয়। মা, সব তোমার। এইভাবে অহংবোধ নস্যাৎ করলে মা আবির্ভূতা হন। এই প্রণাম মন্ত্রের দ্বারা সন্তুষ্ট হয়ে দেবী দেবগণের সম্মুখে নিজরূপে প্রকটিত হলেন।
*”জননীং সারদাং দেবীং রামকৃষ্ণং জগদ্গুরুম্।*
*পাদপদ্মে তয়ো শ্রিত্বা প্রণমামি মুহুর্মুহুঃ।।
