জন্মজন্মান্তরের মা।।*
*শ্রীরামকৃষ্ণ–শক্তি শ্রীমা*
– প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা।
শ্রী রামকৃষ্ণের জীবনাদর্শ সম্পর্কে শ্রীমা কেবল অবহিত ছিলেন না, তাঁর নিকট সমাগত সব ভক্তকেই তিনি চিনতেন, যদিও দুই–একজন ব্যতীত তাদের সঙ্গে বাক্যালাপ ছিল না।
কে কোন স্তরের, কার সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের কিরূপ ব্যবহার, সব তাঁর জানা ছিল। যার ফলে পরবর্তী কালে একদিকে তিনি যেমন শত শত নরনারীকে শিষ্যরূপে গ্রহণ করে তাদের অধ্যাত্মজীবন পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন, তেমনি শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্তগণেরও তিনিই ছিলেন আশ্রয়স্থল।
আবার বহুবিধ সমস্যায় শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্ঘের কর্তৃপক্ষকেও মূল্যবান পরামর্শ ও নির্দেশ তিনিই দিয়েছেন।
একদিকে আত্মীয়স্বজন, ভক্ত, ভালোমন্দ নিয়ে বৃহৎ সংসারের সুগৃহিণী, অন্যদিকে অধ্যাত্মপিপাসু ভক্তগণের তৃষ্ণা নিবারণ, আবার সতত সঙ্ঘের কল্যাণে রত।
আর সবগুলিই এত সাধারণ ও স্বাভাবিকভাবে করতেন যে কারও মনে করার অবকাশ ছিল না যে তিনি অতিশয় দুরূহ কোনও কাজ সম্পাদন করছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণের অন্তর্ধানের পর কিছুকাল কামারপুকুরে দারিদ্রের সঙ্গে তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়েছিল, লোকশিক্ষার জন্য তার প্রয়োজনও ছিল।
শ্রী রামকৃষ্ণের নির্দেশ – সাধারণ লোকের জন্য সংসার ত্যাগ নয় বরং সংসারে থেকেই ঈশ্বরলাভের পথ প্রশস্ততর।
কিন্তু কাজটা সহজ নয়। শ্রীরামকৃষ্ণ তো কখনও সংসার–জীবন যাপন করেননি। সেখানে প্রতিপদে যে দ্বন্দ্ব, সমস্যা, কলহ, অশান্তি – সেই পরিবেশে ঈশ্বরচিন্তা কি সম্ভব?
নিজের জীবন দিয়ে ওই আদর্শের দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্যই যেন শ্রীশ্রীমা আজীবন সংসারে বাস করে গেলেন।
সেখানে প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিপদে অসংখ্য ঘটনার মধ্যে তাঁর যে অপূর্ব সহনশীলতা, অপার স্নেহ, বিচক্ষণতা ও অনন্ত ক্ষমার পরিচয় পাওয়া যায়, নারীমাত্রেরই তা আদর্শস্থল, শত কর্মকোলাহলের মধ্যে তাঁর ঈশ্বরাভিমুখী চিত্ত প্রমান করে অদ্বৈতজ্ঞান আঁচলে বেঁধে সংসার করা সম্ভব।
নিজের সম্বন্ধে শ্রীশ্রীমার উক্তি, ঠাকুর তাঁকে রেখে গেছেন মাতৃভাব বিকাশের জন্য। তাঁর এই অপূর্ব মাতৃভাবের কথা এখানে পৃথকভাবে বলব না কারণ তাঁর জীবনী ছাড়াও বহুজন এ তত্ত্ব আলোচনা করেছেন বিস্তৃতভাবে।
আমাদের দেশে মেয়েদের মধ্যে এই মাতৃত্বের বিকাশ ছিল সহজাত, এখনও আছে যা বহুক্ষেত্রে নিজ সন্তানের গন্ডি অতিক্রম করে। শ্রীশ্রীমার জীবনে অবশ্য তার বিকাশ অদ্ভুত। দেশ–কাল, জাতি–বর্ণের কোনও পার্থক্য দেখা যেত না।
তাঁর উদার মাতৃহৃদয় নির্বিচারে যে কাছে এসেছে তাকেই আশ্রয় দেবার জন্য সতত উন্মুখ।
কিন্তু সেই মাতৃহৃদয়ে কেবল স্নেহ–বাৎসল্য ছিল মনে করলে ভুল হবে। প্রয়োজনস্থলে সন্তানের কল্যাণের জন্য কঠোরতাও ছিল, আর কদাপি ছিল না জাগতিক উচ্ছ্বাস।
তাঁকে উপলক্ষ বা কেন্দ্র করে ভক্ত ও শিষ্যদের উচ্ছ্বাস, প্রচারের বাহুল্য, ভাবের অতিশয়োক্তি ইত্যাদি কোনওদিন তাঁর কাছে প্রশ্রয় পায়নি।
‘আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ‘ – স্বামীজীর প্রতিষ্ঠিত সঙ্ঘ আজ বিশ্বের সর্বত্র সমাদৃত। বর্তমানে ওই সঙ্ঘের অনুসরণে বহু সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ও লোককল্যাণকার্যে অগ্রণী।
কিন্তু ঠিক সেই সময় তার প্রকৃত মূল্যায়ন করা কঠিন ছিল। বিরুদ্ধ সমালোচনা কম ছিল না। এমনকি, তাঁর গুরুভাইদের মধ্যেও কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষাবিহীন, অতি সাধারণ এক পল্লীরমণী সর্বতোভাবে ওই আদর্শকে সমর্থন ও সাহায্য করেছেন। উৎসাহ দিয়েছেন সকলকে স্বামীজী প্রবর্তিত সেবাব্রত বা নিঃস্বার্থ কর্মযোগে।
*”জননীং সারদাং দেবীং রামকৃষ্ণং জগদ্গুরুম্।*
