p { margin-bottom: 0.25cm; line-height: 120%; }
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
নাস্তিক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের | কেমন ছিল দুই কিংবদন্তির সাক্ষাৎ ? জানতে ফিরে যেতে হবে ১৩৩ বছর আগে, সেই মাহেন্দ্রক্ষণে …
১৬ আগস্ট‚ ঠাকুরের প্রয়াণদিবসে দুই মহাপুরুষের সেই সাক্ষাৎ নিয়ে বিশেষ রচনা ১৮৮২ শনিবার তিথি‚ শ্রাবণমাসের কৃষ্ণাষষ্ঠী সময়‚ বিকেল চারটে স্থান‚ কলকাতার বাদুড়বাগান
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস জানেন‚ সাগরদর্শনের এ এক পরমলগ্ন |
এ সাগর যে সে সাগর নয় |
বিদ্যার সাগর |
শ্রীরামকৃষ্ণ একটি ঠিকে গাড়ি ভাড়া করেছেন |
কলকাতার রাজপথ পেরিয়ে তিনি চলেছেন বাদুড়বাগানের দিকে |
তাঁর সমস্ত মন সাগরময় হয়ে আছে |
তিনি অনন্তের চৈতন্যে নিমগ্ন |
দেরি হয়ে যাচ্ছে না তো ? সাগরদর্শনের সঠিক সময় যে বিকেল চারটে !
ঘোড়া আরও জোরে ছুটছে না কেন ?
সাগরদর্শনের পরম লগ্নটি যে দীপ্যমান হয়ে উঠেছে ঠাকুরের ধ্যানের মধ্যে!
শ্রীরামকৃষ্ণের ঠিকে গাড়ি এইমাত্র পেরোচ্ছে আমহার্স্ট স্ট্রিটে রামমোহন রায়ের বাগানবাড়ি | চারটে বাজতে এখনও কয়েক মিনিট বাকি |
গাড়ি ছেড়েছে দক্ষিণেশ্বরের কালীবাড়ি থেকে |
অনেক দূরের পথ |
পোল পার হয়ে‚ শ্যামবাজার পার হয়ে গাড়ি আমহার্স্ট স্ট্রিটে পৌঁছেছে |
ঠাকুরের সঙ্গে রয়েছেন তিন ভক্ত‚ ভবনাথ‚ হাজরা আর মাষ্টার(মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত) |
একজন বললেন‚ বাদুড়বাগান এসে গেল বলে |
আর একজন ঠাকুরকে বললেন‚ দেখুন‚ দেখুন‚ রাজা রামমোহনের কত বড় বাগানবাড়ি !
শ্রীরামকৃষ্ণ বেশ বিরক্ত হলেন | বললেন‚ ও সব ভোগবিলাসের কথা ভাল লাগছে না গো |
তিনি ভাবাবিষ্ট হয়ে আছেন সাগরচৈতন্যে |
সাগর তো অনন্ত |
তিনি অনন্তে ডুবে আছেন |
রামমোহনের বাগানবাড়ি দেখার কোনও সাধ নেই তাঁর |
শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মভূমি হুগলি জেলার কামারপুকুর গ্রাম |
আর বিদ্যাসাগরের জন্মভূমি বীরসিংহ গ্রাম |
কামারপুকুর থেকে বীরসিংহ খুব দূরের পথ নয় |
সেই কারণেই হয়তো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে খুব কাছের মানুষ মনে হয় শ্রীরামকৃষ্ণের |
শুধুই মনে মনে এই নৈকট্য বোধ |
ঠাকুরের মনে ভারী ইচ্ছে‚ বীরসিংহ গ্রামের সিংহটির সঙ্গে একবার অন্তত দেখা করার |
সেই সুযোগ এল‚ যখন মাস্টার বিদ্যাসাগরের স্কুলে মাস্টারি শুরু করলেন |
‘মাস্টার‘ অর্থাৎ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতের রচয়িতা শ্রী ম |
পুরোনাম‚ মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত | ঠাকুরের পরম ভক্ত |
ঠাকুরই মাস্টারকে জিজ্ঞেস করলেন‚ আমাকে বিদ্যাসাগরের কাছে একদিন নিয়ে যাবে ? আহা‚ দক্ষিণেশ্বরের কালীবাড়িতে থাকতে–থাকতে বিদ্যে আর দয়ার কথা কত শুনেছি | তিনি বিদ্যেরও সাগর‚ দয়ারও সাগর |
মহেন্দ্র গুপ্ত বিদ্যাসাগরকে বললেন‚ দক্ষিণেশ্বরের শ্রীরামকৃষ্ণ আপনার সঙ্গে একদিন দেখা করতে চান | ভারী ইচ্ছে তাঁর‚ আপনার সঙ্গে আলাপ করার |
বিদ্যাসাগর হেসে বললেন‚ তুমি তো জানো মাস্টার‚ আমি নাস্তিক মানুষ | ঈশ্বর সত্যিই আছেন কি না‚ সে–বিষয়ে আমার গভীর সন্দেহ | সত্যি কথা বলতে‚ ভগবানের ব্যাপারে আমার কোনও আগ্রহই নেই | সুতরাং সাধুসন্ন্যাসীদের কাছ থেকেও আমি দূরে থাকি |
মাস্টার বিদ্যাসাগরের কথা শুনে নীরব রইলেন |
ঈশ্বরচন্দ্র বুঝলেন তিনি মহেন্দ্রকে আঘাত করেছেন |
জিজ্ঞেস করলেন‚ বলতো মাস্টার‚ ইনি কীরকম পরমহংস ? তিনি কি গেরুয়া পরা সন্ন্যাসী?
মাস্টার এবার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চোখে চোখ রেখে কিঞ্চিৎ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন‚ আজ্ঞে না | তিনি এক অদ্ভুত পুরুষ | লালপেড়ে কাপড় পরেন | জামা পরেন | বার্নিশ করা চটি জুতো পরেন |
রাসমণির কালীবাড়িতে একটি ঘরের ভেতর বাস করেন | সেই ঘরে তক্তাপোশ পাতা আছে | তার ওপর বিছানা | মশারিও আছে | সেই বিছানায় তিনি শয়ন করেন | তিনি যে সন্ন্যাসী‚ তার কোনও বাহ্যিক চিহ্ন নেই | তবে ঈশ্বর বই আর কিছু জানেন না | অহর্নিশি তাঁরই চিন্তা করেন |
বিদ্যাসাগর মহেন্দ্রনাথের কথায় হেসে ফেললেন | বললেন‚ বেশ বেশ !তাহলে তাঁকে নিয়ে এসো একদিন |
আপনি কবে যাবেন ? বিদ্যাসাগর আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান | ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে বললেন মহেন্দ্র |
শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের মধ্যে ডুব দিলেন | তাঁর চোখেমুখে ফুটে উঠল দৈব উদ্ভাস |
শ্রীরামকৃষ্ণ মধুর কণ্ঠে বললেন‚ এই শনিবার‚ সেদিন শ্রাবণের কৃষ্ণাষষ্ঠী | সাগরদর্শনের লগ্ন বিকেল চারটে |
বিদ্যাসাগরের বয়েস ঠিক বাষট্টি |
শ্রীরামকৃষ্ণ ষোল বছরের ছোট |
তিনি ছেচল্লিশ |
বিদ্যাসাগরের প্রতি তাঁর হৃদয়ে বড় শ্রদ্ধা আর ভালবাসা |
বিকেল ঠিক চারটে |
শ্রীরামকৃষ্ণের ঠিকে গাড়ি এসে দাঁড়াল বিদ্যাসাগরের বাড়ির সামনে |
ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হয়ে আছেন |
মহেন্দ্র বললেন‚ এবার নামতে হবে | আমরা এসে গেছি |
ঠাকুর ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামলেন | মাস্টার পথ দেখিয়ে বাড়ির মধ্যে নিয়ে যাচ্ছেন |
উঠোনে ফুল গাছ | ঠাকুর মুগ্ধ হয়ে বাড়িটি দেখছেন |
কী সুন্দর বাড়ি !
শান্তির নীড় | সমস্ত বাড়িটি যেন ধ্যানের মন্দির‚ মনে হল শ্রীরামকৃষ্ণের |
তিনি শুনেছেন ঈশ্বরচন্দ্র নাকি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না !
মৃদু হাসি ফুটে উঠল শ্রীরামকৃষ্ণের মুখে |
চলতে–চলতে হঠাৎ তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন | মহেন্দ্র জিজ্ঞেস করলেন‚ কী হল‚ থামলেন কেন ?
ঠাকুর নিজের জামার বোতামে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন |
বালকের সারল্য তাঁর মুখে |
তিনি জিজ্ঞেস করলেন‚ মাস্টার‚ আমার জামার বোতামটা যে খোলা রয়েছে‚ এতে কোনও দোষ হবে না তো ?
শ্রীরামকৃষ্ণের গায়ে একটি লংক্লথের জামা | পরনে লালপেড়ে কাপড় | কাপড়ের কোঁচাটি কাঁধে ফেলা | পায়ে বার্নিশ করা চটিজুতো |
মাস্টার বললেন‚ আপনি খোলা বোতাম নিয়ে ভাববেন না | আপনার বোতাম দেবার দরকার নেই | আপনার কিছুতে দোষ হবে না |
বালককে বুঝালে যেমন নিশ্চিন্ত হয়‚ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস তেমনি নিশ্চিন্ত হলেন | তিনি চলতে শুরু করলেন মহেন্দ্রর পিছন পিছন |
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বাড়িটি দোতলা | অধিকাংশ বাঙালি বাড়ির মতো নয় | এ–বাড়ি দেখলে ইংরেজের পছন্দ হবে | তবে বাড়তি বিলাসিতার চিহ্নও কোথাও নেই | বাড়িটি দেখলেই মনে হয়‚ বাড়িটি যাঁর‚ তিনি বিলাসবিরোধী | তাঁর আত্ম প্রত্যয় ও সংযম এতই বেশি যে তিনি নিজেকে কোনওভাবে জাহির করতে চান না |
তিনি পছন্দ করেন নিভৃতি |
উপভোগ করেন নির্জনতা |
তিনি কাজের জীবন ও ব্যক্তিগত জীবনকে আলাদা করে রাখতে চান |
তিনি একাকীত্বপ্রিয় |
বিদ্যাসাগরের বাড়ির চারপাশে অনেকখানি খোলা জমি |
জমিটি উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা |
বাড়ির পশ্চিম দিকে সদর দরজা | বেশ বড় গেটওলা বাড়ি |
পশ্চিমদিকের প্রাচীর আর বাড়ির মাঝখানে একটি ফুলের বাগান |
শ্রীরামকৃষ্ণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন সেই ফুলগুলির দিকে |
বিদ্যাসাগর ফুল ভালবাসেন | শ্রীরামকৃষ্ণ বুঝতে পারেন‚ মানুষটির ওপর যতই কঠিন হোক‚ ভেতরটা নরম |
মাস্টার বলেন‚ এই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে আসুন |
পশ্চিম দিকে নীচে একটা ঘর আছে | সেই ঘর থেকে ওপরে যাবার সিঁড়ি |
শ্রীরামকৃষ্ণ প্রথম ধাপটিতে পা রাখলেন |
মহেন্দ্র দেখলেন‚ তাঁর চোখ দুটি এক আশ্চর্য আলোয় ঝলমল করছে |
শ্রীরামকৃষ্ণ জানেন কী হতে চলেছে |
তাঁর তৃতীয় নেত্র দেখতে পাচ্ছে ভবিষ্যৎ !
দোতলায় থাকেন বিদ্যাসাগর |
সিঁড়ি দিয়ে উঠেই উত্তরে একটি কামরা |
তার পুবদিকে হলঘর |
হলঘরের দক্ষিণ–পুবে বিদ্যাসাগরের শোবার ঘর |
তার দক্ষিণে আরও একটি কামরা | এই কামরাগুলি বহুমূল্য পুস্তকে পরিপূর্ণ্|
দেওয়ালের কাছে সারিসারি অনেকগুলি পুস্তকাধার | তাতে বাঁধানো বইগুলো কী সুন্দরভাবে সাজানো ! একসঙ্গে এত বই !
বালকের মতো অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন শ্রীরামকৃষ্ণ |
এত জেনেও মানুষটি ‘এক‘–কে জানেনি !
‘এক‘–কে জানাই তো সব জানা |
তাঁকে না জানলে আর সব জানাই তো বৃথা |
তিনি এগিয়ে চলেন বিদ্যাসাগরের ঘরের দিকে |
হলঘরটার পুবদিকে একেবারে শেষে একটি টেবিল ও চেয়ার |
বিদ্যাসাগর যখন কাজ করেন তখন এখানে তিনি পশ্চিমাস্য হয়ে বসেন |
টেবিলের চারধারে চেয়ার |
যাঁরা কাজের সময় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন‚ তাঁরা সেই চেয়ারে বসেন | বিদ্যাসাগরের টেবিলে লেখাপড়ার অনেক সামগ্রী — কাগজ‚ কলম‚ দোয়াত‚ কালি‚ ব্লটিং–পেপার‚ হিসাব–পত্রের বাঁধানো খাতা‚ দু‘চারখানি বিদ্যাসাগর–প্রণীত পাঠ্যপুস্তকও আছে |
এই কাজের ঘরের ঠিক দক্ষিণে‚ বিদ্যাসাগরের কাঠের চেয়ারটির ঠিক পাশেই বলা যায়‚ তাঁর বিছানা | কাজের শেষে তাঁর বিশ্রাম ও নিদ্রার জায়গা |
একটি জরুরি কথা বলবার জন্যে আলাদা রেখেছি |
বিদ্যাসাগরের টেবিলে অন্যান্য জিনিসের মধ্যে ছড়ানো আছে অনেক চিঠিপত্রও | চিঠিগুলির দিকে এবার একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক —
কোনও বিধবা লিখেছে‚ আমার অপোগণ্ড শিশু অনাথ‚ দেখবার কেউ নেই‚ আপনাকে দেখতে হবে |
আর একজন লিখছে‚ আপনি কার্মাটার চলে গিয়েছিলেন‚ তাই আমরা মাসোহারা ঠিক সময়ে পাইনি | বড় কষ্ট হচ্ছে |
এক গরিব ছাত্র লিখছে‚ আপনার স্কুলে ফ্রি ভর্তি হয়েছি‚ কিন্তু আমার বই কেনবার ক্ষমতা নেই |
কেউ বা লিখেছে‚ আমার পরিবারবর্গ খেতে পাচ্ছে না‚ আমাকে একটা চাকরি করে দিতে হবে |
বিদ্যাসাগরের স্কুলের এক শিক্ষকের চিঠিও আছে —
আমার ভগিনী বিধবা হয়েছে‚ তার সমস্ত ভার আমাকে নিতে হয়েছে | এ বেতনে আমার চলে না |
কেউ লিখছেন‚ অমুক তারিখে সালিসির দিন নির্ধারিত | আপনি সেদিন এসে আমাদের বিবাদ মিটিয়ে দিন |
একটি ইংরেজি চিঠি এসেছে বিলেত থেকে | নির্ভুল‚ সুঠাম ইংরেজিতে পত্রদাতার বক্তব্য –
আমি এই প্রবাসে বিপদগ্রস্ত‚ ঋণে আকণ্ঠ ডুবে আছি‚ উপবাসে কাটছে‚ আপনি দীনের বন্ধু‚ দয়ার সাগর‚ কিছু টাকা পাঠিয়ে বিপদ থেকে আমাকে রক্ষা করুন |
করুণাময় বিদ্যাসাগরের হৃদয় কাঁদে সকলের জন্য | কাউকে তিনি ‘না‘বলতে পারেন না |
সাহায্যপ্রার্থীর কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারেন না কখনও |
শ্রীরামকৃষ্ণের মনে একটি প্রশ্ন — প্রথম দেখা হওয়ার সময় বিদ্যাসাগর দক্ষিণমুখী হয়ে বসবে তো ?
সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এলেন শ্রীরামকৃষ্ণ |
উঠে এসেই প্রবেশ করলেন উত্তরের ঘরটিতে | ভক্তেরাও এল সঙ্গে |
ঠাকুর দেখলেন‚ বিদ্যাসাগর আজ দক্ষিণাস্য হয়েই বসে আছেন !
ঠাকুর একবার শুধু বললেন‚ জয় মা !
বিদ্যাসাগর ঘরের উত্তর কোণে দক্ষিণমুখী |
তাঁর সামনে পালিশ করা চারকোণা লম্বা টেবিল |
টেবিলের পুব দিকে একখানি বেঞ্চ |
দক্ষিণে ও পশ্চিমে কয়েকটি চেয়ার |
বিদ্যাসাগর কাজ করছেন না‚ তাই তিনি পশ্চিমাস্য নন | তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের জন্য অপেক্ষা করছেন আর দক্ষিণাস্য হয়ে দু–একটি বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছেন |
ঠাকুর প্রবেশ করতেই বিদ্যাসাগর দাঁড়িয়ে উঠে তাঁকে অভ্যর্থনা করলেন |
ঠাকুর একদৃষ্টে বিদ্যাসাগরের দিকে তাকিয়ে | তাঁরা যেন পূর্বপরিচিত |
ঠাকুরের মুখে মধুর হাসি |
বিদ্যাসাগর চুপ করে দাঁড়িয়ে |
তাঁর পরনে থান কাপড় | পায়ে চটিজুতো | গায়ে একটি হাতকাটা ফ্লানেলের ফতুয়া | মাথার চারপাশ কামানো |
তিনি একটু হাসলেন | দাঁতগুলি উজ্জ্বল |
সমস্তই বাঁধানো দাঁত |
বিদ্যাসাগরের মাথাটি অস্বাভাবিক বড় | উন্নত ললাট |
বিদ্যাসাগর বেশ বেঁটে |
গলায় মোটা উপবীত‚ ফতুয়ার পাশ থেকে বেড়িয়ে আছে |
শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবাবিষ্ট | তিনি একইভাবে দাঁড়িয়ে আছেন | আর ভাব সংবরণ করবার জন্যে মধ্যে মধ্যে বলছেন‚ জল খাবো | দেখতে–দেখতে বাড়ির ছেলেরা ও আত্মীয় বন্ধুরা এসে দাঁড়ালেন |
ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হয়ে বেঞ্চে বসে পড়লেন |
আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীরে জ্বালা ধরল |
একটি সতেরো–আঠেরো বছরের ছেলে সেই বেঞ্চিতে বসে আছে | বিদ্যাসাগরের কাছে পড়াশোনার সাহায্য প্রার্থনা করতে এসেছে ছেলেটি |
ঠাকুর ভাবাবিষ্ট | ঋষির অন্তর্দৃষ্টি তাঁর | ছেলেটির অন্তরের ভাব তিনি বুঝে ফেলেছেন | তাই তাঁর শরীরে জ্বালা |
ঠাকুর ছেলেটির কাছ থেকে দূরে সরে গেলেন | বললেন‚ মা‚ এ ছেলের বড় লোভ | সংসার ছাড়া কিছু বোঝে না | মা গো‚ তোমার অবিদ্যার সংসার !এ অবিদ্যার ছেলে !
যে ব্যক্তি ব্রহ্মবিদ্যার জন্য ব্যাকুল নয়‚ শুধু চায় অর্থকরী বিদ্যা‚ ঠাকুর তাকেই বলছেন অবিদ্যার সংসারে অবিদ্যার ছেলে !
বিদ্যাসাগর ধাক্কা খেলেন | এক ধাক্কাতেই চিড় ধরল তাঁর প্রত্যয়ে |
তিনি নিজেও তো ব্রহ্মবিদ্যার কথা ভাবেন না কখনও !
বিদ্যাসাগর ব্যস্ত হয়ে একজনকে জল আনতে বললেন |
তারপর মহেন্দ্রকে জিজ্ঞেস করলেন‚ মাস্টার‚ কিছু খাবার আনালে ইনি খাবেন কি ?
মহেন্দ্র বললেন‚ আজ্ঞে‚ আনুন না |
বিদ্যাসাগর নিজেই ভিতরে গিয়ে কতকগুলি মিঠাই আনলেন | বললেন‚ এগুলি বর্ধমান থেকে এসেছে |
ঠাকুর কিছু খেলেন | হাজরা‚ ভবনাথও কিছু পেলেন |
বিদ্যাসাগর মহেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে বললেন‚ তুমি তো ঘরের ছেলে |
ঠাকুর মিষ্টিমুখ করছেন আর বালকের মতো হাসছেন | দেখতে–দেখতে একঘর লোক হয়ে গেল | কেউ বসে | কেউ দাঁড়িয়ে |
ঠাকুর এতক্ষণ বিশেষ কথা বলেননি | এবার একঘর লোকের সামনে বিদ্যাসাগরের দিকে তাকিয়ে বললেন‚ আজ সাগরে এসে মিললাম | এতদিন খাল – বিল – হদ্দনদী দেখেছি | এইবার সাগর দেখছি |
ঠাকুরের এই প্রাণখোলা বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতায় সবাই হাসতে আরম্ভ করল |
বিদ্যাসাগরও কম যান না | তিনি সহাস্যে বললেন‚ তবে নোনা জল খানিকটা নিয়ে যান |
ঠাকুর সঙ্গে সঙ্গে বললেন‚ না গো ! নোনা জল কেন ? তুমি তো অবিদ্যার সাগর নও | বিদ্যার সাগর | তুমি ক্ষীরসমুদ্র | ঘরের সকলে হেসে উঠলেন |
বিদ্যাসাগর দেখলেন ঠাকুরের সঙ্গে কথায় পারবেন না | শুধু বললেন‚ ক্ষীর–সমুদ্র ! তা বলতে পারেন বটে !
বিদ্যাসাগর চুপ | কথা বলছেন শ্রীরামকৃষ্ণ | বিদ্যাসাগর শুনছেন |
মাঝে মধ্যে প্রশ্ন করছেন আগ্রহী ছাত্রের মতো |
ঠাকুর একেবারেই লেখাপড়া জানেন না | নিজের নামটিও সই করতে পারেন না |
তবু ঠাকুর বলছেন | আর শুনছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর !
বিদ্যাসাগরের মনে হচ্ছে‚ বেদান্ত উচ্চারিত হচ্ছে ঠাকুরের কণ্ঠে !
অথচ কী সহজ সরল শ্রীরামকৃষ্ণের মুখের ভাষা !
শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন‚ তোমার কর্ম সাত্ত্বিক কর্ম | সত্ত্বগুণ থেকে দয়া হয় | দয়ার জন্য যে কর্ম করা যায়‚ সে রাজসিক কর্ম বটে‚ কিন্তু এ রজোগুণ সত্ত্বের রজোগুণ‚ এতে দোষ নেই | শুকদেবাদি লোকশিক্ষার জন্যে দয়া রেখেছিলেন | ঈশ্বর–বিষয় শিক্ষা দেবার জন্যে | তুমি বিদ্যাদান‚ অন্নদান করছ‚ এও ভাল | নিষ্কাম করতে পারলেই এতে ভগবান লাভ হয় | কেউ কেউ করে নামের জন্যে‚ কেউ করে পুণ্যের জন্যে | তাদের কর্ম নিষ্কাম নয় | আর সিদ্ধ তো তুমি আছোই |
বিদ্যাসাগর শ্রীরামকৃষ্ণের শেষ কথাটার অর্থ ঠিক ঠাওর করতে পারলেন না | জিজ্ঞেস করলেন‚ আমি সিদ্ধ ! কেমন করে ?
শ্রীরামকৃষ্ণ ভারি মিঠে করে উত্তর দিলেন‚ আলু পটল সিদ্ধ হলে তো নরম হয় | তা তুমি তো খুব নরম | তোমার অত দয়া !
সকলে হেসে উঠলেন |
বিদ্যাসাগর রসিক মানুষ | মুহূর্তে বললেন‚ কলাইবাটা সিদ্ধ তো শক্তই হয় |
আবার সকলের হাসি |
এবার ঠাকুর কী বলবেন ?
ঠাকুর বললেন‚ তুমি তা নও গো | ‘শুধু‘ পণ্ডিতগুলো দরকচাপড়া | তুমি তো শুধু পণ্ডিত নও | তুমি বিদ্যার সমুদ্র | শুধু পণ্ডিতগুলোর না এদিক‚ না ওদিক | শকুনি খুব উঁচুতে ওঠে | কিন্তু নজর ভাগাড়ে | যারা শুধু পণ্ডিত‚ শুনতেই পন্ডিত | কিন্তু তাদের কামিনীকাঞ্চনে আসক্তি — শকুনের মতো পচামড়া খুঁজছে |
আসক্তি অবিদ্যার সংসারে | দয়া‚ ভক্তি‚ বৈরাগ্য বিদ্যার ঐশ্বর্য |
বিদ্যাসাগর নীরব | তিনি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন এক আনন্দময় পুরুষের দিকে | পান করছেন তাঁর কথামৃত |
বিদ্যাসাগর মহাপণ্ডিত |
তিনি ষড়দর্শন পাঠ করেছেন |
জানতে চেয়েছেন ঈশ্বরকে | আর এইটুকু বুঝতে পেরেছেন যে‚ ঈশ্বরের বিষয়ে কিছুই জানা যায় না |
শ্রীরামকৃষ্ণ তাকালেন বিদ্যাসাগরের দিকে | যেন বুঝতে পারলেন বিদ্যাসাগরের মনের কথা | বললেন‚ ব্রহ্মবিদ্যা ও অবিদ্যার পার | তিনি মায়াতীত |
মহাপণ্ডিত বিদ্যাসাগর শুনছেন মুগ্ধ বিস্ময়ে |
বলে চলেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ —
এই জগতে বিদ্যামায়া–অবিদ্যামায়া দুই আছে | জ্ঞান–ভক্তি আছে | আবার কামিনীকাঞ্চনও আছে | সৎ–ও আছে | আবার অসৎ–ও আছে | ভাল আছে | আবার মন্দও আছে | কিন্তু ব্রহ্ম নির্লিপ্ত | ভাল–মন্দ জীবের পক্ষে | সৎ–অসৎ জীবের পক্ষে | ব্রহ্মের ওতে কিছু হয় না |
বিদ্যাসাগর বললেন‚ একটু ব্যাখ্যা করে‚ আরও সহজ করে বুঝিয়ে দিন |
শ্রীরামকৃষ্ণ সহজ সরল হাসি হেসে বললেন‚ প্রদীপ যেমন নির্লিপ্ত‚ ব্রহ্মও সেইরকম | প্রদীপের সামনে কেউ ভাগবত পড়ছে আর কেউ বা জাল করছে | প্রদীপের তাতে কিছু যায় আসে না | কোনও কাজটির সঙ্গেই প্রদীপ যুক্ত হচ্ছে না | সে নির্লিপ্তভাবে শুধু জ্বলছে | যদি বলো দুঃখ‚ পাপ‚ অশান্তি এ সকল তবে কী ? তার উত্তর এই যে ওসব জীবের পক্ষে | ব্রহ্ম নির্লিপ্ত | যেমন ধরো সাপের মধ্যে বিষ আছে | অন্যকে কামড়ালে মরে যায় | সাপের কিন্তু কিছু হয় না |
বিদ্যাসাগরের মুখে রা নেই | তিনি ক্রমে বুঝতে পারছেন‚ এক নিরক্ষর ব্রাহ্মণের মুখে বেদান্ত কী সহজ সরল ভাষায় উচ্চারিত হচ্ছে !
শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন‚ ব্রহ্ম যে কী মুখে বলা যায় না |
সব জিনিস উচ্ছিষ্ট হয়ে গেছে |
বেদ‚ পুরাণ‚ তন্ত্র‚ ষড়দর্শন‚ সব এঁটো |
থামলেন শ্রীরামকৃষ্ণ | তাকালেন বিদ্যাসাগরের মুখের দিকে |
বিস্মিত বিদ্যাসাগর প্রশ্ন করলেন‚ এঁটো কেন ?
শ্রীরামকৃষ্ণ হেসে উত্তর দিলেন‚ মুখে পড়া হয়েছে‚ মুখে উচ্চারণ হয়েছে‚ তাই এঁটো হয়ে গেছে |
কিন্তু একটি জিনিস কেবল উচ্ছিষ্ট হয়নি গো !
সেই জিনিসটি ব্রহ্ম |
ব্রহ্ম যে কী‚ আজ পর্যন্ত কেউ মুখে বলতে পারেনি |
বিদ্যাসাগরের বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল |
আবেগে কাঁপছে তাঁর শরীর |
শ্রীরামকৃষ্ণ বয়েসে অনেক ছোট‚ তবু বিদ্যাসাগরের ইচ্ছে হল তাঁর কাছে নতজানু হওয়ার |
তিনি শুধু কম্পিত কণ্ঠে বললেন‚ আজ একটি নতুন কথা শিখলাম |
ব্রহ্ম উচ্ছিষ্ট হননি !
ঘরে তখন অনেক মানুষের ভিড় হয়ে গেছে |
সবাই শুনছে ঠাকুরের কথা |
কী সহজ‚ কী প্রাণস্পর্শী‚ কী গভীর !
ঠাকুর কী অনায়াসে আড়াল সরিয়ে দিচ্ছেন !
ফুটে উঠছে নতুন আলো |
জাগ্রত হচ্ছে নব চেতনা |
উদ্ঘাটিত হচ্ছে সত্যের মুখ |
শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন‚ এবার একটা গল্প বলছি‚ শোনো |
এক বাপের দুটি ছেলে |
ব্রহ্মবিদ্যা শেখবার জন্যে ছেলে দুটোকে বাপ আচার্যের হাতে দিলেন |
কয়েক বছর পরে তারা গুরুগৃহ থেকে ফিরে এল |
এসে বাপকে প্রণাম করলে |
বাপের এবার ইচ্ছে হল‚ এদের ব্রহ্মজ্ঞান কেমন হয়েছে একটু বাজিয়ে দেখবার |
বড় ছেলেকে জিগ্যেস করলেন‚ বাপ ! তুমি তো সব পড়েছো | ব্রহ্ম কীরূপ বলো দেখি |
বড় ছেলেটি বেদ থেকে নানা শ্লোক বলে বলে ব্রহ্মের স্বরূপ বোঝাতে লাগল |
বাপ শুনলেন | কোনও কথা বললেন না | বড় ছেলে বাপের মনের ভাব বুঝতে পারল না |
এবার ছোট ছেলেকে বললেন‚ তুমি বলো দেখি ব্রহ্মের কী রূপ ?
ছোট ছেলের মুখে কোনও কথা নেই |
সে হেঁট মুখে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকল |
বাপ প্রসন্ন হয়ে ছোট ছেলেকে বললেন‚ বাপু‚ তুমি একটু বুঝেছো | ব্রহ্ম যে কী তা মুখে বলা যায় না |
শ্রীরামকৃষ্ণ কিছুক্ষণ থামলেন | তিনি জানেন‚ সাধারণ মানুষকে তাঁর কথার মর্ম বুঝতে একটু সময় দিতে হয় |
তারপর তাঁর গল্পের সূত্রটি ধরেই বললেন‚ মানুষ মনে করে আমরা তাঁকে জেনে ফেলেছি |
কিন্তু সত্যি কি জানা যায় ?
জানা গেলেও কতটুকুই বা জানা যায় তাঁকে ?
বিদ্যাসাগর নিবিষ্ট হয়ে শুনছেন | আর অপলক তাকিয়ে আছেন শ্রীরামকৃষ্ণের দিকে | আর কারও কথা শুনে কখনও এমন ঘোর লাগেনি তাঁর |
শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরের মুখের দিকে তাকিয়েই বললেন‚ আর একটা গল্প বলছি শোনো |
একটা পিঁপড়ে চিনির পাহাড়ে গিছলো |
এক দানা খেয়ে পেট ভরে গেল | আর এক দানা মুখে করে সে বাসার পথে চলেছে |
যাবার সময় ভাবল‚ এবার এসে সব পাহাড়টা নিয়ে যাব |
ক্ষুদ্র জীবেরা এইসব মনে করে |
জানে না ব্রহ্ম বাক্যমনের অতীত !
যে যতই বড় হোক না কেন‚ তাঁকে জানা যায় না |
বিদ্যাসাগর হঠাৎ বলে ফেললেন‚ কেন শুকদেব ? তিনি তো …
শ্রীরামকৃষ্ণ হেসে বললেন‚ শুকদেবাদি না হয় ডেঁও পিঁপড়ে |
চিনির আট–নটা দানা না হয় মুখে করেছে | তার বেশি নয় |
ঘরে এত মানুষ | তবু পিন পড়লে শব্দ পাওয়া যাবে |
রোজ কত পণ্ডিত মানুষের আসা–যাওয়া বিদ্যাসাগরের বাড়িতে |
কিন্তু এমন জীবন্ত বেদান্ত কখনও দেখিনি ! শ্রীরামকৃষ্ণের কথা শুনছেন আর ভাবছেন বিদ্যাসাগর |
শ্রীরামকৃষ্ণ বলতে লাগলেন‚ তবে বেদে পুরাণে যা বলেছে‚ সে কী রকম বলা জানো ?
বিদ্যাসাগর বুঝলেন‚ ঘরের মধ্যে আর কেউ না বুঝুক তিনি অন্তত ধারণা করতে পারলেন‚ শ্রীরামকৃষ্ণের কণ্ঠে নতুনভাবে ব্যাখ্যাত হতে চলেছে বেদ ও পুরাণ !
তিনি উদগ্রীব হয়ে শুনছেন |
ঠাকুর বললেন‚ একজন সাগর দেখে এলে কেউ যদি জিগ্যেস করে‚ কেমন দেখলে‚ সে লোক মুখ হাঁ করে বলে‚ — ও ! কী দেখলুম ! কী হিল্লোল‚ কল্লোল |
ব্রহ্মের কথাও সেই রকম | বেদে আছে তিনি আনন্দস্বরূপ | সচ্চিদানন্দ |
বিস্মিত বিদ্যাসাগর | শ্রীরামকৃষ্ণ বেদ পড়েছেন!
তিনি তো নিরক্ষর |
বিদ্যাসাগর কী ভাবছেন‚ শ্রীরামকৃষ্ণ যেন বুঝতে পারলেন |
বললেন‚ শুকদেবাদি এই ব্রহ্মসাগর–তটে দাঁড়িয়ে দর্শন স্পর্শন করেছিলেন মাত্র |
তাঁরা কিন্তু ব্রহ্মসাগরে নামেননি | এ সাগরে নামলে আর ফেরবার জো নেই গো |
ঠাকুরের কথায় চমকে উঠলেন বিদ্যাসাগর | এতো একেবারে নতুন কথা |
অথচ কী অবলীলায় কথাটি বললেন পরমহংস !
বিদ্যাসাগর প্রশ্ন করলেন তাহলে ব্রহ্মাণ্ডজ্ঞান হওয়ার উপায় ? ঠাকুর উত্তর দিলেন‚ সমাধিস্থ হলে ব্রহ্মজ্ঞান হয় |
সেই অবস্থায় বিচার একেবারে বন্ধ হয়ে যায় |
মানুষ চুপ হয়ে যায় |
ব্রহ্ম কী বস্তু‚ মুখে বলবার শক্তি থাকে না | শ্রীরামকৃষ্ণ আর একটা গল্প বললেন—–
নুনের পুতুল সমুদ্র মাপতে গিছলো | কত গভীর জল সেই খবরটা সে দিয়ে চেয়েছিল | কিন্তু খবর দেওয়া আর হল না | যেই নামল জলে অমনি গেল গলে | কে আর খবর দেবে ? একজন প্রশ্ন করলেন‚ সমাধিস্থ ব্যক্তি যাঁর ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছে তিনি কী আর কথা কন না ?
বিদ্যাসাগরকে চমকে দিল ঠাকুরের বিদ্যুতের মতো উত্তর
শঙ্করাচার্য লোকশিক্ষার জন্য বিদ্যার ‘আমি’ রেখেছিলেন | বিদ্যাসাগর এই কথার গভীর অর্থটুকু বুঝতে পারলেন | আপাত অশিক্ষিত একটি মানুষের জ্ঞানের ব্যাপ্তি ও গভীরতা দেখে তিনি স্তম্ভিত !
শ্রীরামকৃষ্ণ এবার আরও সহজ করে তাঁর বক্তব্যের সারাৎসার তুলে ধরলেন—–
ব্রহ্মদর্শন হলে মানুষ চুপ হয়ে যায় | যতক্ষণ দর্শন না হয়‚ ততক্ষণই বিচার তেমনি সমাধিত পুরুষ—–লোকশিক্ষা দেবার জন্য আবার নেমে আসে আবার কথা কয় |
বিদ্যাসাগরের চোখে একইসঙ্গে ফুটে ওঠে মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধা
তাঁর মন বলে ওঠে ‚ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস সেই পুরুষ তো তুমি নিজে | সমাধিস্থ হয়েও লোকশিক্ষার জন নেমে এসেছো‚ কথা বলছো !
শ্রীরামকৃষ্ণ এবার ব্রহ্মজ্ঞানীর স্বরূপ অন্যভাবে ফুটিয়ে তোলেন্—
যতক্ষণ মৌমাছি ফুলে না বসে ততক্ষণ ভনভন করে‚ ফুলে বসে মধুপান করতে আরম্ভ করলে চুপ হয়ে যায় | মধুপান করে মাতাল হবার পরে আবার কখনও–কখনও গুনগুন করে |পুকুরে কলসিতে জল ভরার সময় ভকভক শব্দ হয় | পূর্ণ হয়ে গেলে আর শব্দ নেই | তবে আর এক কলসিতে যদি ঢালাঢালি হয় তাহলে আবার শব্দ হয় |
একজন হঠাৎ বললেন‚ঋষিদের কি ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছিল ?
শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তর দিলেন‚ হ্যাঁ হয়েছিল | বিষয়বুদ্ধির লেশমাত্র থাকলে এই ব্রহ্মজ্ঞান হয় না | ঋষিরা দেখা–শোনা–ছোঁয়া এসবের বিষয় থেকে মনকে আলাদা রাখত | সমস্ত দিন ধ্যান করে কাটত | তবে ব্রহ্মকে বোধে বোধ করত | এবার সরাসরি বিদ্যাসাগরের দিকে তাকালেন ঠাকুর | বললেন‚ কলিতে অন্নগত প্রাণ | দেহ বৃদ্ধি যায় না | যারা বিষয় ত্যাগ করতে পারে না‚ তাদের ‘আমি’ কোনওভাবে যায় না |
তাদের বরং ‘আমি ব্রহ্ম’ না বলে বলা উচিত আমি ভক্ত‚ আমি দাস এ অভিমান ভাল |
ভক্তিপথে থাকলেও তাঁকে পাওয়া যায় বিদ্যাসাগরকে যেন সরাসরি বলছেন ঠাকুর—–জ্ঞানীর পথও পথ আবার জ্ঞান–ভক্তির পথও পথ | আবার ভক্তির পথও পথ |
জ্ঞানযোগও সত্য | ভক্তির পথও সত্য | সব পথ দিয়েই তাঁর কাছে যাওয়া যায় |কিন্তু যতক্ষণ তিনি ‘আমি’ রেখেছেন আমাদের মধ্যে ততক্ষণ ভক্তিপথই সোজা |
শ্রীরামকৃষ্ণ এবার যেন শুধু বিদ্যাসাগরকেই দেখছেন | তিনি এই মহাপণ্ডিতকে বললেন‚ বিজ্ঞানী কী বলে ? বিজ্ঞানী বলে‚ যিনি ব্রহ্ম‚ তিনিই ভগবান |অর্থ বুঝিয়ে দিচ্ছি |ব্রহ্ম নির্গুণ | তিনি গুণাতীত | ভগবান ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ |এই জীবজগৎ‚ মন বুদ্ধি‚ বৈরাগ্য‚ জ্ঞান‚ এসব তাঁর ঐশ্বর্য |
দেখো না এই জগৎ কী চমৎকার | কত রকম জিনিস‚ চন্দ্র‚ সূর্য‚ নক্ষত্র | কত রকম জীব | বড় ছোট ভালমন্দ কারু বেশি শক্তি‚ কারু কম শক্তি | ব্রহ্মই ভগবান হয়েছেন

