জয়দীপ মহারাজ :- ঠাকুর কোন ব্যক্তি নন, তিনি চৈতন্যস্বরূপ; গুরুশক্তি। গুরুশক্তি প্রত্যেকের মধ্যেই রয়েছে। স্থূলরূপে গুরু এসে সেটা জাগিয়ে দেন, সক্রিয় করে দেন। অপরদিকে স্বামীজি সবসময় ঠাকুরের চিন্তার মধ্যেই রয়েছেন। তাই তাঁর কাছে চৈতন্যশক্তি বলতে ঠাকুর রামকৃষ্ণ। চৈতন্য, ব্রহ্ম বা বিরাটকে কল্পনা করা যায় না। ঈশ্বরচিন্তা অর্থাৎ কোন প্রতীকের চিন্তা। ‘সদগুরু এবং ইষ্ট এক‘, ‘গুরু ব্রহ্মময়‘ – কেন বলা হয়? কারণ যাকে আমরা চিন্তা করতে পারিনা, তাকে কেন্দ্র করে যে লীলা, তা যাকে কেন্দ্র করে হয় তাকে চিন্তা করলেই হয়।
স্বামীজি সকল কাজের পেছনে ঠাকুরের হাতছানি অনুভব করছেন। তাঁর লোকশিক্ষা দেওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও ডিভাইন প্ল্যানে (divine plan) এটা ছিল। ঠাকুরের কথা ‘নরেন লোকশিক্ষা দেবে‘ সেই ঐশ্বরিক ইচ্ছারই প্রতিফলন। যদিও ডিভাইন প্ল্যান পরিবর্তন করার ক্ষমতাও ঠাকুরের ছিল কারণ তিনি মায়াধীশ। রাখাল, যোগীন, তারক – এরা তিনজনেই তো বিবাহিত ছিলেন। অথচ তিনজনেই সন্ন্যাসী। এটা ঠাকুরের সংকল্প ছাড়া সম্ভব নাকি! স্বামীজি সারাদিন লেকচার (lecture) দেবার পর ভেবে পেতেন না পরের দিন কি বলবেন। তখন তিনি অসহায় ভাবে আত্মসমর্পণ করতেন ঠাকুরের কাছে। লেকচারে কিছু বলতে হয় নিজের থেকে। আর যারা শিবতুল্য বা ঋষিতুল্য মানুষ হন তাঁদের নিজের থেকে কিছু বলার থাকেনা। এমনই এক চরম সংকটের মুহূর্তে বিবেকানন্দ দেখতে পেতেন তাঁরই মত এক ব্যক্তি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিয়ে চলেছেন। তিনি শুনতেন ও পরের দিন সেই লেকচার‘টাই তিনি দিতেন। এটা কোন ইচ্ছা বা শক্তিতে হচ্ছে? এইভাবে প্রতি পদে পদে স্বামীজি রিয়েলাইস (realise) করছেন যে কিভাবে ঠাকুরের শক্তি কাজ করছে।
স্বামীজির তখনও কাজ বাকী আছে তাই তার অন্তঃকরণ থেকেই একটা মেসেজ (message) বা দর্শন দিয়ে তাকে চা টা পান করতে বারণ করা হল। অর্থাৎ তাঁর নিজের মধ্যে অর্ন্তযামী যে সত্তা তিনিই তাকে জানালেন। তিনি কিন্তু তখন ‘চায়ে বিষ আছে‘ বলে মানুষকে তঠস্ত করে দেওয়ার রাস্তায় হাঁটলেন না। প্রপার অ্যাকশন (proper action) করলেন, গ্লাসটা নামিয়ে রাখলেন। নেগেটিভ অ্যাকশন (negative action) বা রিয়েকশন্ (reaction) করলেন না।
একবার স্বামী বাউলানন্দ সৎসঙ্গের মধ্যে আগামীর এক ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন – এই ঘটনা ঘটবে রামকৃষ্ণের ইচ্ছায়। সেই সৎসঙ্গে উপস্থিত এক শিক্ষিত ব্যক্তি এই কথা শুনে তখন বলেন, ‘কিন্তু ঠাকুর তো দীর্ঘ সত্তর বছর আগে শরীর ছেড়েছেন‘। উত্তরে বাউলানন্দ বলেন, ‘ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক দিয়ে রামকৃষ্ণকে ধরা সহজ নয়। রামকৃষ্ণ কোন সাধারণ মানুষ নয়, বর্তমান বিশ্বজুড়ে যে হাইয়ার কনশাসনেস্ (higher consciousness) সেটাই রামকৃষ্ণ‘।
একদিকে ঠাকুরকে আমরা ভগবান, যুগাবতার বলছি আবার আমরাই তাঁকে তাঁর বলা কথা ও কাজের মধ্যে লিমিট (limit) করে দিচ্ছি। তাঁর রোল‘টার (role) মধ্যেই কেবল তাঁকে খুঁজছি। ওনার লীলার পরিপ্রেক্ষিতে ওনার রোল‘টা বিশ্বসংসারে ঈশ্বরীয় শক্তির এক ঘন রূপ বা কনডেন্সড্ ফরম্ (condensed form) বলা চলে। রামকৃষ্ণ একটা চেতনা। তাই এহেন মহাপুরুষ শরীর ছাড়লে তাঁর চেতনাটা ফেটে চারিদিকে ছড়িয়ে যায়। সারা পৃথিবীতে যেখানে যেখানে যোগ্যতা, দক্ষতা বা আধার আছে সেখানে সেখানে তারা ক্যাচ (catch) করে নেয়। হয়ত তারা রামকৃষ্ণ বলে চিনতে পারে না। সেটাকে আত্মস্থ করে তারা ভগবানের কোন না কোন কাজ করতে শুরু করে দেয়। বিজ্ঞানে, ইতিহাসে, সংস্কৃতিতে সেই ঢেউ আছড়ে পড়ে। তাই বেঙ্গল রেনেসা (Bengal renaissance) বা ইংরেজ বিরোধী যে এক আন্দোলন শুরু হয় তার সেন্টারে (centre) কিন্তু রয়েছেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ। হয়ত অনেকে নবজাগরণের রূপকার হিসাবে স্বামী বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন বা বিপ্লবীদের নাম নেয়। কিন্তু যে শক্তিকে কেন্দ্র করে এই ছোট ছোট শক্তি আবর্তিত হচ্ছে তিনি হচ্ছেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ।।
(জয়দীপ মহারাজের সৎসঙ্গের অংশবিশেষ)
তরুণ যুবক :- আচ্ছা মহারাজ, বিদেশে যখন স্বামীজিকে চায়ের সাথে বিষ মিশিয়ে পান করতে দেওয়া হয়েছিল তখন তিনি চায়ের মধ্যে ঠাকুরকে দেখতে পান। এই ঘটনায় ঠাকুর কি স্বয়ং এসেছিলেন?
p { margin-bottom: 0.25cm; line-height: 120%; }
তরুণ যুবক :- আচ্ছা মহারাজ, বিদেশে যখন স্বামীজিকে চায়ের সাথে বিষ মিশিয়ে পান করতে দেওয়া হয়েছিল তখন তিনি চায়ের মধ্যে ঠাকুরকে দেখতে পান। এই ঘটনায় ঠাকুর কি স্বয়ং এসেছিলেন?