“বাবা গোপাল, আমি তোমাকে এই কদর্য জিনিস খেতে দিলুম বলে আমাকে যেন ঐরূপ খেতে দিও না”।

১৮৮৪ খ্রীস্টাব্দের বসন্ত কাল। 

//pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

রাত্রি তিনটার সময় জপে বসিয়া জপসমাপনান্তে ব্রাহ্মণী (গোপালের মাজপসমর্পণের পূর্বে প্রাণায়াম আরম্ভ করিয়াছেনএমন সময় দেখেন শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার বামে উপবিষ্টতাঁহার দক্ষিণ হস্তটি মুষ্টিবদ্ধপ্রায় আর মুখে মৃদু হাস্য – ঠিক যেমন দক্ষিণেশ্বরে দেখিয়াছেন তেমনি। ভাবিলেন, “একিএমন সময় ইনি কোথা থেকে কেমন করে এলেন?” অবাক হইয়া ভাবিতে ভাবিতে বৃদ্ধা সাহস করিয়া স্বীয় বাম হস্তে ঠাকুরের বাম হস্তটি ধরিলেনঅমনি সে মূর্তি অকস্মাৎ অন্তর্হিত হইল আর তৎস্থলে দর্শন দিল দশ মাসের শিশু সত্যকার গোপাল। সে হামা দিয়া এক হাত তুলিয়া বৃদ্ধার মুখপানে চাহিয়া বলিল, “মা ননী দাও”। ব্রাহ্মণী তো দেখিয়া শুনিয়া স্তম্ভিত – এ কি কাণ্ডতিনি চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া বলিলেন, “বাবাআমি দুঃখিনী কাঙালিনীআমি তোমায় কি খাওয়াবননী ক্ষীর কোথায় পাববাবা?” সে অদ্ভুত গোপালের কিন্তু ভ্রূক্ষেপ নেই – সে খাইবেই। তখন শিকা হইতে নারিকেল নাড়ু দিয়া বলিলেন,

//pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
 “বাবা গোপালআমি তোমাকে এই কদর্য জিনিস খেতে দিলুম বলে আমাকে যেন ঐরূপ খেতে দিও না”। 

//pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জপ সেদিন আর হইল না – চলিতে লাগিল গোপালের অপূর্ব লীলাসে ক্রোড়ে বসেমালা কাড়িয়া লয়স্কন্ধে বসেঘরময় ঘুরিয়া বেড়ায়যেমন সকাল হইল অমনি গোপালের মা পাগলিনীর ন্যায় দক্ষিণেশ্বরে চলিলেনগোপালকে বুকে লইয়া চলিতে চলিতে দেখিতে লাগিলেনগোপালের লাল টুকটুকে পাদুখানি বুকের উপর ঝুলিতেছে।
//pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
সকাল প্রায় সাতটার সময় আলুথালু বেশে ‘গোপাল গোপাল’ বলিয়া ডাকিতে ডাকিতে গোপালের মা ঠাকুরের কক্ষে পূর্বদিকের দ্বারপথে ঢুকিলেন। তাঁহার চক্ষু কপালে উঠিয়াছেআঁচল ভূমিতে লুটাইতেছে কোন দিকে ভ্রূক্ষেপ নাই। তিনি আসিয়া ঠাকুরের পার্শ্বে বসিলেনভাবাবিষ্ট ঠাকুরও তাঁহার ক্রোড়ে উপবিষ্ট হইলেন। সাশ্রুনয়নে গোপালের মা নিজের সহিত আনীত ক্ষীরসরননী গোপালরুপী শ্রীরামকৃষ্ণের মুখে তুলিয়া দিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে ভাবসংবরণ করিয়া ঠাকুর আপনার চৌকিতে বসিলেন। গোপালের মার কিন্তু ভাব আর থামে না – সারাক্ষণ তিনি নাচিয়া বেড়াইতে লাগিলেন আর বলিতে লাগিলেন “ব্রহ্মা নাচেবিষ্ণু নাচেআর নাচে শিব” – ইত্যাদি। এই দেবদুর্লভ দৃশ্যে মুগ্ধা গৃহসম্মার্জনরতা অপর ভক্তমহিলা ভাবিতে লাগিলেন – যে ঠাকুর স্ত্রীজাতির স্পর্শমাত্র সহ্য করিয়া পারেন নাতাঁহার আজ এ কিদৃশ আচরণএকদিকে দ্বিষষ্টিবর্ষাতিতা বৃদ্ধার অনুপম মাতৃস্নেহঅপরদিকে অষ্টচত্বারিংশৎ বয়স্ক প্রৌঢ়ের গোপালভাবশোনা যায় বটে যেযশোদাভাবে আত্মহারা ভৈরবী ব্রাহ্মণীর ক্রোড় কখনও কখনও তাঁহার দ্বারা অলঙ্কৃত হইতকিন্তু উহা অতীতের শোনা কোথা আর ইহা প্রত্যক্ষভাবসংবরণান্তে গোপালের মার সেআনন্দ দেখিয়া উপস্থিত অপর মহিলাটিকে ঠাকুর সহাস্যে বলিলেন, “দেখ দেখআনন্দে ভরে গেছে – ওর মনটা এখন গোপাললোকে চলে গেছে!” ভাবের আধিক্যে অঘোরমণি সেদিন ঠাকুরকে কত কথাই না বলিতে লাগিলেন, “এই যে গোপাল আমার কোলেঐ যে তোমার ভেতর ঢুকে গেলঐ আবার বেরিয়ে এলআয় বাবাদুঃখিনী মার কাছে আয়” – ইত্যাদি। গোপাল এইরূপে কখনও ঠাকুরের সহিত মিশিয়া এবং কখনও বাল্যলীলার তরঙ্গ তুলিয়ে একদিকে যেমন শ্রীরামকৃষ্ণকেই গোপালরূপে প্রত্যক্ষ করাইলঅপরদিকে তেমনি গোপালের মাকে আত্মহারা করিল। অঘোরমণি আজ হইতে বাস্তবিকই গোপালের মা হইলেন এবং ঠাকুরও তাঁহাকে ঐ নামে ডাকিতে লাগিলেন। তাঁহার ভাব প্রশমনের জন্য ঠাকুর সেদিন বহু প্রকারে যত্ন করিতে লাগিলেন – তাঁহার বুকে হাত বুলাইয়া দিলেনতাঁহাকে ভাল ভাল খাদ্যসামগ্রী খাওয়াইলেন এবং সমস্ত দিন নিকটে রাখিয়া স্নানাহার করাইলেন। খাইতে খাইতে ব্রাহ্মণী বলিতে লাগিলেন,  “বাবা গোপালতোমার দুঃখিনী মা এজন্মে বড় কষ্টে কাল কাটিয়েছেটেকো ঘুরিয়ে সুতো কেটে পৈতা করে বেচে দিনে কাটিয়েছে – তাই বুঝি এত যত্ন আজ করছ?
//pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
সন্ধায় ঠাকুর যখন গোপালের মাকে বিদায় দিয়া কামারহাটী পাঠাইলেনতখন গোপালও ক্রোড়ে উঠিয়া চলিল এবং গৃহে পৌঁছিয়া নানা রঙ্গআবদার ইত্যাদিতে মায়ের জপভঙ্গ করিতে লাগিল। অবশেষে গোপালের মা জপ ছাড়িয়া তাঁহাকে শয্যায় শয়ন করাইলেন। তক্তপোশের উপর মাদুর পাতা – নরম বিছানা বা বালিশ তাঁহার নাই – তাই গোপাল খুঁত খুঁত করিতে লাগিল। অগত্যা ব্রাহ্মণী স্বীয় বাম বাহুতে তাহার মস্তক রাখিয়া বলিলেন, “বাবাআজ এই রকমে শোওরাত পোহালেই কাল কলকাতা গিয়ে তোমার নরম বালিশ করিয়ে দেব”। পরদিন সকালে প্রত্যক্ষ গোপালের রান্নার জন্য বাগান হইতে কাঠ কুড়াইতে গেলে গোপালও সঙ্গে সঙ্গে যাইয়া কাঠ আনিয়া রান্নাঘরে রাখিতে লাগিল। রন্ধনকালেও দুরন্ত শিশু কাছে বসিয়া বা পিঠে পড়িয়া সব দেখিতে লাগিল ও আবদার করিতে থাকিল। 
//pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
ব্রাহ্মণী তাহাকে কখনও মিষ্ট কথায় ভুলাইতে লাগিলেনকখনও বা বকিতে লাগিলেন।

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started