“স্বামী সরদেশানন্দ বলছেন – তিনি ছোটমামীর(মায়ের কনিষ্ঠ ভ্রাতৃবধূ) মুখে শুনেছেন যে, বিশ্বজয় করে ফেরবার পর স্বামীজী যেদিন প্রথম শ্রীশ্রীমায়ের চরণবন্দনা করলেন, সেদিন, ছোটমামীর ভাষায়ঃ–
“রাজার মতো চেহারা, ঠাকুরঝির পায়ে লম্বা হয়ে পড়লো; জোড়হাতে বলল— ‘মা, সাহেবের ছেলেকে ঘোড়া করেছি, তোমার কৃপায়!'”
এই দর্শনের আর একটি প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ পাই কুমুদবন্ধু সেনের স্মৃতিকথায়।
তিনি লিখেছেনঃ
“মা তাঁর ঘরের দরজায় সর্বাঙ্গ চাদরে ঢেকে নীরবে দাঁড়িয়েছিলেন।
স্বামীজী তাঁর সামনে এসেই সোজা মাটিতে শুয়ে তাঁকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন।•••
কিন্তু
সাধারণ রীতি অনুযায়ী তাঁর পাদস্পর্শ করলেন না।
তারপর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে উপস্থিত আমরা যারা স্বামীজীর পিছনে দাঁড়িয়েছিলাম তাদেরব কোমল কন্ঠে বললেনঃ- ‘যাও, মাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম কর।
কিন্তু
কেউ তাঁর চরণ স্পর্শ কোরো না।
তাঁর এতই করুণা, এতই কোমল তাঁর প্রকৃতি, এতই স্নেহময়ী যে যখন কেউ পাদস্পর্শ করে তিনি তাঁর সর্বগ্রাসী করুণা, সীমাহীন ভালবাসা এবং সমবেদনা দ্বারা তৎক্ষণাৎ তার যাবতীয় দুঃখকষ্ট নিজের মধ্যে আকর্ষণ করে নেন।
তার ফলে তাঁকে নীরবে অপরের জন্য কষ্ট ভোগ করতে হয়।
একে একে তাঁর সম্মুখে সাষ্টাঙ্গে প্রণত হও।
মুখে কেউ কিছু না বলে তোমাদের অন্তরের অন্তস্থল থেকে নীরবে তাঁর কাছে সর্বান্তঃকরণে প্রার্থণা কর ও তাঁর আশীর্বাদ ভিক্ষা কর।
তিনি সর্বদাই অতিলৌকিক স্তরে অবস্থান করেন
এবং
সকলের মনের কথা জানেন — তিনি অন্তর্যামিণী।’ “
‘আমাদের সকলের প্রণাম শেষ হলে গোলাপ-মা নীরবতা ভঙ্গ স্বামীজীকে অত্যন্ত স্নেহপূর্ণ স্বরে বললেন, – “মা জানতে চাইছেন, দার্জিলিঙে তোমার শরীর কেমন ছিল? বিশেষ উপকার হয়েছে কি?”
“স্বামীজী — “হ্যাঁ, সেখানে অনেকটা ভাল ছিলাম।” …
“গোলাপ-মা –> “মা বলছেন ঠাকুর সর্বদাই তোমার সঙ্গে আছেন। আর জগতের কল্যাণের জন্য তোমার আরও অনেক কাজ করতে হবে।”
“স্বামীজী –> “আমি প্রত্যক্ষভাবে দেখতে পাই, অনুভব করি এবং উপলব্ধি করি যে,- “আমি ঠাকুরের যন্ত্রমাত্র।
যেভাবে যেসব অসাধারণ বিরাট সব ব্যাপার ঘটছে
আর
যেভাবে ওদেশের মেয়ে-পুরুষ ঠাকুরের কাজে জীবন উৎসর্গ করতে
এবং
ঠাকুরের বাণী প্রচার করতে আমাকে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করার আগ্রহ দেখিয়েছে,
তাতে আমি নিজেই কখন ও কখন ও অবাক হয়ে যাই।
আমি মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে আমেরিকায় গিয়াছিলাম;
সেখানে আমার বক্তৃতার মাধ্যমে মানুষের মনে যে সাড়া জাগাতে সমর্থ হয়েছিলাম
এবং
তাঁদের কাছে যে অভাবনীয় সম্মান লাভ করেছিলাম
তাতে আমি তৎক্ষণাৎ বুঝেছিলাম যে, – মায়ের আশীর্বাদের শক্তিতেই ঐ অসম্ভব সম্ভব হয়েছিল।”
(শতরূপে সারদা)