প্রশ্নঃ স্বামীজীর মানুষ হবার শিক্ষা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় কেন এখনো আনা হয়নি ?

p { margin-bottom: 0.25cm; line-height: 120%; }

১৪ই আগস্ট ১৯৪৭। 


গঙ্গার কাছেই আমাদের বাড়ি। পশ্চিম পাড়ে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। মনে মনে বললাম– ‘পরাধীন ভারতবর্ষের শেষ সূর্য তুমি অস্ত যাচ্ছ। কাল যখন তুমি পূর্ব আকাশে উদিত হবে, তখন ভারতবর্ষ স্বাধীন’।

* * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * *

প্রশ্নঃ স্বামীজীর মানুষ হবার শিক্ষা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় কেন এখনো আনা হয়নি ?

শ্রীনবনীহরণ মুখোপাধ্যায়ঃ  …………….স্বামীজী অনেক কথা বলেছেন, অনেক কথা লিখেছেন। তার ভিতর থেকে যে কথাটা নিয়ে আমরা কাজ করছি Be & Make’ , নিজে মানুষ হওয়া আর অন্যকে মানুষ হতে সাহায্য করা, আমার সৌভাগ্য হয়নি আর কোথাও এই কথাটি শোনার। স্বামীজী এরকম মুল্যবান একটি কথা বলেছেন, আর সেটা নিয়ে যে কিছু করা যায়, এ কথাটির যে একটা গুরুত্ব আছে, সেটি মহামণ্ডল হওয়ার আগে আমরা অন্তত শুনিনি। জানিনা অন্য কেউ শুনেছে কিনা।
এখন যারা দেশ চালাচ্ছেন, যারা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেন, তারা কি ভাবেন মানুষ গড়ার কথা, তাদের কোনও ধারণা আছে  Be & Make’সম্পর্কে ? মানুষ যে হওয়া যায় বা মানুষ যে হতে হয় একথা জানেন তারা ? শিক্ষার উন্নতির জন্য কি করছেননতুন নতুন স্কুল – কলেজ – ইউনিভার্সিটি করছেন, আর সেখানে নতুন নতুন সাবজেক্ট খুলছেন, সিলেবাস বাড়াচ্ছেন। শিক্ষা কাকে বলে জানেন তারা ? রাজ্যে হোক আর কেন্দ্রেই হোক সব এক। 
শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বামীজীর চিন্তা নিয়ে বলছ, স্বামীজী সম্বন্ধে কে জানেন ? ভারতবর্ষে কজন জানেন স্বামীজী কি ছিলেন ? নেতা, মন্ত্রী, আমলা যারা দেশ চালান, তাদের ভিতর ক’জন জানেন স্বামজী সম্পর্কে ? তোমরা কিছু মনে করো না ভাই। কথা উঠলেই আজকাল শোনা যায় –  গান্ধীজী বলেছিলেন, স্বামীজীর লেখা পড়ে দেশের প্রতি তার ভালবাসা সহস্র গুণ বেড়ে যায়। ঐ টুকুই বলেছিলেন। বেলুড় মঠে একবার স্বামীজীর সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। স্বামীজী সেদিন মঠে ছিলেন না। এখনকার মত তো আর মোবাইল বা ইমেল ছিল না, তাই আগে থেকে জানিয়ে আসতে পারেননি। ফিরে যাবার পথে ভিজিটরস বুকে কিছু লিখতে হয় তাই ঐ এক লাইন লিখেছিলেন। কিন্তু স্বামীজীর কোন ভাবটা তিনি ভারতবর্ষকে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর নাম বলতে সবাই একেবারে…… ! তিনি নতুন করে ভারতবর্ষকে আবিস্কার করে ‘Discovery of India’ নামে একটি বই লিখলেন। দেশের তথাকথিত শিক্ষিত লোক তো পড়েছেই, বিদেশেও পড়া হয়েছে। কিন্তু নেহেরু ভারতবর্ষকে আবিস্কার করতে গিয়ে স্বামীজীকে দেখতেই পেলেন না। স্বামীজীর নামটাই ঐ বই এ ছিল না। তোমরা হাসছ তো, কিন্তু এটাই ঘটনা। তখনকার সময়ে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রেসিডেন্ট মহারাজকে এক সন্ন্যাসী বইটি পড়তে দিয়ে কিছুদিন পর এসে জিজ্ঞাসা করলেনমহারাজ, বইটি পড়েছেন ? মহারাজ বললেন পড়েছি। সন্ন্যাসী  মহারাজের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য আগ্রহভরে তাকিয়ে রইলেন। মহারাজের উত্তর ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত ‘‘Neheru is yet to discover India, ভারতবর্ষকে আবিস্কার করতে নেহেরুর এখনো সময় লাগবে।
এবং পরে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন স্বামী রঙ্গনাথানন্দ। অনেকেই হয়তো জান, স্বামী বিবেকানন্দের পরে সমগ্র জগতে Intellectual World কে নাড়া দিয়েছিলেন স্বামী রঙ্গনাথানন্দ। তিনি দিল্লিতে থাকা কালিন অনেকের মত জহরলাল নেহেরুও মহারাজের কাছে আসতেন। মহারাজ একদিন বললেন – Jawaharlal, in your book you are not included Swami Vivekananda’s name ?’তোমার বই এ স্বামীজীর নামটা পর্যন্ত রাখনি ? এই কথা শুনে নেহেরু বললেন–  ‘Sorry ! sorry ! It was a bad omission’ । ওহ ! আমি সত্যিই দুঃখিত, এটা মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে। এই সব বলে পরের সংস্করণে স্বামীজী সম্পর্কে কিছু কথা, /৪ পাতা যোগ করলেন।
এই তো ভারতবর্ষের স্বামীজীকে চেনা। আমার বয়স হয়েছে ভাই। ব্রিটিশের রাজত্ব দেখেছি। ভারতবর্ষ স্বাধীন হতে দেখেছি। সেই দিনটি আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। এখনো তোমাদের বলতেই চোখে জল আসছে। ১৪ই আগস্ট ১৯৪৭। গঙ্গার কাছেই আমাদের বাড়ি। পশ্চিম পাড়ে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। মনে মনে বললাম– ‘পরাধীন ভারতবর্ষের শেষ সূর্য তুমি অস্ত যাচ্ছ। কাল যখন তুমি পূর্ব আকাশে উদিত হবে, তখন ভারতবর্ষ স্বাধীন’। সে যে কি আনন্দ, বুক ফাটা আনন্দ। আমি শুধু নয়, দেশশুদ্ধ লোক করেছিল। আলোয় আলোকময় রাস্তাঘাট, বাড়ি। সারারাত উৎসব চারিদিকে। তখন তো আর টেলিভিশন বের হয়নি, রাত ১২ টার সময় জহরলাল রেডিও তে চমৎকার এক ভাষণ দিয়ে বললেন, ভারত স্বাধীন হল।
কি স্বাধীনতা আজ আমরা ভোগ করছি ? সত্যিই কি আমরা যথার্থ স্বাধীনতা পেয়েছি ? এই স্বাধীন ভারতবর্ষে স্বামীজীর কোন ভাবটি নেওয়া হয়েছে। স্বামীজীর মুল্য তারা জানতেন না ভাই। কি বলতে কি পাগলের মত বলে ফেলছি জানি না ভাই।
স্বামীজী আমেরিকা থেকে ফিরে কলকাতায় রয়েছেন। কিছু তরুন রাজনৈতিক নেতা দেখা করে স্বামীজীকে বললেন, দেশের এত সমস্যা এর থেকে মুক্তির উপায় কি ? স্বামীজী বললেন– ‘দেশে মানুষ কই রে, আগে মানুষ তৈরি করো, তাহলেই সব সমস্যা চলে যাবে’। পরাধীনতাই কি আমাদের সবথেকে বড় সমস্যা নয় ? ‘দেশে যদি মানুষ না থাকে তাহলে স্বাধীনতা রক্ষা করবে কে’। আর এক জায়গায় বলেছিলেন–  ‘স্বাধীনতা ? ওরে আমি ৩ দিনে এনে দিতে পারি। মস্ত বড় এক ময়দানে সকলকে জড় কর। সেখানে ভারতের জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে ঘোষণা কর, আমরা আজ স্বাধীন হলাম। আর গোটাকতক বড় বড় দেশে বার্তা পাঠা যে, ভারতবর্ষ আজ থেকে স্বাধীন হল। এটা করলে কি হবে জানিস ? ইংরেজ গুলি চালাবে। তবে জানবি, বিবেকানন্দের রক্তটা মাটিতে প্রথম পড়বে’।
স্বামীজীকে কেউ বোঝেনি ভাই, আজও বোঝেনি। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক নেতারা বোঝেনি কোন কালে। মুখে বলেন স্বামীজীর কথা। স্বামীজীকে নিয়ে রাজনীতি করেন, মঠে মিশনে যান। এদের চেনা আছে, বয়স হয়েছে, দেখেছি। অসহ্য লাগে। সেই যন্ত্রণা বুকে না থাকলে এই মহামণ্ডল হতো না। কিন্তু এখনো সবাই কি চুপ করে বসে থাকব ? যুবকরা কি বসে থাকবে ? আর কোনও রাস্তা নেই ভাই ! আর দ্বিতীয় কোনও মতবাদ, আর কোনও ইজমে কিছু হবে না। কোনও ইকনমিক পলিসিতে কিছু হবে না। কারণ সব কিছুর পিছনে আছে মানুষ। সেই মানুষ যদি মানুষ না হয়, কিছুতেই ভারতের উন্নতি সম্ভব নয়।
সেই কথা বুঝে নিয়ে, তেমন মানুষ হওয়ার জন্য আমাদের এই ক’দিনের এখানে আসা। ১৫০০ ভাই এক জায়গায় এসে, এত কষ্ট স্বীকার করা, অখাদ্য কিছু খাবার, প্রচণ্ড শীতে শোয়ার কষ্ট, একটানা বসে থাকা। এতো এমনি নয় ভাই। মস্ত বড় সাধনা, সকলের তপস্যার ক্ষেত্র। যে আগুন স্বামীজীর বুকে জ্বলছিল, সেই আগুন আমাদের ভিতরে জ্বালিয়ে নেব। আমরা আমাদের জীবনটা এমন করব যেন সেটা দেশের কাজে লাগে সমাজের কাজে লাগে। সবাইকে যেন ভালবাসতে পারি। যারা পিছিয়ে আছে, যারা নির্যাতিত, যারা নিপীড়িত, তাদের পাশে দাঁড়াবো। সমস্ত জীবন দিয়ে যদি এমন মানুষ হতে পারি, আর অন্তত একজন মানুষের ভিতরে সেই আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারি, জীবন সার্থক হয়ে যাবে। বুঝিয়ে দাও জগতকে। মানুষ সোজা জিনিস নয়, মানুষ ফেলনা নয়, মানুষ পশু নয়। জন্ম নিলাম, কিছু লেখাপড়া শিখলাম, রোজগার করলাম, বিয়ে করে সন্তান জন্ম দিয়ে একদিন চলে গেলাম। এটুকুর জন্য মানুষ হয়ে আসিনি। যাদের শুধু এটুকুতেই জীবন শেষ হয় তারা অভাগা, অত্যন্ত দুর্ভাগা।

শ্রী নবনীহরণ মুখোপাধ্যায়

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, অখিল ভারত বিবেকানন্দ যুব মহামণ্ডল।
৪০তম সর্বভারতীয় বার্ষিক যুব শিক্ষণ শিবিরে প্রশ্নোত্তরের কিছু অংশ (২০০৬)


Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started