বাবা ! আমার কী করে মঙ্গল হবে বলে দিন ? এক বেশ্যা মনে মনে খুব চিন্তা করছিল কিসে তার মঙ্গল হবে । সেই কথাটা জানবার জন্য সে এক সাধুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল ,

 একটি শিক্ষণীয় গল্প

এক বেশ্যা মনে মনে খুব চিন্তা করছিল কিসে তার মঙ্গল হবে । সেই কথাটা জানবার জন্য সে এক সাধুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল ,
“ বাবা ! আমার কী করে মঙ্গল হবে বলে দিন ? ”
সাধু উত্তর দিল , “ তুমি সাধুসঙ্গ করো । সাধুরা ত্যাগী পুরুষ , সেজন্য তাদের সেবা করো , তাহলেই তোমার মঙ্গল হবে । ”
বেশ্যটি এবার এক ব্ৰাহ্মণের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে ,বাবা ! আমার কী করে মঙ্গল হবে বলে দিন।
ব্ৰাহ্মণ বলল — সাধু সাজলেই লোকে সাধু হয় না আর সাধু হল যারা ব্রাহ্মণ।  আমরা তো জন্ম থেকে ব্ৰাহ্মণ । তাই তুমি ব্ৰাহ্মণের সেবা করো , তাতেই তোমার মঙ্গল হবে । এবার বেশ্যটি একজন সন্ন্যাসীর কাছে গেল।
সে তাকেও জিজ্ঞাসা করল , “ বাবা ! আমার কিসে মঙ্গল হবে বলুন । ”
সন্ন্যাসী বলল , ‘ সন্ন্যাসী সবার থেকে বড় , তারা সব জাতির গুরু । অতএব সন্ন্যাসীদের সেবা করো , তোমার মঙ্গল হবে । ”
ফের বেশ্যাটি একজন বৈরাগীর কাছে গিয়ে ওই একই কথা জিজ্ঞাসা করল ।
সেও বলল , “ বৈরাগীই সবার শ্রেষ্ঠ , অতএব তাদের সেব করো , তোমার মঙ্গল হবে । ”
এভাবে বেশ্যাটি প্ৰত্যেক সম্প্ৰদায়ের গুরুদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে আর সকলেই একই উত্তর দেয় যে তারাই সবার শ্রেষ্ঠ আর বাকি সকলে অসাধু , পাষণ্ড ।

তারা বলে , তুমি আমাদের শিষ্য হও , আমাদের কাছে দীক্ষা নাও , তাহলেই তোমার মঙ্গল হবে ।
এইভাবে বেশ্যটি যেখানেই গেল সেখানেই তারা নিজেদেরই বৰ্ণ , আশ্রম , মত , সম্প্ৰদায় আদির পক্ষে যুক্তি দেখাল ।

এই সব দেখে শুনে বেশ্যার মনে হল , “ তাহলে তো এবার সার যুক্তি খুঁজে পেলাম । সাধু বলছে সাধুকে পূজা করো , ব্ৰাহ্মণ বলছে ব্ৰাহ্মণকে পূজা করো , আমি তাহলে বেশ্যাদের কেন পূজা করব না ? ” এই ভেবে সে ভোজন করাবে বলে শহরের সব বেশ্যাদের একদিন তার বাড়িতে নিমন্ত্ৰণ করল । যথাসময়ে বেশ্যারা আসতে আরম্ভ করল ।
ঘটনা হল কী , ওই নগরের শেষপ্রান্তে এক সর্বত্যাগী নিরাসক্ত মহাপুরুষ বাস করতেন । তিনি খবর পেলেন শহরের অমুক বেশ্যা আজ বেশ্যাভোজ দিচ্ছে। তিনি তখন ভাবলেন , বেশ্যাদের আজ একটু শাস্ত্ৰীয় শিক্ষা দিতে হবে । এই ভেবে তিনি বেশ্যাটির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন । ভোজের জন্য রান্নাবান্না হছিল । রাধুনিরা ভাতের মাড় , চালধোয়া জল ইত্যাদি নালায় ঢেলে দিছিল আর তাই গড়িয়ে বাইরে চলে যাচ্ছিল । সেই সময় ওই বেশ্যাটি বাড়ির ছাদে উঠে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখে এক সাধুনালার চালধোয়া জলে হাত ধুচ্ছে। সে নিষেদ করতে লাগল।
সাধু শুনলেন না । তখন সে ছাদ থেকে নেমে এসে সাধুবাবার সামনে গিয়ে বলল , “ বাবা ! এ তো ভাতের মাড় , এতে হাত ধুলে হাত যে আরও ময়লা হবে । আপনি পরিস্কার জলে হাত ধোন । ”
সাধুবাবা উত্তর করেন , “ এতে হাত ধুলে যদি হাত আরও ময়লা হয় , তবে কি বেশ্যারা এর থেকে বেশি শুদ্ধ যে তাদের সেবা করলে তোর কল্যাণ হবে ? হাত পরিস্কার জলে সাফ হয় , না ময়লা জলে ? ”
এই কথা শুনে বেশ্যটির চেতনা হল, সত্যিতো , বাবাজী ঠিক কথাই বলেছেন। তখন সে বাবাজীকে জিজ্ঞাসা করল , “ বাবা ! তাহলে বলুন কিসে আমার কল্যাণ হবে ?
সাধুজী উত্তর দিলেন , ”আত্মতত্ত্ব জ্ঞানহীন অজ্ঞানতম ব্যক্তিরা জড়-গুনের দ্বারা কলুষিত তাই তাদের একপ্রকার জন্মগত দম্ভ ও অহংকার আছে।

গীতায় পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন,

”বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে ব্রাহ্মনে গবি হস্তিনি,
শুনি চৈব শ্বপাকে চ পন্ডিতা সমদর্শিনঃ ।। গীতা ৫/১৮

”অর্থাৎ যারা প্রকৃতই তত্ত্বজ্ঞআনী তারা একজন বিদ্বান ব্রাহ্মন, গাভী, হস্তি, কুকুর এবং চন্ডালের মধ্যে কোন পার্থক্য দর্শন করেন না । পক্ষান্তরে , সকলকে চিন্ময় আত্মা রুপে দর্শন করেন”।
“ যে সাধু – সন্তের কোনো মত , কোনো সম্প্ৰদায় বা কোনো আশ্রমের প্রতি পক্ষপাত নেই , আগ্রহও নেই বিদ্বেষও নেই ; যার আচরণ শুদ্ধ , পবিত্ৰ , যার মধ্যে জীবের কল্যাণ ছাড়া আর কোনো চিন্তা নেই , যার মধ্যে কোনো কামনা – বাসনা নেই ; তিনি সর্বদা ভগবানের দিব্যনাম জপ ও কীর্তন করেন, তিনি স্ত্ৰী , পুরুষ , সাধু অথবা ব্ৰাহ্মণ যে কোনো বৰ্ণ , আশ্রম , সম্প্ৰদায়ভুক্ত হোন না কেন তার সঙ্গ করলে , তার উপদেশ শুনলে , তোর কল্যাণ হবে । ” 
বেশ্যাটি সঙ্গে সঙ্গে তার সোনা-দানা ফেলে সেই সাধুবাবার চরনে সমর্পিত হয়ে, তার নির্দেশমত ভগবানের আরাধনা শুরু করল।।
হরেকৃষ্ণ।।

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started