আনাতোল ফ্রাঁসোর গল্পের সেই কাল্পনিক
পথের যাদুকরের মতোই তারাসুন্দরী তাঁর শিল্পী জীবনের অর্ঘ্যে পূজা করেছেন তাঁর প্রভু শ্রীরামকৃষ্ণকে। যাদুকরের চার্চে ঢোকার মতো একদিনের কথা। ভুবনেশ্বর মঠের পাশেই তারাসুন্দরীর মন্দির ‘ রাখালকুঞ্জ’। স্বামী সুবোধানন্দ (ঠাকুর শ্রীরাকৃষ্ণের ত্যাগী সন্ন্যাসী পার্ষদ) তখন ।গরমকাল দুপুরবেলা।চারিদিক নিস্তব্ধ, শান্ত – জনপ্রানীর কোন সাড়া নেই। মাতাল গরম হাওয়া চারিদিকের গাছগুলির পাতায় পাতায় মর মর ধ্বনি তুলে এলোমেলো বহে চলেছে। খোকা মহারাজ (স্বামী সুবোধানন্দ) ভাবলেন যাই একবার রাখালকুঞ্জে তারা-মার সঙ্গে কথা বলে আসি।ধীর পদক্ষেপে এসে দাঁড়ালেন রাখালকুঞ্জের দরজায়। কোন জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ – মন্দিরের দরজা বন্ধ। তিনি দু-একবার এদিক ওদিক করলেন,কিন্তু না,জানলাগুলোও বন্ধ। খোকা মহারাজ ইতঃস্তত করছেন-ভাবছেন ফিরে যাবেন। হঠাৎ চোখে পড়লো শেষ জানালাটির একটি কপাট খোলা। ধীর পদক্ষেপে খোলা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। গরাদের ফাঁক দিয়ে মন্দিরের ভেতরে তাকিয়ে তিনি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি এক অপরূপ নর্তকীর সাজে সেজেছেন তারাসুন্দরী। বাহ্যজ্ঞানশুণ্য হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের মূর্তির সামনে লীলায়িত ভঙ্গীতে নৃত্য করে চলেছেন। কপাল গাল বেয়ে ঘামের বিন্দুগুলি মুক্তোর আকার নিয়ে ঝরে পড়ছে তাঁর পোষাকে। তাঁর সমগ্র বিশ্বে যেন আর কেউ নেই। শুধু আছেন তাঁর আরাধ্য দেবতা শ্রীরামকৃষ্ণ। সাধিকা যেন তার শিল্পীসত্তার সবটুকু উজার করে দিচ্ছেন তাঁর বিচিত্র পূজাভঙ্গীতে। খোকা মহারাজ সে আরাধনায় বিঘ্ন ঘটালেন না।
নিঃসাড়ে ফিরে গেলেন মঠে।
ফ্রাঁসোর পথের – যাদুকর চিন্তা করতে লাগলো – আমি বই লিখতে পারি না, ছবি আঁকতে পারি না, স্তোত্র রচনা করতে পারি না-কিছুই জানিনা আমি।
আমার এমন কোন গুণ নেই যা দিয়ে মাতা মেরীর
সেবা করতে পারি। ছিঃ! ছিঃ! কি হতভাগ্য আমি।
কিন্তু হঠাৎ তার মনে হলো কেন, আমিতো জাদু দেখাতে পারি! ঠিক আছে এই দিয়েই আমি আমার প্রভু ও মা মেরীর উপাসনা করবো। সে একটি সয় বেছে নিল যখন চার্চের কক্ষে কেউ থাকে না। সে নীরবে চার্চের কক্ষে প্রবেশ করে মা মেরী ও তাঁর কোলের শিশুকে যাদু দেখাতে লাগলো। প্রতিদিন সে ঐসময় আসে আর যাদুর খেলা দেখায়। ধীরে ধীরে তার সব দুঃখ চলে গেল, চোখে মুখে আনন্দের হিল্লোল দেখা দিল। যেন পৃথিবীর কোথাও কোন দুঃক নেই – শুধু আনন্দ। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই চার্চে একটা গুঞ্জন উঠলো – কি করে লোকটা একা একা? চার্চের প্রধান প্রিস্টের কানেও কথাটা এলো। তিনি ও আর দুজন প্রবীণ প্রিস্ট একদিন চুপি চুপি দেখতে লাগলেন ব্যাপারটা। দেখেন যে সেই ভ্রাম্যমান পথের – যাদুকর মাথা নীচে আর পা উপরে করে কয়েকটা ছুরি আর তামার বল নিয়ে মা মেরী আর
তাঁর কোলে যীশুকে তার খেলা দেখাচ্ছে। এঁরা বুঝলেন লোকটার নিশ্চয় মাথা খারাপ,তা নাহলে
কেউ এমন নোংরা জামাকাপড় পরে চার্চে ঢুকে যাদু দেখায়। এ তো ভয়ানক অনাচার। এক্ষুনি ওকে চার্চ থেকে বের করে দাও। ক্রুদ্ধ তিন প্রবীণ প্রিস্ট চার্চের হলের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখে স্থম্ভিত দাঁড়িয়ে রইলেন। এঁরা দেখলেন মা মেরীর কোলে ছোট্ট যীশু যাদুর খেলা দেখে খিল খিল করে হাসছেন আর মা মেরী তাঁকে কোলে নিয়ে বেদী থেকে নেমে আসছেন। যাদুকর যাদু দেখিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে,কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। মা মেরী নেমে এসে যাদুকরের কপাল আর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঘাম তাঁর পরনের গাউন দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছেন। প্রিস্টেরা স্তম্ভিত,হতবাক হয়ে সে দৃশ্য দেখতে লাগলো। তাঁরা তো কত প্রার্থনা
করেছেন, কত স্তোত্র রচনা করেছেন, কত ধর্ম পুস্তক লিখেছেন কিন্তু মা মেরী তাঁদের তো কখনও দেখা দেন নি – কখনো এসে এভাবে স্পর্শ করেন নি। তাঁদের যীশু তো কখনো এভাবে আনন্দে আত্মহারা হননি। অথচ এই রাস্তার নোংরা যাদুকর কোন কিছু না করেই মা মেরীর স্পর্শ পেয়ে ধন্য হয়ে গেল। প্রবীণ প্রীস্টদের মাথা হেঁট হয়ে গেল – তাঁরা হৃদয়ে অনুভব করলেন ব্যাকুলতা,সরলতা আর ঈশ্বর কৃপা ছাড়া তাঁর সান্নিধ্য,স্পর্শ অথবা দেখা পাওয়া যায় না।
স্বামী ব্রহ্মানন্দের তিরোভাবের পর স্বামী শিবানন্দের (মহাপুরুষ মহারাজের) নির্দেশে তারাসুন্দরী ভুবনেশ্বরে ‘রাখাল কুঞ্জে’ স্বামী ব্রহ্মানন্দের নামানুসারে স্মৃতি মন্দির নির্মাণ শুরু
করেন। স্বামী ব্রহ্মানন্দ তাঁর জীবদ্দশায় এই ভূমিতে দাঁড়িয়ে ধ্যানস্থ অবস্থায় বলেছিলেন “সাধন ভজনের উপযুক্ত স্থান – গোমুখী ভূমি,ঈশানে ঈশান
( ভুবনেশ্বরের মন্দির) । তারাসুন্দরীর সাধন পদ্ধতি ছিল সত্যই অভিনব। কখনো ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে গেছে তিনি ধ্যানে ডুবে থেকেছেন। একবার পাশের স্কুলবাড়ীতে আগুন লেগেছিল, ওঁর গোয়ালঘর বাঁচাবার জন্য লোক জড় হয়েছে। হৈ হল্লা চিৎকারে মুখরিত চারিপাশ, তবুও তাঁর ধ্যান ভঙ্গ হয়নি তিনি
ধ্যানে ডুবে ছিলেন। আবার কখনো তাঁর ুপাসনা পদ্ধতির বৈচিত্র্য দেখে আনাতোল ফ্রাঁসের সেই বিখ্যাত গল্প. ” OUR LADY’S JUGGLER”- এর কথা মনে পড়ে যায়। মনে হয় যেন গল্পের সেই কাল্পনিক ভ্রাম্যমান পথের-যাদুকর সত্য সত্যই একদিন তারাসুন্দরীর শরীর ধারণ করে অবতীর্ণ হয়েছিলেন কলকাতার এক পতিতাপল্লীর অন্ধকার
গলিতে। কোথায় মিল – আনাতোল ফ্রাঁসোর কাল্পনিক যাদুকরের গল্পটিই বা কী? শোনা যাক সেই গল্প।
আকাশ ছোঁয়া চার্চের সামনে সবুজ ঘাসে ঢাকা একটি সুন্দর পার্ক। ফ্রাঁসোর পথের-যাদুকর পথে পথে শিশুদের যাদুর খেলা দেখিয়ে পার্কের বেঞ্চিতে বসে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে প্রতিদিন বিশ্রাম নেয়। অপলক নেত্রে চেয়ে থাকে ঐ নীরব, শান্ত পবিত্র চার্চটির দিকে। তার জামা কাপড় ময়লা তাই সে চার্চে প্রার্থনা সভায় ঢুকতে পারে না। মনে খুব ইচ্ছা এদিন চার্চে প্রবেশ করে দেখবে মা মেরীর কোলে তার শিশু প্রভুকে। প্রিস্টরাই বা কেমন – কোন ধারণাই নেই তার। একদিন কোথাও কোন মানুষের উপস্থিতি না দেখে সে চার্চে প্রবেশ করলো। দেখল প্রিস্টরা মা মেরীর উপাসনা করছেন। খোঁজ নিয়ে জানলেন সব প্রিস্টরাই খুব গুণী। কেউ ধর্ম পুস্তক লেখেন, কেউ সেই বইয়ের অনুলিপি রাখেন,আবার কেউ সেইবইয়ের পাতায় ছবি আঁকেন; আবার কেউ মেরীর সম্বন্ধে স্তোত্র রচনা করেন, কেউ আবার মা মেরী ও তাঁর প্রভুর গান গেয়ে থাকেন। এঁদের সেই সুন্দর জীবনযাত্রা দেখে যাদুকরের নিজের সম্বন্ধে ধিক্কার এলো। আমি বই লিখতে পারি না, ছবি আঁকতে পারি না, স্তোত্র রচনা করতে পারি না-কিছুই জানিনা আমি।
শান্তির শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে অসহায় তারাসুন্দরী
মঠে যাবার মতো মানসিকতা অবস্থাটুকুও হারিয়ে ফেললেন। স্বামী শিবানন্দ লোক পাঠিয়ে তারাসুন্দরীকে ডেকে আনলেন।
– কি গো তারা মা , আর আস না কেন?
– আর কার কাছে আসব মহারাজ? রাজা – মহারাজই তো নেই।
– সে কি গো নেই কি? ঠাকুর আছেন আমরা আছি।
আর সর্বোপরি আছে শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শ। যে দীপ
তিনি জ্বেলে দিয়ে গেছেন – সে যে অনির্বাণ! সেই দীপে আলোকিত করো নিজেকে – নিজের শিল্প সুষমায় বাংলার মানুষকে।
সেই অনির্বাণ দীপের উদ্ভাসিত আলোকে বিভাসিত হয়ে তাঁর শিল্প সুষমায় সমকালীন বঙ্গসমাজকে তিনি অভিভূত করে রাখলেন। মিনার্ভা থিয়েটারের এক সভায় শ্রীযুক্ত বিপিনচন্দ্র পাল মহাশয় বলেছিলেন: “ইউরোপ ও আমেরিকার কোন রঙ্গমঞ্চে তারাসুন্দরীর রিজিয়ার ভূমিকায় অভিনয়ের মতো অভিনয় তিনি দেখেন নাই।” কারও কারও মতে তারাসুন্দরী পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্টা
অভিনেত্রীদের অন্যতমা। বিনোদিনীর মতো তারাসুন্দরীও সুলেখিকা ছিলেন। তাঁর রচনার মধ্যে
আত্মানুসন্ধান ও আত্মানুশোচনার একটি অকৃত্রিম
সুর সুস্পষ্ট হয়ে আছে। তাঁর সমগ্র জীবনের মধ্যে ত্যাগ ও বৈরাগ্যের রূপটি ফুটে ওঠে তা সমকালীন সকল অভিনেত্রীদের থেকে তাঁকে এক স্বতন্ত্র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
“সৌরভ” পত্রিকায় প্রকাশিত তারাসুন্দরীর দুটি কবিতার কিছু প্রাসঙ্গিক অংশের দিকে দৃম্টিপাত করলে তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টির একটি সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর একটি কবিতা “প্রবাহের রূপান্তর” -এ তিনি লিখেছেন-
শ্মশান জীবন মম নন্দনকানন সম
পাপস্মৃতি দূরে গেছে ফুটেছে নয়ন।
জীবনের গুরুভার,কাতর করে না আর
কে আমার ঘুচাইল ভ্রম আচ্ছাদন?
ক্ষুদ্রমতি নারীপ্রাণ, অর্থ আশা অভিমান
কালের কুটিল স্রোতে, হয়ে দিশাহারা।
অন্ধকার আলিঙ্গন, করিয়াছি আজীবন
প্রলোভনে সঁপি মন হইয়াছি সারা।
ভবিষ্যৎ বিভীষিকা, প্রেতময়ী মরীচকা
প্রতিকৃতি যদি তার,মিলেছে আমার।
যৌবনে প্রবৃত্তি যত,সৌরভে করবে রত
পরিমল পবিত্রতা কর অনুসার।
অথবা তাঁর “কুসুম ও ভ্রমর” কবিতায় উদ্ভিন্ন যৌবনের হাহাকার তিনি ব্যক্ত করেছেন –
নারীর যৌবন সম গরব তোমার।
যতদিন মধু রবে, আদরের ধন হবে ,
অবহেলে বিলাইলে, মান আপনার।
না বুঝিলে ছলনা এ কুটিল ধরার।
সুবাস ধরছে বুকে,কি হেতু ছড়াও?
গুনের গরিমা নাই, অযতনে বুঝি তাই
সাধের সৌরভ হায়! অবাধে লুটাও।
বিকৃতি প্রকৃতি লয়ে কিবা সুখ পাও?
বিচিত্র চরিত্রে মুগ্ধ, অন্তর আমার!
খেলিলে পবন সনে, সুমধুর আবাহনে,
পরাগ ছড়ায়ে মোরে ডেক’ নাকো আর!
অনুমাত্র পড়ে আছি – ধরে এ সংসার!
অন্ধকার জীবনের ভোগ লোলুপতা, নির্যাতিত, নারী সমাজের যন্ত্রণা,নিশিথের বিকৃত যাত্রীদের নিঃশব্দ পদচারণা তারাসুন্দরীকে একদিন উদাস করে তুলেছিল। তাঁর আত্মানুশোচনা তীব্রতর হয়ে তাঁকে ত্যাগের পথে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাই সমাজ থেকে দূরে সংসারে অনুমাত্র পড়ে থাকার মধ্যে জীবনের সার্থকতা খুঁজেছিলেন তারা।
তারাসুন্দরীর জীবনের শেষ বারো বছর কেটেছে এই ‘রাখাল কুঞ্জে’। থিয়েটার ছেড়ে দিয়েছেন এমনকি থিয়েটার যা কিছু স্মৃতিচিহ্ন ছিল তা একদিন আগুনে পুড়িয়ে নষ্ট করে দিয়েছেন। মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসা হলো বলাই মহারাজের পরামর্শে। এই সময় শিশির কুমার ভাদুরীই তাঁর চিকিৎসার সব রকম চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু তখন আর শেষদিনের বেশী দেরী নেই।শেষের সেই দিনটির কথা তাঁর কন্যা প্রভাতী খান্নার স্মৃতি চারণে এমনিভাবেই বলা আছে।
” চৈত্র মাস – রামনবমীর পরের দিন,সকাল ১০টা ৫৫ মিনিট। মা আমায় বললেন ,’গীতা পাঠ কর,আজ আর আমি পড়তে পারছিনা তুই পড় আমি শুনি।’ আমি এক অধ্যায় গীতা পাঠ করলাম, মা আমায় বললেন ‘ রঘুপতি রাঘব রাজারাম গানটি গাও।’ আমি মার বুকের কছে মাটিতে বসে সেই গানটি গাইছি, মা শুনছেন।আশেপাশের অনেকেই এসে গেছেন, তাঁরাও আমার সাথে গলা মিলিয়ে গানটি গাইতে লাগলেন। মা আবার এক ঝলক রক্ত বমন করলেন। নিঝের হাতে পিকদানী টেনে নিয়ে – যেন পানের পিক ফেললেন। বালিশে মাথা রাখলেন-সামনেই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের একটা ছবি ছিল, তাঁর দিকে বিস্ফারিত নয়নে চেয়ে শব্দহীন হা হা হা হাসিতে যেন লুটিয়ে পড়লেন। সব শেষ -সমাপ্তি একটি সার্থক সাধিকা ও অভিনেত্রী জীবনের – সমাপ্তি একটি ব্যর্থ বঞ্চিতা সমান-নিপীড়িত নারী জীবনের।” ১৮৭৯ থেকে ১৯৪৮ দীর্ঘ আটষট্টী বছরের সার্থক পরিক্রমা শেষে ফিরে গেলেন অসামান্য গুণসমপন্না এক সাধিকা অভিনেত্রী।
তারাসুন্দরীর বাড়ী ছেড়ে দুজনে অন্য একটি বাড়ীতে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। যাযাবরের মতো জীবন। হঠাৎ মণিমালার মনে হলো তিনি বড় একা –
তাঁর মনের কোন আশ্রয় নেই। গুমরে উঠলো এক অচেনা কান্না। এই কান্নার উৎস কোথায় মণিমালা
তা জানেন না। নিজের অজান্তেই মনের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করলেন একটি প্রদীপ হাতে। আশ্চর্য ! কত মনিমুক্তাই না ছড়িয়ে আছে সেখানে – জন্মপ্রবাহের পঙ্কিল সংস্কারে মাখামাখি। তারাসুন্দরীর মতো একাগ্র হয়ে প্রার্থনা করে চললেন ” প্রভু প্রকাশিত হও, ” আলোর ঝরণা ধারায় ধুইয়ে দাও।” শ্রীরামকৃষ্ণের চরণদুটিতে মাথা রেখে আকুল হয়ে কেঁদে চললেন। লক্ষ্মীকান্তের মধ্যেও দেখা গেল এক অবাবনীয় পরিবর্তন । বুক টেনে টেনে বাতাস নিয়েছেন এতদিন, – চোপসানো ফুসফুস দুটো বোধহয় বাতাস ধারণ করার ক্ষমতা হাড়িয়ে ফেলেছে।তবু ইদানীং কোথাকার কোন অজানা বরফের পাহাড় ছুঁয়ে আসা শুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে ভাল লাগে। আর ভালোলাগে মণিমালার আরাধ্য ঐ পটটির দিকে অপলক নেত্রে চেয়ে থাকতে। খবর এসেছে বেলুড় মঠে উৎসবের আয়োজন হচ্ছে। তারাদি নিশ্চয় যাবেন। আত্মসমর্পণের এই শেষ সুযোগ।
তারাসুন্দরী আকৃষ্ট করলেন আর এক অভিনেত্রী – মণিমালাকে। মণিমালা তখন সবেমাত্র থিয়েটারে ঢুকেছেন। অল্প বয়স-সত্যকার সুন্দরী। তাঁর রূপের জৌলসে দবাই বিমোহিত। শুধু তাঁকে একবার দেখবার জন্য থিয়েটার কক্ষে তখন মানুষের ঢল।
তাঁর অভিভাবক লক্ষ্মীকান্ত মুখোপাধ্যায় দিনের বেলা অফিসে কাজ করেন আর রাত্রে থিয়েটার করেন। তারাসুন্দরী ও অপরেশ মুখোপাধ্যায় তখন বেলুড় মঠের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। প্রায়ই মঠ থেকে প্রসাদ এনে থিয়েটারের সকলকে ভাগ করে খাওয়াতেন। সে প্রসাদ সকলেই পরম আগ্রহে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্হন করতেন – একমাত্র ব্যতিক্রম লক্ষ্মীকান্ত। তিনি মুখের ওপর স্পষ্ট বলে দিতেন, ” আমি মানুষের এঁটো খাই না। ” শ্রীরামকৃষ্ণকে নিবেদিত খাদ্য তাঁর কাছে এঁটো অর্থাৎ উচ্ছিষ্ট। প্রসাদ প্রত্যাখান করে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ ও তাঁর ভাবধারার প্রতি একরকম
বিদ্রোহ ঘোষনাই করেছিলেন। সমকালীন নটনটীকুলে লক্ষ্মীকান্ত মুখোপাধ্যায়ই একমাত্র ব্যতিক্রমী।
ভাগ্যের ফেরে লক্ষ্মীকান্ত একসময় তারাসুন্দরীর বাড়িতে এলেন বাস করতে। তারাসুন্দরীর পারিবারিক জীবনের সান্নিধ্যে এসে মণিমালা ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হলেন তাঁর শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি নিষ্ঠা ও একাগ্রতার দিকে। লক্ষ্মীকান্তও নিজের মনের দিকে চেয়ে বিচলিত হলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি যে সীমাহীন বিমুখতা তাঁকে এতদিন আবিষ্ট করে রেখেছিল তা কি এক অজানা আকর্ষণে ধীরে ধীরে তীব্রতা হারিয়ে যেন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তিনি অনুভব করলেন যে, পুরাতন লক্ষ্মীকান্ত ধীরে ধীরে এক নতুন লক্ষ্মীকান্তে রূপান্তরিত
বেলুড় মঠে উৎসব। তারাসুন্দরী মঠে গেছেন। তাঁর
ইচ্ছা সারাদিন সেখানে কাটিয়ে সন্ধ্যার আগেই ফিরবেন। বেলা চারটায় যখন তিনি ফেরার জন্য তোরজোড় করছেন, তখন তাঁর কাছে খবর গেল, এক ভদ্রলোক ও একটি মেয়ে মঠের গেটে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। তারাসুন্দরী অবাক হলেন। তাঁর সঙ্গে মঠে কে দেখা করতে এলো। তাড়াতাড়ি গেটের কাছে এসে দেখেন, লক্ষ্মীকান্ত ও মণিমালা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। তারাসুন্দরীর বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার পর অনেকদিন তিনি তাদের কোন সংবাদ পান নি।
দেখলেন লক্ষ্মীকান্ত অত্যন্ত অসুস্থ। দীর্ঘপথ অতিক্রম করে এসে তাঁর গা-হাত-পা কাঁপছে। তাড়াতাড়ি তাঁদের মঠের সব কিছু দেখাবার বন্দোবস্ত করা হলো। প্রবল আগ্রহ নিয়ে সেই অসুস্থ শরীরেই একপ্রকার দেহটি টেনেটেনে লক্ষ্মীকান্ত সব ঘুরেঘুরে দেখলেন। ভক্তির সঙ্গে প্রসাদ গ্রহন করলেন। অবশেষে মহাপুরুষ মহারাজের ( স্বামী শিবানন্দের) কাছে গিয়ে দীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রার্থনা জানালেন। কিন্তু শরীর সুস্থ নাহলে তো দীক্ষা হবেনা। দিনক্ষন দেখে মণিমালার দীক্ষার ব্যবস্থা হলো – ঠিক হলো লক্ষ্মীকান্তের শরীর সুস্থ হয়ে উঠলে তারও দীক্ষার ব্যবস্থা হবে। নির্দিষ্ট দিনে মণিমালা মন্ত্র পেলেন লক্ষ্মীকান্ত আর সুস্থ হয়ে ওঠেন নি। মৃত্যুকালে মণিমালার.হাত ধরে কেঁদে কেঁদে বললেন, ” মণি, আমি চললাম। এই জীবনে আমার আর ঠাকুরের আশ্রয় পাওয়া হলো না। তুমি পুণ্যবতী, তুমি তাঁর কৃপা পেয়েছ।”
মণিমালাও আর বেশীদিন বাঁচেননি। লক্ষ্মীকান্ত চলে যাবার পর নিঃসহায় মণিমালা আর কারুর কাছে আশ্রয় ভিক্ষা করেননি। ভুলতে চেয়েছেন অতীতের সেই দুঃস্বপনের মতো নারকীয় জীবন।
নেশাগ্রস্ত কামনালোলুপ মানুষের পাশবিক ব্যবহারের স্মৃতিগুলি আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। তাঁর একমাত্র সম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণ ও শ্রীশ্রী মার দুটি পট। রাতদিন নাম জপ আর শ্রীরামকৃষ্ণের চরণে মাথা রেখে আকুল কান্নায় তাঁর কৃপা প্রার্থনা – কৃপা কর প্রভু , তোমার শ্রীচরণ পাদপদ্মে আশ্রয় দাও প্রভু। তুমি ছাড়া যে আমার আর কেউ নেই। তুমি এসে আমার হাত ধরো – এ হৃদয়ে প্রকাশিত হও, প্রভু। অবশেষে শেষের সেই দিনটি দরজা পেড়িয়ে ঘরে এসে দাঁড়ালো। কঠিন অসুখে আক্রান্ত হয়ে মণিমালা বিছানা নিয়েছেন। অসুখের বাড়াবাড়ি শুনে থিয়েটারের কিছু পরিচিত কলাকুশলী ও কাছে-পিঠের কিছু প্রতিবেশী এসে জড় হয়েছেন। মণিমালা নির্বাক – শুধু ঠাকুরের পটটির দিখে চেয়ে রইলেন। ঠোঁট দুটি আস্তে আস্তে নড়ছে, দুচোখের অশ্রুধারায় মাথার বালিশ সিক্ত হয়ে উঠেছে। হঠাৎ তাঁর চোখদুটি বিস্ফোরিত হয়ে উঠল – তিনি যেন কিছু দর্শন করছেন। বুকের উপর হাত দুটি জোড় করে অস্ফুট স্বরে চিৎকার করে উঠলেন , ” প্রভু, প্রভু আমার তুমি এসেছো! একটু দাঁড়াও প্রভু, চরণে আমার প্রণাম নাও। ” সবাই অবাক হয়ে দেখতে লাগলো এক অপরূপ লাবণ্যময় বিমল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে মণিমালা যেন তাঁর প্রভু শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে দর্শন করছেন। ধীরে ধীরে নিথর হয়ে গেল তাঁর দেহটি। এক অপূর্ব মৃত্যু! পতিতপাবন ঠাকুর যেন তাঁর পদাশ্রিতা ভক্তিমতী মণিমালার হাত ধরে তাঁর আপন সাম্রাজ্যের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন।
এই অমর কাহিনীগুলি আজও বিস্মৃতির স্তুপে চাপা পড়ে আছে। কেই বা তার খবর রাখে?
।। জয় শ্রীরামকৃষ্ণ ।।