স্বামীজীর পত্রাবলী

স্বামীজীর পত্রাবলী     :  -**”নমঃ শ্রীযতিরাজায় বিবেকানন্দ সুরয়ে।*    *সচ্চিৎসুখস্বরূপায় স্বামিনে তাপহারিণে।।”*    ।।ঔঁ।।(মিস মেরী হেলকে লিখিত)২৩শে এপ্রিল, ১৯০০প্রিয় মেরী,   আজই আমার যাত্রা করা উচিত ছিল, কিন্তু ঘটনাচক্রে যাত্রার পূর্বে ক্যালিফোর্নিয়ার বিশাল রেড-উড বৃক্ষরাজির নিচে তাঁবুতে বাস করার লোভ আমি সংবরণ করতে পারলাম না।   তাই তিন-চার দিনের জন্য যাত্রা স্থগিত রাখলাম। তাছাড়া অবিরাম কাজের পরে এবং চার দিনের হাড়ভাঙ্গা ভ্রমণে বেরোবার আগে ঈশ্বরের মুক্ত বায়ুতে শ্বাস নেওয়ার প্রয়োজন আমার ছিল।   ‘মেরী-পিসী’র সঙ্গে পনের দিনের মধ্যে দেখা করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তা রাখবার জন্য তাগিদ দিয়ে মার্গট চিঠি লিখেছে।   কথা আমি রাখব, তবে পনের দিনের জায়গায় বিশ দিন হবে, এই যা। এতে চিকাগোয় এখন যে বিশ্রী তুষার-ঝড় চলছে, তার হাত এড়াতে পারব, অধিকন্তু কিছু শক্তিসঞ্চয়ও করে নেবো।   মার্গট দেখা যাচ্ছে মেরী-পিসীর দারুণ অনুরাগী।   আগামীকাল বনের দিকে যাত্রা করছি। উফ! চিকাগো যাবার আগে ফুসফুস ওজোন (Ozone)-এ ভরে নেবো। ইতোমধ্যে চিকাগোয় আমার নামে ডাক এলে রেখে দিও, লক্ষ্মী-মেয়েটির মতো সেগুলি যেন আবার এখানে পাঠিয়ে দিও না।   কাজ শেষ করে ফেলেছি। রেলভ্রমণের ধকলের আগে শুধু কয়েকদিনের – তিন কি চার দিনের – বিশ্রামের জন্য বন্ধুরা পীড়াপীড়ি করছেন।   এখন থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত তিন মাস মেয়াদের একটি ফ্রী পাস (Free pass) পেয়েছি; ঘুমের কামরার খরচা ছাড়া আর কিছু খরচা নেই; অতএব, বুঝতেই পারছ – মুক্ত, মুক্ত (Free, free)!             তোমাদের স্নেহশীল, বিবেকানন্দ।………..কাজ করাটা ধর্ম নয় বটে, তবে ঠিক ঠিক ভাবে অনুষ্ঠিত কাজ মুক্তির দিকে নিয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে অপরকে করুণার চক্ষে দেখা অজ্ঞানমাত্র, কারণ আমরা করুণা করব কাকে?
তুমি ঈশ্বরকে করুণার চক্ষে দেখতে পার কি?
ঈশ্বর ছাড়া আর কিছু আছে কি?
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দাও যে, তিনি তোমাকে তোমার আত্মোন্নতির জন্য এই জগৎরূপ একটি নৈতিক ব্যায়ামশালা দিয়েছেন, কিন্তু কখনও ভেবো না—তুমি এই জগৎকে সাহায্য করতে পার।
তোমায় যদি কেউ অভিশাপ দেয়, তার প্রতি কৃতজ্ঞ হও, কারণ গালাগালি বা অভিশাপ জিনিষটা কি, তা দেখবার জন্য সে যেন তোমার সম্মুখে একখানি আরশি ধরেছে, আর তোমাকে আত্মসংযম অভ্যাস করবার অবসর দিচ্ছে।সুতরাং তাকে আশীর্বাদ কর ও সুখী হও।
অভ্যাস করবার অবকাশ না হলে শক্তির বিকাশ হতে পারে না, আর আরশি সামনে না ধরলে আমরা নিজের মুখ নিজে দেখতে পাই না।…….অপবিত্র চিন্তা ও কল্পনা অপবিত্র ক্রিয়ার মতই দোষাবহ। কামনা দমন করলে তা থেকে উচ্চতম ফললাভ হয়।
কাম-শক্তিকে আধ্যাত্মিক শক্তিতে পরিণত কর, কিন্তু নিজেকে পুরুষত্বহীন কর না, কারণ তাতে কেবল শক্তির অপচয় হয়।
এই শক্তি যত প্রবল থাকবে, এর দ্বারা তত অধিক কাজ সম্পন্ন হতে পারবে। প্রবল জলের স্রোত পেলে তবেই জলশক্তির সাহায্যে খনির কাজ করা যেতে পারে।……স্বামীজী

তাহলে শিক্ষা কেন? শিক্ষা মানুষের বংশের তপস্যার, সাধনার, ভক্তির প্রতীক II শিক্ষা আর সূত্র

শিক্ষা আর সূত্র–

১. জন্মনা জায়াতে শূদ্রঃ। …জাত্যা শুভ্র অষ্টম বর্ষের সংস্কারের দ্বারা দ্বিজ হয়।  দ্বিজের প্রধান চিহ্ন শিক্ষা এবং সূত্র।
২.এই  দুটি চিহ্ন থাকলে অগ্নিকার্য করতে পারবে।
শিক্ষা আর সূত্র--
শিক্ষা আর সূত্র

৩. অগ্নিকার্য কি? পুরাকালে হিন্দুদের দেবী-দেবতার বিগ্রহ থাকতো না।  অগ্নি ই দেবতা। অগ্নির দেখা শুনা করা, নিত্য ভোগ দেওয়া, সব ব্রাহ্মণ করতেন। যখন পুত্র আট বছরের হতো, পিত তাকে শিক্ষা সূত্র দিয়ে অগ্নির অধিকার প্রদান করতেন, গার্হপত্য অগ্নি।

৪. যখন পিতা নিবৃত্ত হতেন, তার নাম ছিল বানপ্রস্থ অবস্থা। তার পরের অবস্থা সন্ন্যাস। তখন শিক্ষা আর সূত্র ত্যাগ করতে হতো।
৫. অর্থ কি? জন্মে শিক্ষা সূত্র ছিল না, সন্ন্যাসে শিক্ষা সূত্র থাকবে না।
৬. শিক্ষা তাহলে কেন? শিক্ষা বংশাবলীর প্রতীক। সন্ন্যাসী (ব্রহ্মচর্য থেকে সন্ন্যাসী হোক, বা বাণপ্রস্থের পর) শিক্ষা কেটে দিয়ে বংশের সাথে সমস্ত রকমের সম্পর্ক কেটে নিতো।
৭. তাহলে শিক্ষা কেন? শিক্ষা মানুষের বংশের তপস্যার, সাধনার, ভক্তির প্রতীক।

What keeps our mind in high level December 25

What keeps our mind in high level?                      

 December 25
The night is the ideal time for spiritual practice. Meditation and japa should be performed regularly with great devotion. They purify the mind. Continued for some time, regular practice of this kind is conducive to the establishment of a constant spiritual mood, giving one a taste of inner joy. A person should not leave his seat immediately after meditation but should sit for a while thinking about the object of his meditation. Then he may recite prayers and hymns along similar lines to intensify and stabilize the meditative mood and inner joy. Even after leaving his seat he should not talk with anyone, but should rather be contemplative and remain by himself for some time. Practice like this fosters a continuous undercurrent of meditation, helping to keep the mind on a high level and bringing to the heart great joy.
(p.5, For Seekers of God, Swami Shivananda’s advice on 25 December 1920).                             

Ramakrishna sarada ashram Antpur II (রামকৃষ্ণ সারদা আশ্রম (আঁটপুর) থেকে প্রকাশিত ২০১০-২০১১ বার্ষিক

(রামকৃষ্ণ সারদা আশ্রম (আঁটপুর) থেকে প্রকাশিত ২০১০-২০১১ বার্ষিক ‘
     
   (১৯শ পর্ব)
ভুবনেশ্বরমঠ তখনও সম্পূর্ণ হয়নি, সূত্রপাত হয়েছে মাত্র। রাজা মহারাজ সেখানেই আছেন – মঠ গড়ে তোলার কাজে ব্যস্ত। শিষ্যা তারাসুন্দরী আজীর্ণ রোগে ভুগছেন। মহারাজ বললেন ভুবনেশ্বরে কেদার-গৌরীর জল নিয়মিত খেলে সবরকম পেটের রোগ ভাল হয়। তারাসুন্দরী গেলেন ভুবনেশ্বর। দুধওয়ালা ধর্মশালায় থাকেন কিন্তু শ্রী রামকৃষ্ণের প্রসাদ ছাড়া অন্য কোন কিছুই খাবেন না।মঠ থেকে রোজ প্রসাদ পাঠানোর বন্দোবস্ত হলো। স্বামী ব্রহ্মানন্দের তাই নিয়ে রোজ তাড়া। ঠাকুরের ভোগ হতেই আগে পাঠিয়ে দিতেন দুধওয়ালা ধর্মশালায়। তাঁর এত ছটফটানির কারণ
“তাঁর তারামা পজো করে এখনো পর্যন্ত জলটুকুও মুখে দেয়নি।” যে লোকটি প্রসাদ নিয়ে যেত তার একখুঁটে প্রসাদী পান অন্য খুঁটে চা-চিনি। তখন ভুবনেশ্বরে ওসব জিনিস পাওয়া যায় না। তারাসুন্দরীর চোখে জল আসত-পিতৃস্নেহ কি তা তিনি কোনদিন জানতে পারেন নি – গুরুস্নেহধারায় তাঁর সে অভাব দূর হয়ে যেত। কোনদিন হয়ত সঙ্কোচে কুন্ঠায় বলেছেন, ” কাল থেকে আমি নিজে এসেই প্রসাদ পেয়ে যাব।” তীব্র ভাবে নিষেধ করেছেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ, “না, নাগো তারামা, দুপুরে বড় রোদ্দুর-এদেশে গাড়ী পাওয়া যায়না। তুমি কষ্ট করে এসো না-আমিই তোমায় প্রসাদ পাঠিয়ে দেব।” তারাসুন্দরী নীরবে বসে চোখের জলে ভেসেছে – এত নিস্বার্থ স্নেহ! সমাজের জ্ঞানীগুণী মানুষেরা যখন এই দেহটির প্রতি ঘৃণায় চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে
তখনই সেই নরদেহধারী ঈশ্বরের করুণার পাবণী ধারা তাঁঁর মানস পুত্রের মাধ্যমে এই পতিতার প্রতি বর্ষিত হচ্ছে! এই অহেতুকী কৃপার যোগ্য কী আমি!
শিশু সারদার স্বামী নির্বাচন এক যাত্রার আসরে। উত্তরকালে তিনিই এগিয়ে এলেন অভিনয় জগতের প্রেরণাদত্রীর ভূমিকায়। শ্রীরামকৃষ্ণের তিরোভাব ও গিরিশচন্দ্রের লোকান্তরের পরবর্তিকালে স্বয়ং সারদাদেবী শ্রীরামকৃষ্ণের এই শূণ্যস্থানটি পূর্ণ করেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ যে আদর্শ স্থাপন করে গেলেন, আদর্শ অনুসরণ করে এগিয়ে গেলেন সঙ্ঘজননী।                             
                          (২০শ পর্ব)
মা সারদা তখন ভীষন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ‘উদ্বোধনে’ ঘরের মেঝেতে শুয়ে আছেন। দুপুরবেলা। তারাসুন্দরী এসে বসেছেন সামনের বারান্দায়। মাকে ভক্তিভরে প্রণাম করে যুক্তকরে বসে মৃদু স্বরে  কথা কইছেন। মা বললেন, ” থিয়েটারে তো বেশ বলো। কেমন সেজেগুজে আসো – তখন আর তোমাকে চেনাই যায়না। আচ্ছা,
আমাদের এখন একটু শোনাও দেখি।’ মাতৃ আদেশ
! জোড় হাত করে মা সারদাকে নমস্কার করে ‘জনা’
থেকে আবৃত্তি করতে শুরু করলেন – প্রবীরের বীর রসাত্মক সংলাপের কিছু অংশ। সমস্ত বারান্দা, ঘোর,দোর,ছাদের কার্নিসে কার্নিসে প্রতিধ্বনিত হতে
লাগলো তারার সেই যাদুকরী ক ন্ঠস্বর। সবাই নিঃশব্দ, হতবাক্। অভিনয় শেষ করে প্রণাম করে সেদিনের মতো বিদায় নেবার সময় মা বললেন ,
” আর একদিন সময় করে এসো।” 
একদিন কেন অনেকদিনই গেছেন তারাসুন্দরী। সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন সে যুগের আর এক প্রসিদ্ধ অবিনেত্রী তিনকড়িকে। কখনও তিনি ঠাকুরের ঘরে প্রবেশ বা মা-য়ের শ্রীচরণ স্পর্শ করতেন না। বাইরে বসেই গলবস্ত্র হয়ে মা ও ঠাকুরকে প্রণাম করতেন। মা তাঁদের যত্ন করে প্রসাদ খাওয়াতেন তারপর নিজহস্তে পান দিতে। একদিন মা তিনকড়িকে বললেন, “বিল্বমঙ্গল- নাটকের পাগলিনীর ‘ আমায় নিয়ে বেড়ায় হাত ধরে ‘ গানটি একটু শোনাওতো মা।” তিনকড়ি প্রানমন সমর্পন করে তাঁর অনবদ্য কন্ঠস্বরে গানটি গাইতে লাগলেন। ভাবাবিষ্ট মা সারদা সমাধিস্থ হলেন। কিছুক্ষন পরে পরমস্নেহে তিনকড়িকে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন- ” আজ কি গানই শোনালি মা।”
     
                          (২১শ পর্ব)
জগজ্জননীর স্নেহের দুর্বার আকর্ষণে তারাসুন্দরী অস্থির হয়ে পড়তেন। কিভাবে ে মায়ের সেবা করবেন ভেবে পেতেন না। হঠাৎ হাজির ট্যাক্সি করে। গাড়ি বোঝাই মালপত্র-দই, মিষ্টি, ম্যাঙ্গোষ্টীন, লেবু, কলা, বাতাবি, আঙুর, বেদানা, আনারস। নিয়ে এসেছেন রজনীগন্ধার গুচ্ছ, সকলের জন্য কাপড় ও ছোটদের জন্য পশমী জুতো। যেন মেয়ে এসেছে মায়ের কাছে। যতটা এনেছেন তার থেকে আরো আরো অনেক বেশী আনতে পারলে যেন খুশী হতেন। নিঃস্ব হয়ে সব উজার করে দিতে পারলেই যেন তাঁর ভান্ডার পূর্ণ হতো। মা সারদার
সেদিন জ্বর। দরজার বাইরে থেকে প্রণাম করলেন তারাসুন্দরী। মা হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন। ভগবতীর দয়া কাঁটাগাছকে বাছে না-সে দয়ার পাত্র পাত্রী নেই,সে দয়ার বিচার করে না, ব্যবহারিক জগতের কোন বিধি নিষেধ মানে না; সে কেবল  জাতি-ধর্ম নির্বিচারে সকলকে পবিত্র করে নেয়।
জীবনের সহস্র লাঞ্ছনার, ঘৃনা ও উপেক্ষার মধ্যেও তারার জীবনে শ্রীমার এই প্রাণ উজার করা আশীর্বাদ তাঁকে মহত্তর ভাবচেতনায় উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিল।
কিন্তু না জগজ্জননীর সেবা করার সুযোগ তারাসুন্দরী বেশীদিন পেলেন না। ১৯২০জুলাই ৩রা শ্রাবন।  সকাল থেকেই প্রকৃতিতে বিষন্নতার সুর। মার অসুখ বাড়াবাড়িতে পৌঁছে গেছে। রাধুকে এক সপ্তাহ আগেই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন তোদের মায়া একবারে কাটিয়েছি। যা যা আর পারবিনি। কুটো ছেঁড়া করে দিয়েছি। তুই আমার কী করবি? সারদানন্দজী হতাশ হয়ে বললেন,” তবে আর মাকে রাখা গেল না। আর আশা নেই। ” সবাই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। শ্রীশ্রী মায়ের ফুসফুস দুটি কেউ যেন সাঁড়াশী দিয়ে চেপে ধরেছে। উত্থানশক্তি হীন দেহটিতে যুক্ত হয়েছে শ্বাসের টান। আবের মতো চোখ দুটি ঠেলে বেড়িয়ে এসেছে। রাত ১১টায় অক্সিজেন দেবার ব্যবস্থা হলো। দন্ড,পল একেকটি মুহূর্ত যেন অনন্ত কালের মত দীর্ঘ। সময় মধ্য রাত। শ্বাসের শব্দ হঠাৎই গতি হারিয়ে মন্থর হয়ে গেল। কয়েক মিনিটের নিস্তব্ধতা। জোড়ায় জোড়ায় চোখগুলি সব নিথর স্থির। বর্ষনসিক্ত শ্রাবণের
নীরব রাত্রের কিছু শোকার্ত শরীরের কান্নার রোল বাগবাজারের আকাশ বাতাস ভারাক্রান্ত করে তুললো।
     
                          (২২শ পর্ব)
খবর পৌঁছল তারাসুন্দরীর কাছে। মাতৃহারা শিশুর মতন আকুল কান্নায় বিছানায় আছড়ে পড়লেন তারা। যে মহাশক্তির আশীর্বাদ মাথায় ধারণ করে জীবনের বন্ধুর পথটুকু পার হবেন ভেবেছিলেন , সেই মহাশক্তিও অন্তর্হিত হলো।আর মা বলে ডেকে
কারুর কাছে গিয়ে শান্তি ভিক্ষা করার পথটিও রুদ্ধ হয়ে গেল। তারাসুন্দরী মনপ্রান সঁপে দিলেন তাঁর দীক্ষাগুরু স্বামী ব্রহ্মানন্দের পয়ে। জ্বালা-যন্ত্রণায়,  দুঃখে-হতাশায় তাঁর একমাত্র সহমর্মী রাজা মহারাজকে জীবনের সম্বল করে জীবনের বাকী পথটুকু হাঁটার স্বপ্ন দেখলেন। কিন্তু না, মায়ের তিরোধানের পর দুটি বছর কাটতে না কাটতেই সেই ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ তারার সমস্ত সপ্নকে ভেঙে চুরমার করে দিল। ১৯২২সালের ১০ই এপ্রিল, সোমবার রাত্রি পৌনে নটায় শ্রীরামকৃষ্ণের মানসপুত্র রাজা মহারাজ নিত্যলীলায় প্রবেশ করলেন। শোকস্তব্ধ তারাসুন্দরী সুদূর দিগন্ত রেখায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মূক হয়ে রইলেন। রাজা মহারাজের তিরোভাবে এক অসীম শূণ্যতা যেন তারাসুন্দরীকে গ্রাস করলো। জগতটা যেন পাল্টে গেল। অসহায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শোকে দুঃখে মৃত প্রায় হয়ে শয্যা গ্রহন করলেন। অভিনয় ছেড়ে দিলেন। আর যেন সংসারে থাকবেন না, এমন পাগলের মতো অবস্থা। এই অসীম শূণ্যতার মধ্যে রাজা মহারাজের স্মতিচারণ করে লিখলেন:
“কে আমি? সমাজের কোন স্তরে আমার স্থান? কত-কত নিম্নে ঘৃণা আর অবজ্ঞা ছাড়া জগতের কাছে যার প্রাপ্য আর কিছু নাই – না বন্ধু -না পিতা – না আত্মীয় -এত বড় সংসারটা – এ যেন একটা পরের বাড়ী। স্বার্থ ভিন্ন কেউ কথা কয় না ,ফিরেও চায় না- জগতে আপনার বলতে কেউ নেই। স্বামী
ব্রহ্মানন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের মানসপুত্র, সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী, সর্বপূজ্য,সর্বমান্য মহারাজ, কি আকুল আগ্রহে,কি অকৃত্রিম স্নেহে, কি অপ্রত্যাশিত যত্নে আমাকে আপনার করিয়া লইলেন।”
শান্তির শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে অসহায় তারাসুন্দরী মঠে যাবার মতো মানসিক অবস্থাটুকু হারিয়ে ফেললেন

     

                          (২৩শ পর্ব)
শান্তির শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে অসহায় তারাসুন্দরী
মঠে যাবার মতো মানসিকতা অবস্থাটুকুও হারিয়ে ফেললেন। স্বামী শিবানন্দ লোক পাঠিয়ে তারাসুন্দরীকে ডেকে আনলেন।
– কি গো তারা মা , আর আস না কেন?
–  আর কার কাছে আসব মহারাজ? রাজা –  মহারাজই তো নেই।
– সে কি গো নেই কি? ঠাকুর আছেন আমরা আছি।
আর সর্বোপরি আছে শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শ। যে দীপ
তিনি জ্বেলে দিয়ে গেছেন – সে যে অনির্বাণ! সেই দীপে আলোকিত করো নিজেকে – নিজের শিল্প সুষমায় বাংলার মানুষকে।
সেই অনির্বাণ দীপের উদ্ভাসিত আলোকে বিভাসিত হয়ে তাঁর শিল্প সুষমায় সমকালীন বঙ্গসমাজকে তিনি অভিভূত করে রাখলেন। মিনার্ভা থিয়েটারের এক সভায় শ্রীযুক্ত বিপিনচন্দ্র পাল মহাশয় বলেছিলেন: “ইউরোপ ও আমেরিকার কোন রঙ্গমঞ্চে তারাসুন্দরীর রিজিয়ার ভূমিকায় অভিনয়ের মতো অভিনয় তিনি দেখেন নাই।” কারও কারও মতে তারাসুন্দরী পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্টা
অভিনেত্রীদের অন্যতমা। বিনোদিনীর মতো তারাসুন্দরীও সুলেখিকা ছিলেন। তাঁর রচনার মধ্যে
আত্মানুসন্ধান ও আত্মানুশোচনার একটি অকৃত্রিম
সুর সুস্পষ্ট হয়ে আছে। তাঁর সমগ্র জীবনের মধ্যে ত্যাগ ও বৈরাগ্যের রূপটি ফুটে ওঠে তা সমকালীন সকল অভিনেত্রীদের থেকে তাঁকে এক স্বতন্ত্র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
“সৌরভ” পত্রিকায় প্রকাশিত তারাসুন্দরীর দুটি কবিতার কিছু প্রাসঙ্গিক অংশের দিকে দৃম্টিপাত করলে তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টির একটি সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর একটি কবিতা “প্রবাহের রূপান্তর” -এ তিনি লিখেছেন-
শ্মশান জীবন মম নন্দনকানন সম
পাপস্মৃতি দূরে গেছে ফুটেছে নয়ন।
জীবনের গুরুভার,কাতর করে না আর
কে আমার ঘুচাইল ভ্রম আচ্ছাদন?
ক্ষুদ্রমতি নারীপ্রাণ, অর্থ আশা অভিমান
কালের কুটিল স্রোতে, হয়ে দিশাহারা।
অন্ধকার আলিঙ্গন, করিয়াছি আজীবন
প্রলোভনে সঁপি মন হইয়াছি সারা।
ভবিষ্যৎ বিভীষিকা, প্রেতময়ী মরীচকা
প্রতিকৃতি যদি তার,মিলেছে আমার।
যৌবনে প্রবৃত্তি যত,সৌরভে করবে রত
পরিমল পবিত্রতা কর অনুসার।
অথবা তাঁর “কুসুম ও ভ্রমর” কবিতায় উদ্ভিন্ন যৌবনের হাহাকার তিনি ব্যক্ত করেছেন –
নারীর যৌবন সম গরব তোমার।
যতদিন মধু রবে, আদরের ধন হবে ,
অবহেলে বিলাইলে, মান আপনার।
না বুঝিলে ছলনা এ কুটিল ধরার।
সুবাস ধরছে বুকে,কি হেতু ছড়াও?
গুনের গরিমা নাই, অযতনে বুঝি তাই
সাধের সৌরভ হায়! অবাধে লুটাও।
বিকৃতি প্রকৃতি লয়ে কিবা সুখ পাও?
বিচিত্র চরিত্রে মুগ্ধ, অন্তর আমার!
খেলিলে পবন সনে, সুমধুর আবাহনে,
পরাগ ছড়ায়ে মোরে ডেক’ নাকো আর!
অনুমাত্র পড়ে আছি – ধরে এ সংসার!
অন্ধকার জীবনের ভোগ লোলুপতা, নির্যাতিত, নারী সমাজের যন্ত্রণা,নিশিথের বিকৃত যাত্রীদের নিঃশব্দ পদচারণা তারাসুন্দরীকে একদিন উদাস করে তুলেছিল। তাঁর আত্মানুশোচনা তীব্রতর হয়ে তাঁকে ত্যাগের পথে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাই সমাজ থেকে দূরে সংসারে অনুমাত্র পড়ে থাকার মধ্যে জীবনের সার্থকতা খুঁজেছিলেন তারা।

    
                          (২৪শ পর্ব)
স্বামী ব্রহ্মানন্দের তিরোভাবের পর স্বামী শিবানন্দের (মহাপুরুষ মহারাজের) নির্দেশে তারাসুন্দরী ভুবনেশ্বরে ‘রাখাল কুঞ্জে’ স্বামী ব্রহ্মানন্দের নামানুসারে স্মৃতি মন্দির নির্মাণ শুরু
করেন। স্বামী ব্রহ্মানন্দ তাঁর জীবদ্দশায় এই ভূমিতে দাঁড়িয়ে ধ্যানস্থ অবস্থায় বলেছিলেন “সাধন ভজনের উপযুক্ত স্থান – গোমুখী ভূমি,ঈশানে ঈশান
( ভুবনেশ্বরের মন্দির) । তারাসুন্দরীর সাধন পদ্ধতি ছিল সত্যই অভিনব। কখনো ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে গেছে তিনি ধ্যানে ডুবে থেকেছেন। একবার পাশের স্কুলবাড়ীতে আগুন লেগেছিল, ওঁর গোয়ালঘর বাঁচাবার জন্য লোক জড় হয়েছে। হৈ হল্লা চিৎকারে মুখরিত চারিপাশ, তবুও তাঁর ধ্যান ভঙ্গ হয়নি তিনি
ধ্যানে ডুবে ছিলেন। আবার কখনো তাঁর ুপাসনা পদ্ধতির বৈচিত্র্য দেখে আনাতোল ফ্রাঁসের সেই বিখ্যাত গল্প. ” OUR LADY’S JUGGLER”- এর কথা মনে পড়ে যায়। মনে হয় যেন গল্পের সেই কাল্পনিক ভ্রাম্যমান পথের-যাদুকর সত্য সত্যই একদিন তারাসুন্দরীর শরীর ধারণ করে অবতীর্ণ হয়েছিলেন কলকাতার এক পতিতাপল্লীর অন্ধকার
গলিতে। কোথায় মিল – আনাতোল ফ্রাঁসোর কাল্পনিক যাদুকরের গল্পটিই বা কী? শোনা যাক সেই গল্প।
আকাশ ছোঁয়া চার্চের সামনে সবুজ ঘাসে ঢাকা একটি সুন্দর পার্ক। ফ্রাঁসোর পথের-যাদুকর পথে পথে শিশুদের যাদুর খেলা দেখিয়ে পার্কের বেঞ্চিতে বসে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে প্রতিদিন বিশ্রাম নেয়। অপলক নেত্রে চেয়ে থাকে ঐ নীরব, শান্ত পবিত্র চার্চটির দিকে। তার জামা কাপড় ময়লা তাই সে চার্চে প্রার্থনা সভায় ঢুকতে পারে না। মনে খুব ইচ্ছা এদিন চার্চে প্রবেশ করে দেখবে মা মেরীর কোলে তার শিশু প্রভুকে। প্রিস্টরাই বা কেমন – কোন ধারণাই নেই তার। একদিন কোথাও কোন মানুষের উপস্থিতি না দেখে সে চার্চে প্রবেশ করলো। দেখল প্রিস্টরা মা মেরীর উপাসনা করছেন। খোঁজ নিয়ে জানলেন সব প্রিস্টরাই খুব গুণী। কেউ ধর্ম পুস্তক লেখেন, কেউ সেই বইয়ের অনুলিপি রাখেন,আবার কেউ সেইবইয়ের পাতায় ছবি আঁকেন; আবার কেউ মেরীর সম্বন্ধে স্তোত্র রচনা করেন, কেউ আবার মা মেরী ও তাঁর প্রভুর গান গেয়ে থাকেন। এঁদের সেই সুন্দর জীবনযাত্রা দেখে যাদুকরের নিজের সম্বন্ধে ধিক্কার এলো। আমি বই লিখতে পারি না, ছবি আঁকতে পারি না, স্তোত্র রচনা করতে পারি না-কিছুই জানিনা আমি।

রামকৃষ্ণ সারদা আশ্রম (আঁটপুর) থেকে প্রকাশিত ২০১০-২০১১ বার্ষিক ‘হোমাগ্নি’ পত্রিকায় আমার অতিপ্রিয় ও আপনার জন শ্রী প্রদীপ রায়চৌধুরী মহাশয়ের কলম থেকে) II Ramakrishna sarada ashram Antpur

রামকৃষ্ণ সারদা আশ্রম (আঁটপুর)

রামকৃষ্ণ সারদা আশ্রম (আঁটপুর)

(রামকৃষ্ণ সারদা আশ্রম (আঁটপুর) থেকে প্রকাশিত ২০১০-২০১১ বার্ষিক ‘হোমাগ্নি’ পত্রিকায় আমার অতিপ্রিয় ও আপনার জন শ্রী প্রদীপ রায়চৌধুরী  মহাশয়ের কলম থেকে)

।।শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কৃপাপ্রবাহে স্নাত ‘কলঙ্কিনী ত্রয়ী।।

                          (১ম পর্ব)

সৌন্দর্য নয়, আনন্দই হচ্ছে শিল্পের শেষ ফলশ্রুতি।
দুঃখের মতো অননভিপ্রেত আর কি আছে? ব্যর্থতার মতো শূন্যতাবোধ আর কি হতে পারে? কে-ই বা জীবনে দুঃখ, ব্যর্থতা,পরাভব চায়? কিন্তু শিল্পের জগতে আমরা তাই চাই। তাই পরম শোকাবহ কাব্য অথবা ট্রাজিক নাটক আমাদের চেতনাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। যা আমাদের সমগ্র সত্তাকে বিস্ময়রসে মন্থন করে, চেতনাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে এবং মনকে তামসিক জড়তা থেকে মুক্ত করে সাত্ত্বিক রসভোগে প্রস্তুত করে। তাই শোকাবহতাই নান্দনিক সৃষ্টির মূল উপাদান।
“মা আমাকে শুকনো সন্ন্যাসী করিসনি, আমায় রসে বসে রাখিস।” এই প্রার্থনাই করেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর ইষ্টদেবী, মা ভবতারণীর কাছে।শুষ্ক জ্ঞানচর্চা নয়, নির্বিকল্প ধ্যানসমাধিও নয়, তিনি চেয়েছেন রসের বশীভূত হতে। রস অর্থাৎ শিল্পসৃষ্টি থেকে যে সাত্ত্বিক আনন্দের জন্ম হয়, শ্রীঠাকুর তাই তাঁর ইষ্টদেবীর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। মানুষের প্রতি আকর্ষণই তাঁকে ত্যাগী বৈরাগীতে পরিণত করতে পারেনি, বিশ্বের প্রতি অসীম ভালবাসাই শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনায় এক অনন্য মানব বোধ সঞ্চারিত করেছিল। জগত সৃষ্টিকে আমরা ঈশ্বরের লীলা বলি। কিন্তু যে প্রশ্ন মনের মধ্যে নড়েচড়ে ওঠে তাহলো ঈশ্বরের তো কোন অভাব বোধ নেই, তবে কেন তিনি বললেন, আমি বহু হব! কারণ বোধ হয় দুই না হলে খেলা জমে না,ভক্তেরা যাকে বলে লীলা। সৃষ্টিতত্ত্বের মূলে আছে একটি আনন্দবোধ। তেমন সৃষ্টি – সত্তার মূলেও আছে এমনই এক আনন্দসত্তা অর্থাৎ লীলা। শ্রীরামকৃষ্ণের সমস্ত জীবন ও সাধনা এমনই এক আনন্দময় বা নান্দনিক সত্তার দ্বারা বিধৃত।
এই নান্দনিক সত্তার তাগিদেই শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্রনাথের গান শুনে সমাধিস্থ হতেন, বিনোদিনীর চৈতন্য চরিত্রের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হতেন, কীর্তন পাঁচালীর দেহতত্ত্বমূলক ভক্তির গানের সঙ্গে বিভোর হয়ে নাচতেন, কাঠকয়লা দিয়ে উত্তরের বারান্দার দেওয়ালে ছবি আঁকতেন, গঙ্গার মাটি দিয়ে শিব দূর্গার মূর্তি গড়তেন মধুর কন্ঠে গান গেয়ে শ্রোতাকে পারমার্থিকভাবে আত্মহারা করে দিতেন, কী নারী, কী পুরুষ যে কোন ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করতে পারতেন।
 চিরন্তন সেই নান্দনিক সত্তার অন্বেষণে একদিন দেহসুখে আবদ্ধ পঙ্কিল জীবন ত্যাগ করে অচেনা অজানা এক পথের পথিক হয়ে হেঁটে ছিলেন তিনটি নারী। পথের শর্ত মেনে ছেড়েছিলেন দেহের অনুপম সৌন্দর্যের গর্ব, পান্না হিরে চুনি খচিত জড়োয়ার প্রলোভন, লাখ টাকার ঝাড়বাতিগুলি থেকে বিচ্ছুরিত আলোর রোশনাই আর মদিরা মেদুর প্রহরে কলকাতার বাবুদের ছোঁড়া নজরানার হাতছানি। উথাল পাথাল করা জীবনের স্মৃতিগুলি কাকবিষ্টার মতো পরিত্যাগ করে যন্ত্রণা-অপমান, ললাঞ্ছনা-ঘৃণা আর সামাজিক বিষোদ্গার উপেক্ষা করে আলোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল তিনটি দুঃসাহসী পথযাত্রী।অবিরাম পথ চলে একদিন পৌঁছে গিয়েছিলেন এক আনন্দময় অচিন দেশে। তাঁদের জন্যই বোধহয় অপেক্ষারত ছিলেন সেই নান্দনিক সত্তা। ভুবনমোহিনী হাসি ছড়িয়ে প্রসারিত দুটি হাত বাড়িয়ে তাঁদের গ্রহন করেছিলেন সেই আনন্দময় লোকে।
কলঙ্কিনী ত্রয়ীর দুঃসাহসিক পদযাত্রা কাহিনী লিখবো বলেই এই রচনার অবতারণা। কারা এই ত্রয়ী – বিনোদিনী, তারাসুন্দরী, আর মনিমালা। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ পাদে পতিতা শ্রেনী থেকে সংগৃহীত বাংলা থিয়েটারের তিন অভিনেত্রী-শুচিবাগীশ সমাজপতিদের চোখে সামাজিক বিষবৃক্ষের বীজ।
 সেকালের থিয়েটারের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সামাজিক মর্যাদার পরিমাপ করতে গিয়ে ফ্রান্সিস লেগেটকে লেখা স্বামী বিবেকানন্দের একটি উক্তির কথাই বারবার মনে পড়ে। স্বামীজী লিখেছিলেন যে,” কলকাতার যে ফুটপাথে থিয়েটার, সেই ফুটপাথ দিয়ে চলতাম না পর্যন্ত।” তখন ভদ্রসমাজের চোখে থিয়েটার মানে নরক। শিক্ষিত ভদ্রসমাজ থিয়েটারের সঙ্গে শুধু সম্পর্ক ছেদই নয়, থিয়েটারের নাম পর্যন্ত ভদ্রসমাজে অচল হয়ে দাঁড়াল-আর অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও সমাজে অপাঙক্তেয় বলে ঘৃণিত হয়ে উঠলেন।
কিন্তু কেন এই বিদ্বেষ! কোন অপরাধে তদানিন্তন  ভদ্রসমাজ থিয়েটারকে আঁস্তকুড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন? শোনা যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্তই বেঙ্গল থিয়েটারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন সাধারণ রঙ্গমঞ্চে নারীর ভূমিকায় অভিনেত্রীর ব্যবস্থা করতে কারণ তার আগে নারীর ভূমিকায় পুরুষরাই অভিনয় করতেন। ১৮৭৩সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর দুমাস পর ১৬ই আগষ্ট ১৮৭৩ তাঁর লেখা নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’ অভিনীত হলো পতিতাশ্রনী থেকে সংগৃহীত দুই অভিনেত্রীকে নিয়ে। এই প্রথম দুটি নারী চরিত্রে আত্মপ্রকাশ করলেন দুই নারী। সারা সমাজ উদ্বেল হয়ে উঠল।
১৮৭৪ খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বরে “সাপ্তাহিক সংবাদ” স্থম্ভে ‘সুলভ সমাচার’ লিখলো,”যাত্রার পরিবর্তে নাটক অভিনীত হতে দেখিয়া আমরা মনে করয়াছিলাম, এতদিনের পর বিশুদ্ধ আমোদ লাভ করিবার ব্যবস্থা হইল। কিন্তু সে আশায় ছাই পড়িল। বেশ্যাদ্বারা অভিনীত হইলে নাট্য-মন্দির আর বিশুদ্ধ আমোদের স্থল রহিল না। যে কারণে খেমটার নাচ দেখা মন্দ কাজ সেই কারণেই বেশ্যার অভিনয় দেখা অত্যন্ত দোষের।
বেশ্যার অভিনয়ে দুটি দোষ। যে সকল পুরুষ বেশ্যার সাথে অভিনয় করেন তাঁদের চরিত্র ভাল রাখা কঠিন। দ্বিতীয়ত যাঁরা বেশ্যার অভিনয় দেখেন তাঁদেরও মন কলঙ্কিত হইবার সম্ভাবনা অধিক। সুতরাং বেশ্যার অভিনয় অবাধে প্রচলিত হইলে ভারতের আরো একটি সর্বনাশের দ্বার খোলা হইবে।…..শুনিলাম কতকগুলি সুশিক্ষিত লোক নাকি বেশ্যার অভিনয়ে উৎসাহ দিয়া থাকেন।যে সুশিক্ষার ফল বেশ্যার আমোদ, সে সুশিক্ষার মুখে আগুন। ভারতের অস্থিচর্মসার এ অবস্থায় নির্দয়রূপে ভারতমাতার মর্মে আর আঘাত করিও না, যথেষ্ট হইয়াছে। ভাই সকল, ক্ষান্ত হও,তোমাদের পায়ে পড়ি।দেশ ডোবে, আর কু-নীতি বিস্তার করিও না।”
বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও সরে গেলেন সাধারণ থিয়েটারের সংশ্রব থেকে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, যিনি নারীর কল্যান কর্মে সারাজীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনিও থিয়েটারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন এই অপরাধের জন্য। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শিল্প ও সংস্কৃতির পীঠস্থান জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারও সাদারণ রঙ্গালয়ের স্পর্শ এড়িয়ে গেলেন। কথা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ একবার প্রবোধ গুহকে বলেছিলেন, “তোমাদের অসুবিধা ওই মেয়েদের নিয়ে।” বাংলা থিয়েটারের সামাজিক মর্যাদা যে শুধু নটীকুলের জন্য ক্ষুন্ন হয়েছিল তাই নয়, নটীদের সংস্পর্শে থাকার দরুণ, বাংলার দু-জন শ্রেষ্ঠ মণীষী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথ থিয়েটারের সঙ্গে তাঁদের সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। অথচ, নটীরা না এলে বাংলা থিয়েটার মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারত না।
এই পটভূমিকায় ২১শে সেপ্টেম্বর, রবিবার, ১৮৮৪ সন্ধ্যায় শ্রীরামকৃষ্ণ স্টার থিয়েটারে এলেন গিরীশ ঘোষের চৈতন্যলীলা নাটক দেখতে। কিন্তু তাঁকেও আসতে হল কিছু কিছু ভক্তের প্রবল আপত্তি অতিক্রম করে। রবিবার সকালে তাঁর ঘরে ভক্তদের মধ্যে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হলো – বিকালে ঠাকুর নাকি যাবেন নরকের থিয়েটারে। কথা প্রসঙ্গে কেউ কেউ ঠাকুরকে বললেন, “ওখানে যাবেন না, ওখানে বেশ্যারা অভিনয় করে। চৈতন্যদেব, নিতাই এসব চরিত্রে অভিনয় করে তারা।”
শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর ভূবনভোলানো হাসি ছড়িয়ে বললেন : ” আমি তাদের মা আনন্দময়ী দেখব। তারা চৈতন্যদেব সেজেছে, তা হলোই বা। শোলার আতা দেখলে সত্যকারের আতার উদ্দীপন হয়।”
এক মহাবিপ্লবের ক্ষেত্র বোধ হয় প্রস্তুত হয়েই ছিল, শুধু অপেক্ষারত ছিল সেই মহাসংগ্রামী মহাপুরুষের মুখ নিঃসৃত বজ্রনির্ঘোষের মহালগ্নটির জন্য। তিনি শুধু অভিনয় দেখলেন না, বিষবৃক্ষের বীজ যে অভিনেত্রী সম্প্রদায় তাঁদেরই প্রতিনিধি চৈতন্যের ভূমিকা-অভিনেত্রী বিনোদিনীর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে  বললেন, ” এ মায়ের আর এক রূপ। ” ভগবানের মুখ-নিঃসৃত এই নির্ঘোষ অভিনেতা অভিনেত্রীদের আত্মোপলব্ধিতে শুধু সহায়তাই করেনি, তাঁদের মনে যে আত্মমর্যাদা জাগিয়ে তুলেছিল তা ইতিহাসের পাতায় কখনো চোখে পড়েনি।
১৪ই ডিসেম্বর, ১৮৮৪ স্টার থিয়েটারে “প্রহ্লাদচরিত্র”
নাটক দেখার পর গিরিশের আদেশে সমস্ত নটীরা ঠাকুরকে ভূমিষ্ট হয়ে প্রণাম করলেন এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ ঠাকুরের পাদস্পর্শ করে নমস্কার করলেন, ঠাকুর তখন কেবলই বলে চললেন, “মা থাক্ মা থাক্, থাক্ মা থাক্।” এ এক অপূর্ব লীলা নাটক – বাংলার ঘৃণিত, অবহেলিত নটনটীদের সঙ্গে গ্রহন করলেন বাংলার রঙ্গমঞ্চকে। তাঁর নান্দনিক সত্তার এক অনন্য প্রকাশ সেদিন সাধারণ মানুষের সামনে যে আদর্শটিকে তুলে ধরলো তা হলো বৃত্তি বা জীবিকা বাদ দিয়ে অভিনেত্রীদের শিল্পীরূপে প্রত্যক্ষ করা।
নাট্টকার অভিনেতা অমৃতলাল বসু সেদিনের স্মৃতি
রোমন্থন করে বলেছিলেন, ” সেই প্রথমে  যখন দীনা অভিনেত্রী রঙ্গমঞ্চে শ্রীচৈতন্যের বেশে নদীয়ায় ঈশ্বরাবতারের লীলা অভিনয় করিয়াছে, তখন আমাদিগের হীন রঙ্গালয়কে বৈকুন্ঠে উন্নত করিয়া দক্ষিনেশ্বরে প্রকটিত ঈশ্বরের অন্য অবতার শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব সেই অভিনয় বসিয়া দেখিয়াছেন, আমরা ধন্য হইয়াছি;দর্শক ধন্য হইয়াছেন ;বসুমতী ধন্য হইয়াছে।”
সেই দীনা অভিনেত্রীই বঙ্গরঙ্গমঞ্চের বিনোদিনী দাসী। বিনোদিনীই সর্বপ্রথম শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদ পেয়েছিলেন-এমনকি গিরীশচন্দ্রেরও আগে। চৈতন্যলীলা ছাড়া আরো পাঁচটি নাটকে বিনোদিনীর অভিনয় দেখেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ দেব।
‘প্রহ্লাদ চরিত্রে’ প্রহ্লাদ, ‘বৃষকেতু’তে পদ্মাবতী, ‘নিমাই সন্ন্যাসে’ নিমাই, ‘দক্ষযজ্ঞে’ সতী রূপে এবং প্রহসনমূলক নাটক ‘বিবাহবিভ্রাটে’ বিলাসিনী কারফরমার ভূমিকায় বিনোদিনীর অভিনয় দেখে ঠাকুর মুগ্ধ হয়েছিলেন।
অক্ষয়কুমার সেন তাঁর শ্রীরামকৃষ্ণ-পুঁথিতে একদিনের একটি বিরল বিরল ঘটনার বর্ণনায় লিখেছেন –
একদিন মঞ্চমধ্যে প্রভুর গমন।
নিরখিয়া শ্রীগিরিশ পুলকিত মন।।
কি লম্পট, কি কপট, হীন হেয় জন।
বেশ্যা বারাঙ্গনা জাতি অভিনেত্রীগণ।।
আবাহন সকলেই বারে বারে করে।
পদরেণু ঠাকুরের শিরে ধরিবারে।।
অভিনেতা পুরুষেরা আসিয়া তথায়।
অভয় চরণরেণু ধরিল মাথায়।।
গিরিশের আশ্বাস বচনে পেয়ে বল।
উপনীত অবশেষে বারাঙ্গনা দল।।
গণনায় ষোলজনা যুবতী প্রখরা।
বসনে ভূষণে সজ্জা মুণিমনোহরা।।
দেখিয়া শ্রীপ্রভুদেব ভাবে ভরা চিত।
ধরিলা মোহন কন্ঠে শ্যামাগুণ গীত।।
মধুর প্রভুর স্বর পিকপাখী জিনি।
শ্রবনে মোহিত চিত যতেক রমণী।।
তারমধ্যে একজনা বিনোদিনী নাম।
মূর্ছিতা হইয়া পড়ে ধরায় অজ্ঞান।।
প্রসারিত ঠাকুরের শ্রীচরণ তলে।
দিব্যভাব সমুদিত অন্তর অঞ্চলে।।
গিরিশের কোন নাটকের নেপথ্যে এই বিরল ঘটনাটি ঘটেছিল তা বিনোদিনীর স্বরচিত ” আমার কথা ” নামক গ্রন্থেও পাওয়া যায়নি। পাঠক কেবল স্তম্ভিত হয়ে ভাবেন, একজন নারী উপলব্ধি ও অনুভূতির কোন পর্যায়ে পৌঁছালে শ্যামাসঙ্গীতের মূল ভাব হৃদয়ে ধারণ করে মূর্ছিতা হয়ে পড়েন!
শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রণতি জানিয়ে আশীর্বাদ পাবার পর বিনোদিনী একদিন উপলব্ধি করেছিলেন মঞ্চের কাজ যা তিনি করেন, বস্তুতঃ তা পূজা। সাধিকা বিনোদিনীর এই বিচিত্র পূজার প্রেরণাদাতা ছিলেন দু-জন – গিরিশচন্দ্র ও শ্রীরামকৃষ্ণ।একজন ছিলেন তাঁর অভিনয় শিক্ষক আর অন্যজন প্রবহমান যুগের আধ্যাত্মিক দিশারী- যিনি বিনোদিনীর নিষ্ঠা ও আত্মহারা অভিনয়শৈলীর অনুমোদন ও স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
 তখন স্ত্রীলোক দর্শকদিগের মধ্যে কেহ কেহ এমন উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিতেন যে আমার বুকের ভিতরে গুর্ গুর করিত। আবার আমার শচীমাতার হৃদয়ভেদী মর্ম-নিদারুণ শোকধ্বনি নিজের মনের উত্তেজনা, দর্শকবৃন্দের ব্যাগ্রতা আমায় এত অধীর করিত যে আমার দুই চক্ষের জলে নিজে আকুল হইয়া উঠিতাম। শেষে সন্ন্যাসী হইয়া সংকীর্তনকালে, “হরি মন মজায়ে লুকালে কোথায়, আমি ভবে একা দাও হে দেখা প্রাণসখা রাখ পায়।” গানটি গাহিবার সময়ের মনের ভাব আমি লিখিয়া জানাইতে পারিব না। আমার সত্যই মনে হইত যে আমি তো ভবে একা, কেহ তো আমার নেই। আমার প্রাণ যেন হরি পাদপদ্মে নিজের আশ্রয়স্থান খুঁজিত । উন্মত্তভাবে
সংকীর্তনে মূর্ছিতা হইয়া পড়িতাম। ….এই চৈতন্যলীলার অভিনয় নহে, আমার জীবনের মধ্যে “চৈতন্যলীলা ” অভিনয়কালে আমার সকল অপেক্ষা শ্লাঘার বিষয় এই যে আমি পতিত পাবন পরমহংসদেব রামকৃষ্ণ মহাশয়ের দয়া পাইয়া ছিলাম। কেননা, সেই পরম পূজনীয় দেবতা ‘চৈতন্যলীলা’ অভিনয় দর্শন করিয়া আমায় তাঁর শ্রীপাদপদ্মে আশ্রয় দিয়াছিলেন। অভিনয় কার্য শেষ হইলে আমি শ্রীচরণ দর্শনের জন্য যখন অফিস ঘরে তাঁর চরণ সমীপে উপস্থিত হইতাম, তিনি প্রসন্নবদনে উঠিয়া নাচিতে নাচিতে বলিতেন ” হরি গুরু গুরু হরি! বলো মা হরি গুরু গুরু হরি! ” তাহার পর উভয় হস্ত আমার মস্তকে রাখিয়া আমার পাপদেহকে পবিত্র করিয়া আশীর্বাদ করিয়া বলিলেন “মা, তোমার চৈতন্য হউক। “
গিরিশ শুধু বিনোদিনীর অভিনয় শিক্ষকই নন, আধ্যাত্মিক দিক দিয়েও তিনি তাঁকে পুষ্ট করিতে সচেষ্ট ছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সকাশে এসে গিরিশ তখন সম্পূর্ন আমূল বদলে যাওয়া মানুষ। তিনি মুখে রামকৃষ্ণ বাণী ও নিজ উপলব্ধ সারবানীই উচ্চারণ করেছেন বিনোদিনীর সামনে। বিনোদিনীর শ্রীরামকৃষ্ণসকাশে পৌঁছবার মার্গটিও নির্মান করে দিয়েছিলেন ওই গিরিশচন্দ্রই। শ্রীরামকৃষ্ণ – বিনোদিনীর মধ্যে গিরিশই ছিলেন সেতুবন্ধ।
বাংলা! থিয়েটারের সুনাম যতই তদানীন্তন ভদ্রসমাজে প্রচারিত হতে লাগলো, গিরিশ ততই যত্ন সহকারে তাঁর প্রিয়তমা ছাত্রী বিনোদিনীকে নিজ তত্ত্বাবধানে গড়ে তুলতে লাগলেন।চৈতন্যলীলা নাটকের রিহার্সাল শুরু হলে অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক শ্রী শিশির কুমার ঘোষ মাঝে মাঝে এসে শ্রীচৈতন্যের ভূমিকাভিনেত্রী বিনোদিনীকে উপদেশ দিতে লাগলেন। পতিতার দ্বারা অভিনীত সেই দেবচরিত্র যাতে যথাসম্ভব সুরুচি সম্পন্ন অভিনয়ের স্তরে উন্নীত হতে পারে তাই তিনি বারবার বলতেন ঃ”তুমি সতত গৌর পাদপদ্ম অন্তরে চিন্তা করবে। তিনি অধমতারণ পতিতপাবন, পতিতের উপর তাঁর অসীম দয়া।” তাঁর কথামত বিনোদিনীও সতত ভয়ে ভয়ে মহাপ্রভুর পাদপদ্মের চিন্তায় বিভোর হতেন। ১৮৮৪খ্রীস্টাব্দের ১লা আগস্ট মনের মধ্যে আকুল উদ্বেগ নিয়ে বিনোদিনী নিদ্রাহীন রাতের প্রহরগুলো গুনে চললেন। প্রহর হলো ; সুর্যের রাঙা আলোয় পূবের আকাশ উদ্ভাসিত। বিনোদিনী জানালার গরাদের মধ্য দিয়ে পূবের আকাশের দিকে চেয়ে প্রভাতের সূর্যকে প্রণাম জানালেন। তারপর তাঁর স্মৃতিকথা থেকেই বলি –
“প্রাতে উঠিয়া গঙ্গাস্নানে যাইলাম; পরে ১০৮ বার  দুর্গানাম লিখিয়া তাঁর চরণে ভিক্ষা করিলাম যে, মহাপ্রভু যেন এই সঙ্কটে আমায় কূল দেন।আমি যেন তাঁর কৃপা লাভ করিতে পারি । কিন্তু সারাদিন ভাবনায় অস্থির হইয়া রইলাম।……..মনে মনে বুঝিতে পারিলাম যে ভগবান আমায় কৃপা করিতেছেন। কেননা সেই বাল্যলীলার সময় ” রাধা বই আর নাইক আমার ; রাধা বলে বাজাই বাঁশী ” বলিয়া গীত ধরিয়া যতই অগ্রসর হইতে লাগিলাম, ততই যেন একটা শক্তিময় আলোক আমার হৃদয়কে পূর্ণ করিয়া তুলিতে লাগিল। যখন মালিনীর নিকট হইতে মালা পরিয়া তাহাকে বলিতাম – ‘কি দেখ মালিনী?’ সেই সময় আমার চক্ষু বহির্দৃষ্টি হইতে অন্তরের মধ্যে প্রবেশ করিত। আমি তখন বাহিরের কিছুই দেখিতে পাইতাম না। আমি হৃদয়ের মধ্যে সেই অপরূপ গৌর পাদপদ্ম যেন দেখিতাম ;  আমার মনে হইত – ‘ঐ যে গৌরহরি, ঐ যে গৌরাঙ্গ ‘ উনিই তো বলিতেছেন, আমি সব মন দিয়া শুনিতেছি ও তাঁহারই কথা মুখ দিয়া প্রতিধ্বনিত করিতেছি। আমার দেহ রোমাঞ্চিত হইত, সমস্ত শরীর পুলকে পূর্ণ হইয়া যাইত, চারিদিক যেন ধোঁয়ায় আছন্ন হইয়া যাইত। …..আমাতে আমি জ্ঞানই থাকত না। সন্ন্যাস গ্রহন করিয়া মাতা শচীদেবীর নিকট হইতে বিদায় লইবার সময় বলিতাম –
কৃষ্ণ বলে কাঁদ মা জননী
কেঁদ না নিমাই বলে।
কৃষ্ণ বলে কাঁদিলে সকলই পাবে
কাঁদিলে নিমাই বলে, নিমাই হারাবে
কৃষ্ণ নাহি পাবে-
ভূমিকা উপযোগী পরিচ্ছদে নিজেকে সাজিয়ে তোলার বিশেষ কৌশল বিনোদিনী পুরো মাত্রায় রপ্ত করেছিলেন। তাঁর এই বিশেষ পারদর্শিতার সাক্ষী হয়ে আছে দুটি মজার ঘটনা।
একদিন ভক্তচূড়ামণি বলরাম বসু ‘ বুদ্ধদেব চরিত ‘ নাটক দেখতে গেছেন। বিনোদিনী গোপার ভূমিকায় অভিনয় করছেন। তিনি প্রথম অঙ্ক দেখার পর হঠাৎ সাজঘরে ঘরে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। বলরামবাবুর ব্যাকুলতা দেখে গিরিশও হতচকিত। কনসার্টের সময় তিনি বলরামবাবুকে নিয়ে গ্রীনরুমে হাজির হলেন। বলরামবাবু এদিক  ওদিক দেখে কিছুক্ষনের মধ্যেই বাইরে চলে এলেন।
গিরিশ বলরামবাবুকে জিজ্ঞাসা করলেন, ” সাজঘরে গেলেনই বা কেন, কি দেখলেন আবার তাড়াতাড়ি চলেই বা এলেন কেন!” বলরামবাবু মৃদু হেসে বললেন, ” মঞ্চে গোপাকে দেখে ভাবলুম এই
অনবদ্য সুন্দরী নারীকে থিয়েটারওয়ালারা কোথা থেকে পেল? তাই তাকে দেখার জন্য মন অস্থির হয়েছিল। সাজঘরে গিয়ে দেখলাম যতটা সুন্দরী মঞ্চে লাগছিল ততটা সুন্দরী সে নয়। তবে বেশ সুন্দরী। ” তারপর একদিন অসজ্জিত অবস্থায় বিনোদিনীকে দেখে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে এই স্ত্রীলোকই সেদিন মঞ্চে গোপার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। বলরামবাবু বিনোদিনীর সাজসজ্জার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন।
সজ্জিত হতে শেখা অভিনয়ের একটা প্রধান অঙ্গ।
এ ব্যাপারে বিনোদিনী বিশেষ নিপুণা ছিলেন। বিনোদিনী ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায় সাজসজ্জায় নিজেকে এমন পরিবর্তন করতে পারতেন যে, তাঁকে অপর এক ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখেও, এই নতুন ভূমিকায় যে তিনিই এসেছেন তা দর্শক বুঝতে পারতেন না। বিনোদিনীর জীবনের একটি বিশেষ মুহূর্তে তাঁর পরিস্থিতি উপযোগী পরিচ্ছদে সুসজ্জিত হবার কৌশল একদিন সৃষ্টি করেছিল এক অনবদ্য ভক্ত – ভগবান লীলা – নাট্য। শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে বিনোদিনীর শেষ সাক্ষাতকার অত্যন্ত নাটকীয়। শ্রীরামকৃষ্ণ তখন দুরারোগ্য গলরোগে আক্রান্ত হয়ে ৫৫নং শ্যামপুকুর স্ট্রীটের বাড়ীতে অবস্থান করছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করবার এই তীব্র ব্যাকুলতা থেকে বিনোদিনীর মানসিক পরিবর্তনের যে ছবি কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে মানুষকে হতচকিত করেছিল, তা পরবর্তিকালে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো গিরিশ ঘোষকে  লেখা তাঁর একটি চিঠি থেকে। চিঠিতে বিনোদিনী লিখেছিলেন – ” সংসারের পান্থশালা হইতে বিদায় লইবার সময় নিকটবর্তি হইয়া আসিল। রুগ্ন, আশাশূণ্য দিনযামিনী একইভাবে যাইতেছে। আপনি আমাকে বারবার বলিয়াছেন যে, ঈশ্বর বিনাকারণে জীবের সৃষ্টি করেন না, সকলেই ঈশ্বরের কার্য করিতে সংসারে আসে,সকলেই তাঁহার কার্য করে , আবার কার্য শেষ হইলেই দেহ পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়। আপনার এই কথাগুলি কতবার আলোচনা করিয়াছি, কিন্তু আমার জীবন দিয়া তো কিছু বুঝিতে পারলাম না, যে আমার দ্বারা ঈশ্বরের কি কার্য হইয়াছে, আমি কি কার্য করিয়াছি এবং কি করিতেছি? আজীবন যাহা করিলাম সেই কি আমার কার্য? কার্যের কি অবসান হইল না? “
শ্যামপুকুরে শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করার আগ্রহ থেকে যেমন বিনোদিনীর মঞ্চ পরিত্যাগের পূর্ববর্তি মানসিক অবস্থার ছবিটি পরিষ্ফুট হয়ে উঠেছিল, গিরিশকে লেখা বিনোদিনীর চিঠি থেকে তেমনি তাঁর মঞ্চোত্তর জীবনের আগামবার্তা যেন ন ভেসে এলো। জীবনের গূঢ়-রহস্যকে জানার আগ্রহ , আত্মানুসন্ধানের এই প্রবৃত্তি কি শ্রীরামকৃষ্ণই তাঁর মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিলেন? “বারবার আলোচনার” কথা বিনোদিনী লিখেছেন এবং গিরিশই সেই সময় তাঁর কাছে শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবনার উপযুক্ত ব্যাখ্যাকার – তাই তাঁর কাছে বিনোদিনী এই গভীর প্রশ্নটি নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন।
গিরিশ তাঁর উত্তরে বলেছিলেন, ” তোমার জীবনে অনেক কার্য হইয়াছে, তুমি রঙ্গালয় হইতে শত শত ব্যক্তির হৃদয়ে আনন্দ প্রদান করিয়াছ। অভিনয়স্থলে তোমার অদ্ভূত শক্তির দ্বারা যেরূপ বহু নাটকের চরিত্র প্রস্ফুটিত করিয়াছ, তাহা সামান্য কার্য নহে। আমার ‘ চৈতন্যলীলা ‘য় চৈতন্য সাজিয়া বহুলোকের হৃদয়ে ভক্তির উচ্ছ্বাস তুলিয়াছ ও অনেক বৈষ্ণবের আশীর্বাদ লাভ করিয়াছ। সামান্য ভাগ্যে কেহ এরূপ কার্যের অধিকারী হয় না। যে সকল চরিত্র অভিনয় করিয়া তুমি প্রস্ফুটিত করিয়াছিলে, সে সকল চরিত্র গভীর ধ্যান ব্যতীত উপলব্ধি করা যায় না। যদিও তাহার ফল অদ্যাবধি দেখিতে পাও নাই, সে তোমার দোষে নয়-অবস্থায় পড়িয়া; কিন্তু তোমার অনুতাপের দ্বারা প্রকাশ পাইতেছে যে অচিরেই তুমি সেই ফলের অধিকারী হইবে ।”
চিকিৎসার সুবিধার জন্য দক্ষিনেশ্বর কালী মন্দির থেকে ঠাকুরকে শ্যামপুকুরবাটীতে নিয়ে আসা হয়।
তাঁর ত্যাগী পার্ষদেরা বহিরাগত ভক্তসাধারণের বিশেষকরে বিশেষ করে স্ত্রীলোকেদের যাতায়াত নিষেধ করে দিয়েছেন। দর্শনব্যাকুল রূপসজ্জানিপুণ অভিনেত্রী বিনোদিনী একদিন সন্ধ্যায় কালীপদ ঘোষের ( দানাকালীর ) হাত ধরে পুরুষের মতো “হ্যাট কোটে” সজ্জিত হয়ে শ্যামপুকুর বাটীতে এসে উপস্থিত হলেন। ঠাকুরের পাহারায় থাকা ত্যাগী পার্ষদ প্রভৃতির কাছে দানাকালী বিনোদিনীকে নিজের বন্ধু বলে পরিচয় দিলেন। বিনোদিনীর দিকে চেয়ে কারুর সন্দেহ পর্যন্ত হলো না যে ইনি মহিলা এবং ভারতীয়। ঠাকুরের ঘরেও তখন কেউ নেই। দানাকালী ঠাকুরের ঘরে প্রবেশ করে বললেন, ” ঠাকুুর আপনার শ্রীচরণ দর্শনের অভিপ্রায়েই বিনোদিনী বিদেশী ইউরোপীয় পুরুষের ছদ্মবেশে সবাইকে বিমূঢ় করে আপনার কাছে উপস্থিত হয়েছে। ”  রঙ্গপ্রিয় শ্রীরামকৃষ্ণ খিলখিল করে হাসতে লাগলেন। উপস্থিত সকল পার্ষদের চোখে ধূলো দিয়ে তাঁর কাছে এভাবে আসাতে তাঁর আনন্দের সীমা রইলো না। তিনি বিনোদিনীর সাহস, দক্ষতা, ও অপরিসীম শ্রদ্ধাভক্তি দেখে তারিফ করতে লাগলেন। প্রসন্ন বদনে বিনোদিনীর দিকে চেয়ে বললেন , ” আয় মা বোস।” বিনোদিনীকে কাছে বসিয়ে তাঁকে ঈশ্বরীয় কথায় উদ্বুদ্ধ করে বললেন,
” ঈশ্বরে বিশ্বাসবতী হয়ে,  তাঁর শরণাপন্ন হয়ে জীবনের বাকী দিনগুলি কাটিয়ে দিও মা। ভয়মুক্ত হয়ে থাক। ” বিনোদিনীও তাঁর শ্রীচরণে মাথা রেখে
আকূল অশ্রুবিসর্জনে নিজেকে সিক্ত করে তুললেন। ঠাকুরের অশেষ কৃপা মাথায় ধারণ করে
ধীর পদক্ষেপে কালীপদ ঘোষের সঙ্গে চলে গেলেন।
এই অভূতপূর্ব লীলাকাহিনী আজও বিমল আনন্দে মানুষকে আত্মহারা করে তোলে। ঠাকুরের ভাষায় একেই বোধহয় বলে ‘ ডাকাতে ভক্তি ‘ – যা কোন যুক্তি, তর্ক, বাধা-বিপত্তি কিছুই মানে না।
(শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে আশীর্বাদ করেছিলেন চৈতন্য-লাভের – চৈতন্যের আভাস তাঁর পরবর্তি চিন্তাধারার তরঙ্গমালায় বারবার প্রতিবিম্বিত হয়েছিল। শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগ ১৬ই আগষ্ট ১৮৮৬ এবং বিনোদিনীর মঞ্চ পরিত্যাগ ( বিনোদিনী শেষ অভিনয় করেন ২৫শে ডিসেম্বর ১৮৮৬) এক অদৃশ্য যোগসূত্রে কোথাও যেন বাঁধা পড়ে আছে। বিনোদিনীর মঞ্চোত্তর জীবনে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব যে কী গভীর রেখাপাত করেছিল তা অভিনেত্রী তারাসুন্দরীর কন্যা প্রভাতী খান্না তাঁর লেখনীতে বারবার রোমন্থন করেছেন। শ্রীমতী প্রভাতী খান্না বিনোদিনীর সাথে দীর্ঘদিন একসাথে বাস করেছেন।
তাঁর দৈনন্দিন জীবনের সকল দিকটাই তিনি জানতেন। তাই তাঁর ঘরোয়া জীবনের কথা, তাঁর
আধ্যাত্মিক জীবনের কথা বা তাঁর অভিনয়ে প্রীত শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদের কথা যেমনটি তিনি বিনোদিনীর মুখে শুনেছেন , তাই লিপীবদ্ধ করে গেছেন। প্রভাতী খান্না লিখেছেনঃ-  ” বিনোদিনী নিজবাড়ীর তিনতলায় ঠাকুরঘর করেন। সেখানে প্রতিষ্ঠিত করেন রাধাকৃষ্ণ মূর্তি,গোপাল ও শালগ্রাম শিলা। রাধাকৃষ্ণের পূজা করতে আসতেন পুরোহিত। সেই ঠাকুরঘর ছাড়াও তাঁর নিজস্ব একটি ঘর ছিল-বিনোদিনীর নিজস্ব পূজাগৃহ। সেখানে ছিল শুধু শ্রীরামকৃষ্ণের পট। এখানে পূজা করতেন তিনি নিজে। গীতাপাঠ করতেন, আহ্নিক করতেন -শ্রীরামকৃষ্ণের পট পূজা করতেন ফুল চন্দনাদি দিয়ে।”
দীর্ঘ ৭৮বছর জীবিত ছিলেন বিনোদিনী। এই সুদীর্ঘ জীবনে বহু আঘাত এসেছে তাঁর জীবনে । যে মঞ্চের জন্য তিনি আত্মোৎসর্গ করেছিলেন সেই মঞ্চ তাঁকে পরিত্যাগ করে আসতে হয়েছে। যে সহৃদয় পরুষ তাঁকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিলেন তাঁর মৃত্যু হয়েছে, একমাত্র কন্যাটিকেও মৃত্যু তাঁর কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। চারিদিকে অসীম শূণ্যতার মাঝে শান্তির আশ্রয় খুঁজেছেন তাঁর কাছেই, যাঁর কাছে পেয়েছিলেন শান্তির আশ্বাস।
হরিনাম হলে স্বয়ং শ্রীহরি তা শুনতে আসেন, শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং তার প্রমাণ প্রদর্শন করলেন। তাঁর পদধূলিলাভে কেউই বঞ্চিত হননি। সকলেই পতিত কিন্তু পতিতপাবন যে পতিতকে কৃপা করেন, এ কথা শুধু পুরাণের পাতায় বদ্ধ হয়ে রইলো না – সত্যের আকার ধারণ করে পতিতমন্ডলীর হৃদয়ে পাঁচ সিকে পাঁচ আনা বিশ্বাসে রূপান্তরিত হলো।
বিনোদিনী অতি ধন্যা , শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন – ” মা , তোর চৈতন্য হোক।” যাঁরা দুর্গম হিমালয়ের পর্বতকন্দরে যুগ যুগ ধরে কঠোর সাধনায় লিপ্ত হয়ে আছেন তাঁদের কাছেও এমন আশীর্বাদ স্বপ্নের অতীত। বিনোদিনীর সাধন – যথাজ্ঞান কায়মনোবাক্যে মহাপ্রভুর ধ্যানে নিযুক্ত থাকা। অষ্টপ্রহর গৌরাঙ্গমূর্তি ধ্যানের ফল বিনোদিনী লাভ করেছিলেন নিত্যানন্দের খোলে শ্রীচৈতন্যের পুনঃ আবির্ভাবে। অর্দ্ধ শতাব্দী পার হয়ে গেছে অনেক দিন তবু আধুনিক বিচারশীল মানুষের কাছে সাধিকা বিনোদিনী পারিপার্শ্বের নিরিখে উত্তরিত নারী। যতদিন শ্রীরামকৃষ্ণ নাম জগতে উচ্চারিত হবে, ততদিন বিনোদিনী উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের রূপ ধরে স্খলিত, পথভ্রষ্ট পথিকের যাত্রা পথের দিশারী হয়ে বিরাজ করবেন।
শেষ জীবনে দৈনিক সন্ধ্যায় আসতেন ‘রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠে’। শ্রীরামকৃষ্ণ পার্ষদ স্বামী অভেদানন্দের কাছে ধর্ম প্রসঙ্গ শুনতেন। কখনও কখনও শ্রীরামকৃষ্ণের মূর্তির সামনে বসে আকুল হয়ে কাঁদতেন অথবা ছুটে যেতেন বেলুড় মঠে যেখানে তাঁর আত্মারাম জীবন্ত জাগ্রত ও বিভাসিত হয়ে ভক্তের প্রতি তাঁর প্রেমদৃষ্টি নিক্ষেপ করে চলেছেন।
বিনোদিনীই তারাসুন্দরীকে স্টার থিয়েটারে নিয়ে যান।
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন,
” তারাসুন্দরীর আশ্চর্য প্রতিভা। ওর ওপরে একটা কবিতা রচনার ইচ্ছা আছে।”
কবি সত্যেন্দ্রনাথের সে ইচ্ছা পূর্ণ হলে বাঙলার নীতিবাগীশ সমাজপতিরা রঙ্গমঞ্চের এক পতিতা অভিনেত্রীর প্রতিভার যথার্থ স্বীকৃতি দেখে বিস্ময়ে হতবাক হতে পারতেন।
সেই তারাসুন্দরীকে একদিন বিনোদিনীই নিয়ে গেলেন বেলুড় মঠে। তারাসুন্দরী অপূর্ব ভঙ্গীমায় তাঁর সেই প্রথম দিনের অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেছেনঃ
“যখন মঠে গেলাম, তখন প্রায় দুপুর উত্তীর্ণ হইয়াছে
– মহারাজ (স্বামী ব্রহ্মানন্দ) সেবাঅন্তে বিশ্রাম করিতে যাইবেন-আমরা উভয়ে (বিনোদিনী ও তারাসুন্দরী) প্রণাম করিলাম। মহারাজ দেখিয়াই বলিলেন,” এই যে বিনোদ, এই যে তারা- এসো এসো,এত বেলা করে এলে–মঠের খাওয়া দাওয়া যে সব হয়ে গেছে – আগে একটু খবর দিতে হয় -তাইতো বসো বসো।” দেখলাম আমাদের জন্য বড়ই ব্যস্ত। তাঁহার আদেশে তখনই প্রসাদ আসিল। লুচি ভাজাইবার ব্যবস্থা হইল। আমরা ঠাকুর প্রণাম করিয়া মঠে প্রসাদ পাইলাম। মহারাজের তখন আর বিশ্রাম করা হইল না। একটি সাধুকে ডাকাইয়া বলিলেন- ” এদের সব মঠের কোথায় কি আছে দেখিয়ে দাও।” পরে পরিচয় হইলে জানিলাম-সাধুটির নাম স্বামী অমৃতানন্দ।
সাধু সন্ন্যাসীকে ছোটবেলা হইতেই ভক্তিশ্রদ্ধা করতাম কিন্তু তার সাথে সাথে ভয়টাও ছিল খুবট বেশী। অপবিত্রা-পতিতা কি জানি যদি কোন অপরাধ হয়, তাই আমি প্রথমে ভয়ে সঙ্কোচে মহারাজের চরণধূলি লইয়াছিলাম। কিন্তু মহারাজের (স্বামী ব্রহ্মানন্দজীর) কথায় আমাদের জন্য ব্যস্ততায় ,তাঁর যত্নে, সে ভয় সঙ্কোচ কোথায় উঠিয়া গেল। মহারাজ বলিলেন “আস না কেন?” আমি বলিলাম “ভয়ে মঠে আসতে পারি না।” অতি আগ্রহের সহিত মহারাজ বলিলেন , ” ভয়ে!ঠাকুরের কাছে আসবে তার আবার ভয় কী? আমরা সকলেই ঠাকুরের ছেলে-মেয়ে ভয় কি! যখন ইচ্ছা হবে এসো। মা,তিনি তো খোলটা দেখেন না ভেতরটা দেখেন। তাঁর কাছে আসতে তো কোন সঙ্কোচ নেই।”
স্বামী প্রেমানন্দ মহারাজ সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
তিনি আশ্বাস দিয়ে বললেন, ” ঠাকুরের কাছে আসতে কারুর তো কোন বাধা নেই।”
বৈকালে চা খাইয়া মঠ হইতে ফিরিলাম। আসিবার সময় মহারাজ বলিলেন ” মাঝে মাঝে এসো। আজ বড় কষ্ট হলো। একদিন ভালো করে প্রসাদ পেও।”
এই আমার প্রথম দর্শন – এই আমার প্রথম বন্ধন।”
এই সুদৃঢ় বন্ধনই তারাসুন্দরীকে বারবার বেলুড় মঠের অঙ্গনে এনে দাঁড় করিয়েছে। কলকাতায় সেবার ভীষণ গরম পড়েছে। প্রখর রৌদ্রের মধ্যে তারাসুন্দরী ছুটে চলেছেন আত্মারামের আকর্ষণে-ঘর্মাক্ত,পথশ্রান্ত।সোজা উঠে এসেছেন স্বামী ব্রহ্মানন্দের কাছে। মহারাজ নিজে হাত পাখা নিয়ে হাওয়া খেতে খেতে তারাসুন্দরীকেও হাওয়া করতে লাগলেন। ‘ তারা-মা তুমি বড্ড ঘামছো !’ তারাসুন্দরী কুন্ঠায় সঙ্কুচিত। তারাসুন্দরী অবাক হয়ে চিন্তার গভীরে প্রবেশ করলেন – একেই কি বলে জমাট বাঁধা প্রেম – প্রেমের শরীর! এ প্রেম তারাসুন্দরী কোনদিন অনুভব করেননি। আবেগ মথিত অন্তস্থল থেকে উপচে পড়া অশ্রুধারায় চোখদুটি ঝাপসা হয়ে গেছে। মাথা নীচু করে নিজেকে কেবলই সামলাবার চেষ্টা করছেন তারাসুন্দরী।
স্বামী ব্রহ্মানন্দের কাছেই দীক্ষালাভ করেন তারাসুন্দরী। যখন ভুবনেশ্বরে ধর্মতলায় ছিলেন, সেই সময় নবগঠিত ভুবনেশ্বর মঠে স্বামী ব্রহ্মানন্দের কাছে প্রতিদিন যেতেন। তারাসুন্দরীর কন্যা প্রভাতী খান্না ভুবনেশ্বর মঠের স্মৃতি রোমন্থন করে লিখেছেন –
“সেই সময় মা মহারাজের (স্বামী ব্রহ্মানন্দ) কাছে বহু তত্থকথা শ্রবন করতেন ও নানা অলৌকিক অনুভূতি ও দর্শনাদি লাভ করেন এবং জীবনের লক্ষ্যস্থলের সন্ধান পান। ত্যাগমার্গকেই বাছিয়া লইলেন। শুনিয়াছি মার তখন ৩৩বছর বয়স। তখন হইতেই মা সংসারে থাকিয়া অনাসক্ত জীবন যাপন করিতেন। মোটা গড়া- কাপড় পরিতেন। ভূমিতে শীত-গ্রীষ্ম সব ঋতুতেই কম্বল শয্যা, একবেলা এক মুষ্টি আতপ চাল দুধের মধ্যে সিদ্ধ করিয়া একবার মাত্র আহার করিতেন,রাত্রে কোনদিন মুড়ি-মুড়কী অথবা অল্প একটু মিষ্টান্ন অথবা শুধুই একগ্লাস জল খাইয়া রাত্রের আহার সম্পন্ন করিতেন।”

WHY. SHOULD I"? II Mr. Allen Swift: Born – (1908 – Died 2010)

Mr. Allen Swift: Born – (1908 – Died 2010)

Mr. Allen Swift: Born - (1908 - Died 2010)

Mr. Allen Swift: Born – (1908 – Died 2010)

This man in hand & drove identical automobile for eighty two YEARS.

Can you imagine even having identical automobile for eighty two years?

Mr. Allen Swift (Springfield, Massachusetts ) received this 1928 Rolls-Royce Piccadilly-P1 Roadster from his father, novel – as a graduation gift in 1928. He drove it up till his death … At the age of 102!!! He was the oldest living owner of a automobile that was purchased new. Just thought you would like to check it.

It was given to a Springfield deposit when his death. It has 1,070,000 miles on that, still runs sort of a Swiss watch, dead silent at any speed and is in good cosmetic condition. eighty two years – that is or sothirteen,048 miles annually (1087 per month)…1,070,000 miles ( one,712,000 kilometers!!

That’s British engineering of a bygone era. I do not suppose they create them like this anymore!

Albert Einstein’s adult female usually urged that he dress a lot of professionally once he headed off to figure.”WHY. ought to I”?*he would invariably argue.

“EVERYONE is aware of American state THERE”. once the time came for Einstein to attend his 1st major conference, she begged him to decorate up a touch.”WHY ought to I”? aforementioned Einstein,,”NO ONE is aware of American state THERE “
@page { margin: 2cm } p { margin-bottom: 0.25cm; line-height: 120% }

Donkeys are singing song in a weddings of camels.

उष्ट्राणां च विवाहेषु गीतं गायन्ति गर्दभा:।
परस्परं प्रशंसन्ति अहो रुपमहो ध्वनि:।।
Donkeys are singing song in a weddings of camels. Both are praising each other, (donkeys say) how beautiful (camels are), (camels say) what a pleasant voice (of donkeys. i.e. donkeys are good singers). This is a typical scenario in a gathering of low calibre persons. None of them is of any excellence, but they praise each other, either because they don’t know what is excellence, or because they want some mental satisfaction. Now whenever somebody praises you, remember this Subhashit 😉
ऊंटो के विवाह में गधे गाना गा रहे हैं। दोनों एक दूसरे की प्रशंसा कर रहे हैं वाह क्या रूप है (ऊंटका), वाह क्या आवाज है (गधे की)। वास्तवमें देखा जाए तो ऊंटों में सौंदर्य के कोई लक्षण नहीं होते, न कि गधों में अच्छे स्वर के। परन्तु कुछ लोगों ने कभी उत्तम क्या है यही देखा नहीं होता। ऐसे लोग इस तरह से जो प्रशंसा करने योग्य नहीं है, उसकी प्रशंसा करते हैं।

What are the simple principles of life

What are the simple principles of life?                             
 A river cuts the rock not because of its power but because of its consistency.
Never lose your hope & keep walking towards your vision
Simple principles of Life:-
– Never think you are nothing
– Never think you are everything
– But always think you are something & you can achieve anything

यदि कोई व्यक्ति इस बच्चे को पहचानता हो तो इस बच्चे के घर वालो को बता दे आप छोटा सा प्रयास करें यह सन्देश हर फ़ोन तक पहुच जाये तो शायद बच्चे को परिवार मिल जाये

श्रधेय   भारत वासियों

आप सभी से एक नम्र निवेदन है कि आज एक बच्चा जो शायद अपने बाबा या पिता के साथ कही जा रहा था रास्ते मे ट्रैन के अंदर किसी अज्ञात कारण से बच्चे के साथ वाले शख्स की मृत्यु हो गयी है और बच्चा बहुत परेशान है बच्चा इस समय मथुरा जंक्शन के जी आर पी थाने पर है
यदि कोई व्यक्ति इस बच्चे को पहचानता हो तो इस बच्चे के घर वालो को बता दे आप छोटा सा प्रयास करें यह सन्देश  हर फ़ोन तक पहुच जाये तो शायद बच्चे को परिवार मिल जाये

Night is the ideal time for spiritual practice. Meditation and japa should be performed regularly with great devotion. They purify the mind

What keeps our mind in high level?                      December 25

Night is the ideal time for spiritual practice. Meditation and japa should be performed regularly with great devotion. They purify the mind. Continued for some time, regular practice of this kind is conducive to the establishment of a constant spiritual mood, giving one a taste of inner joy. A person should not leave his seat immediately after meditation, but should sit for a while thinking about the object of his meditation. Then he may recite prayers and hymns along similar lines to intensify and stabilize the meditative mood and inner joy. Even after leaving his seat he should not talk with anyone, but should rather be contemplative and remain by himself for some time. Practice like this fosters a continuous undercurrent of meditation, helping to keep the mind on a high level and bringing to the heart great joy.
(p.5, For Seekers of God, Swami Shivananda’s advice on 25 December 1920).                              Divine night 🌃

Design a site like this with WordPress.com
Get started