https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
ভারতবর্ষের হিন্দিভাষী হিন্দুদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পূজা ছট্ পূজা।
 |
| ভারতবর্ষের হিন্দিভাষী হিন্দুদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পূজা ছট্ পূজা। |
ছট্ অর্থাৎ ছটা বা রশ্মির পূজা। এই রশ্মি সূর্য থেকেই পৃথিবীর বুকে আসে। সুতরাং এই পূজা আসলে সূর্যদেবের পূজা। প্রত্যক্ষভাবে ‘ছট;-এর পূজা হলেও এই পূজার সঙ্গে জড়িত আছেন স্বয়ং সূর্যদেব, আছেন মা গঙ্গা এবং দেবী অন্নপূর্ণা। …
পৌরাণিক কাহিনিতে রয়েছে — বর্ষার আগমন ঘটেছে। কিন্তু বৃষ্টি তেমন হয়নি। চাষিদের মাথায় হাত। মাঠের ফসল মাঠেই মারা যাচ্ছে। মা অন্নপূর্ণা ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে থাকেন। সকল দেবতা মা অন্নপূর্ণার এহেন দুর্দশায় ব্যথিত। ঘরে ঘরে অন্নাভাব হাহাকার ওঠে। সূর্যের তাপ হ্রাস করে বাঁচার জন্য মা অন্নপূর্ণা সূর্যদেবের ধ্যান করতে শুরু করেন। তাতে হিতে বিপরীত হয়। সূর্যের প্রখর ছটায় মা অন্নপূর্ণা দিন দিন শ্রীভ্রষ্টা হয়ে ক্ষীয়মান হতে থাকেন। দেবলোকে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। দেবতারা সম্মিলিতভাবে সূর্যদেবের কাছে গেলে তিনি মা অন্নপূর্ণার এই দশার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন। এবং বলেন, মা অন্নপূর্ণা যেন গঙ্গাদেবীর আশ্রয় নেন। সূর্যদেব আরও বলেন, অস্তগমনকালে গঙ্গাদেবীর আশ্রয়ে থেকে কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে এবং সপ্তমীর উদয়কালে মা অন্নপূর্ণা গঙ্গাদেবীর আশ্রয়ে থেকে উদীয়মান ছটা বা রশ্মিকে দেখে আমার স্তব বা ১২টি নাম উচ্চারণ করলে আমার স্মরণকারীকে সমস্ত পৃথিবী অন্নে পূর্ণ হতে থাকল। মা অন্নপূর্ণা আবার তাঁর শ্রী ফিরে পান।
তাই ছট্ পূজা বা ব্রত একাধারে সূর্যদেব, মা অন্নপূর্ণা ও গঙ্গাদেবীর পূজা। বিজ্ঞানসম্মতভাবে বলা যায়, গঙ্গার জলে সেচ ব্যবস্থা ঠিক থাকলে অনাবৃষ্টিতেও খেত-খামার অন্নে পূর্ণ হয় এবং স্বাভাবিকভাবে মনুষ্যসমাজে খাওয়া-পরার অভাব থাকে না। এই ব্রত পালনে সূর্যদেবের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি আমাদের জীবনে যেমন বিঘ্ননাশক, দুঃখনাশক, তেমনি সুখদায়ক ও অর্থ-বৈভবদায়ক।
দীপাবলির ঠিক ছ-দিন পর পালিত ছট উত্সব হিন্দু ধর্মে মুখ্য ব্রত। কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠীতে ছট ব্রতর বিধান রয়েছে। অথর্ব বেদেও এই পর্বের উল্লেখ রয়েছে।
ছট পর্ব সম্পর্কে বহু কাহিনী প্রচলিত আছে। মনে করা হয়, মহাভারতে কুন্তি দ্বারা সূর্যের আরাধনা এবং কর্ণের জন্ম থেকেই এই পর্বের সূচনা। আবার ছট পর্ব শুরুর অন্য একটি কাহিনীও প্রচলিত আছে। পুরাণে কথিত আছে, প্রিয়ব্রত নামক রাজার কোনও সন্তান ছিল না। সন্তানপ্রাপ্তির জন্য তাঁকে পুত্রয়েষ্টি যজ্ঞ করতে বলেন মহর্ষি কাশ্যপ। যজ্ঞের ফলস্বরুপ রানির একটি ছেলে হয়, কিন্তু সে মৃত জন্ম নেয়। সে সময়ই এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে। আকাশ থেকে এক বিমান অবতীর্ণ হয় এবং সেখানে আসীন দেবী বলেন, ‘আমি ষষ্ঠ দেবী, আমি বিশ্বের সমস্ত শিশুর রক্ষা করি।’ শিশুর মৃত শরীর স্পর্শ করেন এবং ওই শিশু বেঁচে ওঠে। এর পরই রাজ্যে এই ব্রত করার নির্দেশ দেন রাজা।
এ-ও মনে করা হয়, ছট দেবী সূর্যের বোন। তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্যই সূর্যের আরাধনা করা হয়। এ ছাড়াও মার্কণ্ডেয় পুরাণ থেকে জানান যায়, সৃষ্টির অধিষ্ঠাত্রী প্রকৃতি দেবী নিজেক ছ-ভাগে ভাগ করেছিলেন। তাঁর ষষ্ঠ অংশ সর্বশ্রেষ্ঠ মাতৃদেবী রূপে পরিচিত। তিনি ব্রহ্মার মানসপুত্রী এবং সন্তানদের রক্ষা করেন। পুরাণে এই দেবীর নামই কাত্যায়েনি, যাঁর নবরাত্রের ষষ্ঠী তিথিতে পুজো হয়।
আবার পুরাণে এ-ও উল্লেখ আছে, কার্তিক শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠীতে সূর্যাস্ত এবং সপ্তমীতে সূর্যোদয়ের মধ্যে বেদমাতা গায়েত্রীর জন্ম হয়। প্রকৃতির ষষ্ঠ অংশ থেকে উত্পন্ন শিশুদের রক্ষা করে থাকেন তিনি। তিনি বিষ্ণু দ্বারা রচিত মায়া। শিশু জন্মের ষষ্ঠ দিনে ষষ্ঠী দেবীর পুজো করা হয়। যাতে শিশুর কখনও কোনও প্রকার দুঃখ-কষ্ট না হয়। আবার এ-ও মনে করা হয়, পাণ্ডব যখন পাশা খেলায় নিজের সমস্ত রাজপাট হারিয়ে ফেলে তখন দ্রৌপদী ছট ব্রত করেন। দ্রৌপদীর মনোস্কামনা পুরো হয় এবং পাণ্ডব তাঁদের রাজপাট ফিরে পান। এ ছাড়া রামায়ণেও ছট পুজোর উল্লেখ পাওয়া যায়।
প্রাচীন কালে বিহার এবং উত্তর প্রদেশে এই পর্ব অনুষ্ঠিত হত। কিন্তু এখন এই প্রান্তের মানুষ যেখানেই খাকেন, সেখানেই এই পুজো হয়।
এই ব্রতে তিন দিনের কঠোর উপবাসের বিধান রয়েছে। যাঁরা এই ব্রত করেন, তাঁদের পঞ্চমীর দিন নুন ছাড়া ভোজন গ্রহণ করেত হয়। ষষ্ঠীতে নির্জলা থেকে ব্রত করতে হয়। ষষ্ঠীতে অস্ত সূর্যের পুজো করে অর্ঘ্য নিবেদন করতে হয়। সপ্তমীর সকালে উদিত সূর্যকে অর্ঘ্য দিতে হয়। তার পর জল খেয়ে উপবাস পুরো করতে হয়। কোনও নদী বা পুকুরে গিয়ে এই পুজো করতে হয়।
মনে করা হয়, পঞ্চমীর রাত্রি থেকেই ঘরে ঘরে ষষ্ঠীর আগমন হয়। সূর্যের এই ব্রতে শক্তি এবং ব্রহ্মার উভয়ের পুজোর ফল পাওয়া যায়। তাই এই ব্রত সূর্যষষ্ঠীর নামে বিখ্যাত।
চতুর্থীর দিন থেকে এই ব্রত শুরু। এদিন পুরো দিনের উপবাস রাখা হয়। রাতে কাঠ বা মাটির উনুনে পায়েস এবং লুচি রান্না করা হয়। ভোগ লাগিয়ে সেই প্রসাদ খান মহিলারা। তৃতীয় দিন প্রথম অর্ঘ্য এবং চতুর্থ দিন দ্বিতীয় অর্ঘ্য। এই দুই দিনই কোনও জলাশয়ে গিয়ে অস্ত সূর্য এবং উদিত সূর্যের আরাধনা করে সূর্যকে অর্ঘ্য দিতে হয়।