“আমি লেবু কাটতে পারি না। সেদিন অনেক কষ্টে, ‘জয় কালী’ বলে তাঁর সম্মুখে বলির মতো করে তবে কাটতে পেরেছিলুম।

“তব কথামৃতং তপ্তজীবনং, কবিভিরীড়িতং কল্মষাপহম্‌ ৷
শ্রবণমঙ্গলং শ্রীমদাততং, ভুবি গৃণন্তি যে ভূরিদা জনাঃ ৷৷”

কাছাকাছি দিন থেকে-
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
১৮৮৪, ২৭শে ডিসেম্বর
ঈশ্বরদর্শনের উপায় — শ্রীমুখ-কথিত চরিতামৃত
পাঠ চলিতে লাগিল। এইবার ঈশ্বরদর্শনের কথা। প্রফুল্ল এবার দেবী চৌধুরাণী হইয়াছেন। বৈশাখী শুক্লা সপ্তমী তিথী। দেবী বজরার উপর বসিয়া দিবার সহিত কথা কহিতেছেন। চাঁদ উঠিয়াছে। গঙ্গাবক্ষে বজরা নঙ্গর করিয়া আছে। বজরার ছাদে দেবী ও সখীদ্বয়। ঈশ্বর কি প্রত্যক্ষ হন, এই কথা হইতেছে। দেবী বললেন, যেমন ফুলের গন্ধ ঘ্রাণের প্রত্যক্ষ সেইরূপ ঈশ্বর মনের প্রত্যক্ষ হন। “ঈশ্বর মানস প্রত্যক্ষের বিষয়।”
শ্রীরামকৃষ্ণ — মনের প্রত্যক্ষ। সে এ-মনের নয়। সে শুদ্ধমনের। এ-মন থাকে না। বিষয়াসক্তি একটুও থাকলে হয় না। মন যখন শুদ্ধ হয়, শুদ্ধমনও বলতে পার, শুদ্ধ আত্মাও বলতে পার।
[যোগ দূরবীন — পাতিব্রত্যধর্ম ও শ্রীরামকৃষ্ণ ]
মাস্টার — মনের দ্বারা প্রত্যক্ষ যে সহজে হয় না, এ-কথা একটু পরে আছে। বলেছে প্রত্যক্ষ করতে দূরবীন চাই। ওই দূরবীনের নাম যোগ। তারপর যেমন গীতায় আছে, বলেছে, যোগ তিনরকম — জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ, কর্মযোগ। এই যোগ-দূরবীন দিয়ে ঈশ্বরকে দেখা যায়।
শ্রীরামকৃষ্ণ — এ খুব ভাল কথা। গীতার কথা।
মাস্টার — শেষে দেবী চৌধুরানীর স্বামীর সঙ্গে দেখা হল। স্বামীর উপর খুব ভক্তি। স্বামীকে বললে, “তুমি আমার দেবতা। আমি অন্য দেবতার অর্চনা করিতে শিখিতেছিলাম, শিখিতে পারি নাই। তুমি সব দেবতার স্থান অধিকার করিয়াছ।”
শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) — “শিখিতে পারি নাই!” এর নাম পতিব্রতার ধর্ম। এও আছে।
পাঠ সমাপ্ত হইল। ঠাকুর হাসিতেছেন। ভক্তেরা চাহিয়া আছেন, ঠাকুর আবার কি বলেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে, কেদার ও অন্যান্য ভক্তদের প্রতি) — এ একরকম মন্দ নয়। পতিব্রতাধর্ম। প্রতিমায় ঈশ্বরের পূজা হয় আর জীয়ন্ত মানুষে কি হয় না? তিনিই মানুষ হয়ে লীলা করছেন।
[পূর্বকথা — ঠাকুরের ব্রহ্মজ্ঞানের অবস্থা ও সর্বভূতে ঈশ্বরদর্শন ]
“কি অবস্থা গেছে। হরগৌরীভাবে কতদিন ছিলুম। আবার কতদিন রাধাকৃষ্ণভাবে! কখন সীতারামের ভাবে! রাধার ভাবে কৃষ্ণ কৃষ্ণ করতুম, সীতার ভাবে রাম রাম করতুম!
“তবে লীলাই শেষ নয়। এই সব ভাবের পর বললুম, মা এ-সব বিচ্ছেদ আছে। যার বিচ্ছেদ নাই, এমন অবস্থা করে দাও। তাই কতদিন অখণ্ড সচ্চিদানন্দ এই ভাবে রইলুম। ঠাকুরদের ছবি ঘর থেকে বার করে দিলুম।
“তাঁকে সর্বভূতে দর্শন করতে লাগলুম। পূজা উঠে গেল! এই বেলগাছ! বেলপাতা তুলতে আসতুম! একদিন পাতা ছিঁড়তে গিয়ে আঁশ খানিকটা উঠে এল। দেখলাম গাছ চৈতন্যময়! মনে কষ্ট হল। দূর্বা তুলতে গিয়ে দেখি, আর-সেরকম করে তুলতে পারিনি। তখন রোখ করে তুলতে গেলুম।
“আমি লেবু কাটতে পারি না। সেদিন অনেক কষ্টে, ‘জয় কালী’ বলে তাঁর সম্মুখে বলির মতো করে তবে কাটতে পেরেছিলুম। একদিন ফুল তুলতে গিয়ে দেখিয়ে দিলে, — গাছে ফুল ফুটে আছে, যেন সম্মুখে বিরাট — পূজা হয়ে গেছে — বিরাটের মাথায় ফুলের তোড়া! আর ফুল তোলা হল না!
“তিনি মানুষ হয়েও লীলা করছেন। আমি দেখি, সাক্ষাৎ নারায়ণ। কাঠ ঘষতে ঘষতে আগুন বেরোয়, ভক্তির জোর থাকলে মানুষেতেই ঈশ্বর দর্শন হয়। তেমন টোপ হলে বড় রুই কাতলা কপ্‌ করে খায়।
প্রেমোন্মাদ হলে সর্বভূতে সাক্ষাৎকার হয়। গোপীরা সর্বভূতে শ্রীকৃষ্ণ দর্শন করেছিল। কৃষ্ণময় দেখেছিল। বলেছিল, আমি কৃষ্ণ! তখন উন্মাদ অবস্থা! গাছ দেখে বলে, এরা তপস্বী, শ্রীকৃষ্ণের ধ্যান করছে। তৃণ দেখে বলে, শ্রীকৃষ্ণকে স্পর্শ করে ওই দেখ পৃথিবীর রোমাঞ্চ হয়েছে।
“পতিব্রতাধর্ম; স্বামী দেবতা। তা হবে না কেন? প্রতিমায় পূজা হয়, আর জীয়ন্ত মানুষে কি হয় না?”
[প্রতিমায় আবির্ভাব — মানুষে ঈশ্বরদর্শন কখন? নিত্যসিদ্ধি ও সংসার ]
“প্রতিমায় আবির্ভাব হতে গেলে তিনটি জিনিসের দরকার, — প্রথম পূজারীর ভক্তি, দ্বিতীয় প্রতিমা সুন্দর হওয়া চাই, তৃতীয় গৃহস্বামীর ভক্তি। বৈষ্ণবচরণ বলেছিল, শেষে নরলীলাতেই মনটি কুড়িয়ে আসে।
“তবে একটি কথা আছে, — তাঁকে সাক্ষাৎকার না করলে এরূপ লীলাদর্শন হয় না। সাক্ষাৎকারের লক্ষণ কি জান? বালকস্বভাব হয়। কেন বালকস্বভাব হয়? ঈশ্বর নিজে বালকস্বভাব কি না! তাই যে তাঁকে দর্শন করে, তারও বালকস্বভাব হয়ে যায়।”
[ঈশ্বরদর্শনের উপায় — তীব্র বৈরাগ্য ও তিনি আপনার ‘বাপ’ এই বোধ ]
“এই দর্শন হওয়া চাই। এখন তাঁর সাক্ষাৎকার কেমন করে হয়? তীব্র বৈরাগ্য। এমন হওয়া চাই যে, বলবে, কি! জগৎপিতা? আমি কি জগৎ ছাড়া? আমায় তুমি দয়া করবে না? শালা!’
“যে যাকে চিন্তা করে, সে তার সত্তা পায়। শিবপূজা করে শিবের সত্তা পায়। একজন রামের ভক্ত, রাতদিন হনুমানের চিন্তা করত! মনে করত, আমি হনুমান হয়েছি। শেষে তার ধ্রুব বিশ্বাস হল যে, তার একটু ল্যাজও হয়েছে!
“শিব অংশে জ্ঞান হয়, বিষ্ণু অংশে ভক্তি হয়। যাদের শিব অংশ তাদের জ্ঞানীর স্বভাব, যাদের বিষ্ণু অংশ, তাদের ভক্তের স্বভাব।”
[চৈতন্যদেব অবতার — সামান্য জীব দুর্বল ]
মাস্টার — চৈতন্যদেব? তাঁর তো আপনি বলেছিলেন, জ্ঞান ও ভক্তি দুই ছিল।
শ্রীরামকৃষ্ণ (বিরক্ত হইয়া) — তাঁর আলাদা কথা। তিনি ঈশ্বরের অবতার। তাঁর সঙ্গে জীবের অনেক তফাত। তাঁর এমন বৈরাগ্য যে, সার্বভৌম যখন জিহ্বায় চিনি ঢেলে দিলে, চিনি হাওয়াতে ফরফর করে উড়ে গেল, ভিজলো না। সর্বদাই সমাধিস্থ! কত বড় কামজয়ী! জীবের সহিত তাঁর তুলনা! সিংহ বার বছরে একবার রমণ করে, কিন্তু মাংস খায়; চড়ুই কাঁকর খায়, কিন্তু রাতদিনই রমণ করে। তেমনি অবতার আর জীব। জীব কাম ত্যাগ করে, আবার একদিন হয়তো রমণ হয়ে গেল; সামলাতে পারে না। (মাস্টারের প্রতি) লজ্জা কেন? যার হয় সে লোক পোক দেখে! ‘লজ্জা ঘৃণা ভয়, তিন থাকতে নয়।’ এ-সব পাশ। ‘অষ্ট পাশ’ আছে না?
“যে নিত্যসিদ্ধ তার আবার সংসারে ভয় কি? ছকবাঁধা খেলা; আবার ফেললে কি হয়, ছকবাঁধা খেলাতে এ-ভয় থাকে না।
“যে নিত্যসিদ্ধ, সে মনে করলে সংসারেও থাকতে পারে। কেউ কেউ দুই তলোয়ার নিয়ে খেলতে পারে। এমন খেলোয়াড় যে, ঢিল পড়লে তলোয়ারে লেগে ঠিকরে যায়!”
[দর্শনের উপায় যোগ — যোগীর লক্ষণ ]
ভক্ত — মহাশয়, কি অবস্থায় ঈশ্বরের দর্শন পাওয়া যায়?
শ্রীরামকৃষ্ণ — মন সব কুড়িয়ে না আনলে কি হয়। ভগবতে শুকদেবের কথা আছে — পথে যাচ্ছে যেন সঙ্গীন চড়ান। কোনদিকে দৃষ্টি নাই। এক লক্ষ্য — কেবল ভগবানের দিকে দৃষ্টি। এর নাম যোগ।
“চাতক কেবল মেঘের জল খায়। গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, আর সব নদী জলে পরিপূর্ণ, সাত সমুদ্র ভরপুর, তবু সে জল খাবে না। মেঘের জল পড়বে তবে খাবে।
“যার এরূপ যোগ হয়েছে, তার ঈশ্বরের দর্শন হতে পারে। থিয়েটারে গেলে যতক্ষণ না পর্দা ওঠে ততক্ষণ লোকে বসে বসে নানারকম গল্প করে — বাড়ির কথা, আফিসের কথা, ইস্কুলের কথা এই সব। যাই পর্দা উঠে, অমনি কথাবার্তা সব বন্ধ। যা নাটক হচ্ছে, একদৃষ্টে তাই দেখতে থাকে। অনেকক্ষণ পরে যদি এক-আধটা কথা কয় সে ওই নাটকেরই কথা।
“মাতাল মদ খাওয়ার পর কেবল আনন্দের কথাই কয়।”
“ওঁ নিরঞ্জনং নিত্যমনন্তরূপং ভক্তানুকম্পাধৃতবিগ্রহং বৈ।
ঈশাবতারং পরমেশমীড্যং তং রামকৃষ্ণং শিরসা নমামি।।”

What is the mystical laws of nature?

 *Today’s Thought…*

What are the mystical laws of nature?                               
*”There is a wonderful mythical*
*law of nature that the three*
*things we crave most in life –*
*Happiness,*
*Freedom,*
*and*
*Peace of mind –*
*are always attained by giving*
*them to someone else.”* 
      
*Good Morning
*Have A Nice Day

শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলিতেন, “রাখাল আমার ছেলে—মানসপুত্র” এবং ‘নিত্যসিদ্ধ ও ভক্ত’

শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলিতেন, “রাখাল আমার ছেলে—মানসপুত্র” এবং ‘নিত্যসিদ্ধ ও ভক্ত’
==============================
      “অনেকের সাধ্যসাধনা করে একটু ভক্তি হয়, এর আজন্ম ঈশ্বরে ভালবাসা—যেন পাতাল-ফোঁড়া শিব, বসানো শিব নয়।” পাতাল-ফোঁড়া শিবকে সংসারী করিবার জন্য পিতা আনন্দমোহন কৈশোর অতিক্রম না হইতেই বিবাহ দিলেন।  একদিন দেখি, মা একটি ছেলে এনে আমার কোলে বসিয়ে দিয়ে বললেন—এইটি তোমার ছেলে।  আমি তো শিউরে উঠলাম।  মা আমার ভাব দেখে  হেসে বললেন—সাধারণ সংসারিভাবের ছেলে নয়,ত্যাগী মানসপুত্র।  এদিকে পিতাপুত্রে অপূর্ব প্রীতির খেলা চলিতে লাগিল।  শ্রীরামকৃষ্ণের অপরিসীম আদরে রাখালরাজ ভাবিতেন—ইনি নিজস্ব আমার। এমন করিয়া দিন বহিতে লাগিল।  শ্রীরামকৃষ্ণ বুঝিয়াছিলেন, রাখাল আর সংসারে আসক্ত হইবে না।  দিনে দিনে রাখালরাজের অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দিল।  অন্তরে ভক্তির পূর্ণ জোয়ার, অনুরাগের একটানা স্রোত—অনুক্ষণ যেন নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন !  যাঁহারা গৃহ ত্যাগ করিয়া গুরুসেবায় রত হইয়াছিলেন, রাখালরাজ ভিন্ন প্রায় অপর সকলেই কুমার ব্রহ্মচারী।  পিতার ঐশ্বর্য, রূপযৌবনশালিনী ভার্যা, সুকুমার পুত্র, সংসারের যাহা কিছু মোহকর আকর্ষণ তৃণজ্ঞানে বর্জন করিয়া ব্রজের প্রেমিক রাখাল বিশ্বেপ্রেমে আত্মোৎসর্গ করিলেন।
      এদিকে স্বামীজী শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ধর্ম-সমন্বয়ের বাণী জগতে প্রচার করিলেন।  তাঁহার সে আশার বাণী শ্রবণ করিয়া ভগবন্নিষ্ঠ ভক্তগণ শ্রীরামকৃষ্ণ মঠে যোগ দিবার জন্য উৎসাহিত হইল। অপরদিকে মহারাজ সে-সকল ভক্তগণকে লইয়া নীরবে, শান্তভাবে শ্রীরামকৃষ্ণ-সঙ্ঘ গড়িয়া তুলিলেন।  তাঁহার অপরিসীম স্নেহ, ভালবাসা, অপূর্ব কর্মকুশলতা এবং আধ্যাত্মিক শান্তিপ্রবাহে শ্রীরামকৃষ্ণ-সঙ্ঘ শশিকলার ন্যায় দিন দিন বর্ধিত হইয়া ভারত ও ভারতবহির্ভূত প্রদেশে বিস্তার লাভ করিল।
            ♣♣♣♦♦♣♣♣

হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের যোগ = ভালোবাসা II স্বামিজীর ইচ্ছা হয়েছিল বেলুড় মঠে গঙ্গার ধারের কিছুটা পোস্তা বেঁধে একটি ঘাট বানাবেন । তিনি বিজ্ঞান মহারাজকে প্ল্যান ও খরচ-পত্রাদির একটি আনুমানিক হিসাব করতে বলেন ।

swami Vivekananda
হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের যোগ = ভালোবাসা
==============================
স্বামিজীর ইচ্ছা হয়েছিল বেলুড় মঠে গঙ্গার ধারের কিছুটা পোস্তা বেঁধে একটি ঘাট বানাবেন । তিনি বিজ্ঞান মহারাজকে প্ল্যান ও খরচ-পত্রাদির একটি আনুমানিক হিসাব করতে বলেন । বিজ্ঞান মহারাজ ভয়ে ভয়ে কম করে তিন হাজার টাকার হিসাব তৈরী করলেন। স্বামিজী খুব খুশী হয়ে মহারাজকে ডেকে বললেন, “কি বল রাজা, এই সামানেটাতে একটা ঘাট আর পোস্তা হলে বেশ হয়। পেসন তো বলছে যে তিন হাজার টাকায় হয়ে যাবে। তুমি বল তো কাজ সুরু হতে পারে।” মহারাজ বললেন, “তিন হাজার টাকায় হয় তো তা যোগাড় হয়ে যাবে।” স্বামিজীর ইচ্ছা অনুসারে মহারাজ ভিত্তি স্থাপন করলেন। বিজ্ঞান মহারাজ একদিন মহারাজকে জানালেন যে তিনি যা হিসাব করেছিলেন তার থেকে অনেক বেশি খরচ হবে। মহারাজ তাঁকে আশ্বাস দিলেন, “তার আর কি করা যাবে ? কাজে যখন হাত দেওয়া হয়েছে, যে করেই হোক শেষ করতেই হবে। তুমি তার জন্য ভেব না। কাজ যাতে ভাল ভাবে হয়, তাই তুমি কর।” একদিন স্বামিজী মহারাজের কাছে হিসাব দেখিতে গিয়ে দেখলেন যে, তিন হাজারের ঢের বেশী টাকা খরচ হয়ে গেছে, অথচ কাজ শেষ হতে এখনও অনেক বাকি। স্বামিজী অকথ্য ভাষায় মহারাজকে তিরস্কার করলেন। মহারাজ নীববে সব শুনলেন। এরপর নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করলেন। কিছুক্ষণ পরে স্বামিজী বিজ্ঞান মহারাজকে বললেন, “দেখ তো পেসন, রাজা কি করছে ?” বিজ্ঞান মহারাজ স্বামিজীকে জানালেন যে মহারাজ বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদছেন। শুনেই স্বামিজী পাগলের মতো দৌড়ে মহারাজের ঘরে গেলেন। তারপর মহারাজকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, “রাজা, রাজা, আমায় ক্ষমা কর। আমি কি অন্যায় না করেছি ! তোমায় গালাগাল করেছি – আমায় ক্ষমা কর।” স্বামিজীর কান্না দেখে মহারাজ একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলেন। তিনি স্বামিজীকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “তুমি অমন করছে কেন ? আমায় গালাগাল দিয়েছ – তাতে হয়েছে কি ? তুমি ভালবাস, তাইত এইসব বলেছ।” স্বামিজী বললেন, “না, না, তুমি আমায় ক্ষমা কর। তোমায় ঠাকুর কত আদর করতেন, কখন তোমায় তিনি একটা কড়া কথা বলেন নি। আর আমি কি না ছাই কাজের জন্য তোমায় গালাগাল করলুম – তোমার মনে কষ্ট দিলুম। আমি আর তোমাদের সঙ্গে থাকবার যোগ্য নই। চলে যাই হিমালয়ে – কোথাও গিয়ে নির্জ্জনে থাকব।” মহারাজ অমনি বললেন, “সে কি, তোমার গালাগাল যে আমাদের আশীর্ব্বাদ। তুমি কোথায় চলে যাবে ? তুমি আমাদের মাথা। তুমি চলে গেলে আমরা কি নিয়ে থাকব ?” এই ভাবে দুই বন্ধু একে অন্যকে সান্ত্বনা দিতে দিতে শান্ত হলেন।

তাঁর ঐশ্বরিক করুণা অপূর্ব – তুলনাহীন এবং আমাদের ক্ষুদ্রবুদ্ধির অগম্য।

মায়ের সঙ্গে সাক্ষাতের কয়েক বছর পর একদিন মনে মনে ভাবলাম, আমি যদি দেড় টাকা পাঠিয়ে রাসবিহারী মহারাজকে অনুরোধ করি এক টাকার মিছরি কিনে শ্রীশ্রীমাকে দিয়ে ঠাকুরকে নিবেদন করিয়ে তার অল্প কিছু আমাকে পাঠিয়ে দিতে, তাহলে খুব ভাল হয়। কিন্তু আমি যখন বেতন পেতাম, তখন একথা একেবারে ভুলে যেতাম এবং বেতনের সব টাকাও তাড়াতাড়ি খরচ হয়ে যেত। এইভাবে ছয়মাস কেটে গেল, আমার ইচ্ছা পূর্ণ আর হলো না।
এক বিশেষ পূণ্যদিনে পূজা শেষ করে উঠে আমি দুটি চিঠি পেলাম। হাতের লেখা দেখে বুঝতে পারলাম, চিঠিগুলি স্বামী বিশুদ্ধানন্দজীর পাঠানো। একটি চিঠি পড়লাম। অপরটি খুলে দেখি, তারমধ্যে একটি প্যাকেট। প্যাকেটটির মোড়কের ওপর লেখা – “শ্রীশ্রীমায়ের প্রসাদ”। প্যাকেটের ভিতরে কতকগুলি মিছরি ছিল। আমার বিস্ময় আর আনন্দের সীমা রইল না। এই ঘটনাটি নিশ্চিতভাবেই শ্রীশ্রীমায়ের অন্তর্দৃষ্টি ও অন্তর্যামিত্বের পরিচায়ক, যে দৃষ্টি এবং শক্তি ভক্তের একান্ত আকাঙ্ক্ষা জানতে পেরে তা পূর্ণ করে। তাঁর ঐশ্বরিক করুণা অপূর্ব – তুলনাহীন এবং আমাদের ক্ষুদ্রবুদ্ধির অগম্য।
লাবণ্য কুমার চক্তবর্তী

।। শ্রীচৈতন্যদেবের সন্ন্যাস ও শ্রীক্ষেত্র যাত্রা।।

(রামকৃষ্ণ সারদা আশ্রম (আঁটপুর) থেকে প্রকাশিত ২০০৯-২০১০ বার্ষিক ‘হোমাগ্নি’ পত্রিকায় আমার অতিপ্রিয় ও আপনার জন শ্রী অচিন্ত্য মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের কলম থেকে)
        
      ।। শ্রীচৈতন্যদেবের সন্ন্যাস ও শ্রীক্ষেত্র যাত্রা।।
    

                           –  ১ –

নিমাই-এর মন সাধারণজনের দুঃখে যন্ত্রণাকাতর হয়ে পড়েছে। তাঁর সেই সিদ্ধান্ত, সন্ন্যাস গ্রহণের , তাঁর অন্তরে আরও দৃঢ়ভাবে প্রথিত হতে লাগল।
কিন্তু একই সাথে এটাও তিনি অনুভব করতে লাগলেন যে সিদ্ধান্ত করা যত সহজ তাকে কার্যে পরিণত করা ঠিক ততটাই কঠিন। বিশেষ করে যখন সেটা বৃদ্ধা জনণীর একমাত্র পুত্রের ও কিশোরী সাধ্বী স্ত্রীর প্রেমময় স্বামীর পক্ষে গ্রহন করতে হয়।

সংসারের দুর্জয় আকর্ষণ যে সবের প্রতি সাধারণে অনুভব করে অর্থাৎ দেহসুখ,যশাকাঙ্খা,সম্পদলাভ ইত্যাদি সে সবের প্রতি নিমাই-এর বিন্দুমাত্র আকর্ষন নেই। তাঁর নিজের দিক দিয়ে না হলেও মা-স্ত্রীকে অকুল পাথারে ভাসিয়ে দিয়ে সন্ন্যাস নিয়ে সংসার ত্যাগ করে বেড়িয়ে যেতে মনের কোণায় কোথায় যেন এক বাধা অনুভব করতে লাগলেন।

পরম শাস্ত্রজ্ঞ নিমাই -এর কাছে সন্ন্যাসের অধিকার সম্বন্ধীয় অনুশাষন অজানা নয়। কিন্তু শাস্ত্র কি পারে সন্তানহারা জননীর বুকফাটা হাহাকারকে শান্ত করতে? পারে কি কিশোরী প্রেষয়ী স্ত্রীর অন্তরের অব্যক্ত যন্ত্রণা উপশম করতে? না পারে না। একদিকে সহস্র সহস্র অসহায় আপামর জনসাধারণ আর একদিকে একান্ত নির্ভরশীল , প্রেমময়ী দুই নারী । একজন বাৎসল্য প্রেমের দ্বারা আর একজন মধুর প্রেমের দ্বারা তাঁকে বেঁধে রাখার প্রয়াস পাচ্ছে। এদুয়ের মধ্যে পড়ে নিমাই-এর কোমল হৃদয় উত্তরোত্তর যন্ত্রণা কাতর হয়ে পড়েত
লাগল।তিনি ক্রমাগত চিন্তাচ্ছন্ন হয়ে দিন কাটাতে  লাগলেন।

এর প্রতিফলন নিমাই-এর দৈনন্দিন জীবন ধারার ওপর পড়তে লাগল। তিনি চুপ করে বসে বসে কি যেন ভাবেন। এমন কি তাঁর প্রাণের প্রান সংকীর্তনেও মাঝে মাঝে অনুপস্থিত থাকতে লাগলেন। অন্তরঙ্গ ভক্তগণ তাঁর এই হঠাৎ উদাসীনতায় বড় আশ্চর্য হয়ে উঠলেন। ব্যতিক্রম শুধু নিত্যানন্দ। এই চির আনন্দময় পুরুষ নিত্য নিমাইকে সঙ্গ দেন,তাঁকে আগলে রাখেন, তাঁকে প্রফুল্ল করার চেষ্টা করেন। একমাত্র তিনিই যেন নিমাই-এর অন্তরের ভাব অনুধাবন করতে পারেন। শচীমা বড় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছন। নিমাই-এর এই ভাবান্তরের কারণ কি তা তিনি কিছুতেই বুঝে উঠত্ পারছেন না। বেশ তো ছিল নিমাই। আবার একি হল তাঁর। নিত্যানন্দ সকলকেই প্রবোধ দেন ,এ সাময়িক ব্যাপার কিছুদিনের মধ্যেই নিমাই আগের মত হয়ে যাবে।

নবদ্বীপ থেকে কিছুদূরে গঙ্গার অপর পারে, কাটোয়ায় শ্রীমৎ কেশব ভারতীজী তাঁর কুঠীয়ায় থেকে সাধনভজন করতেন। বৃদ্ধ, তত্ত্বজ্ঞানী, সন্ন্যাসী সশিষ্য সেখানে বাস করতেন। একবার তিনি নবদ্বীপে এলেন এবং নিমাই-এর গৃহে ভিক্ষার্থী হলেন। এ যেন এক অদৃশ্য নাট্যকারের নিয়ন্ত্রিত ঘটনাবলী। নিমাই তাঁকে সশ্রদ্ধ অভ্যর্থনা করলেন। নিজের হাতে রান্না করে তাঁকে ভিক্ষা করালেন। নিমাই-এর কথা শুনেছিলেন বৃদ্ধ সন্ন্যাসী। শুনেছিলেন তাঁর সম্বন্ধে ভাল-মন্দ কত কথা। কিন্তু
এবার তাঁকে সাক্ষাত দেখলেন,কথা বললেন এবং সেবা গ্রহন করলেন। তাঁর তপঃশুদ্ধ অন্তর. কিন্তু অন্য কথা অনুভব করতে লাগল। এ কোন সাধারণ
মানুষ হতে পারে না। তিনি শুধুই নিমাই-এর অপরূপ বাহ্যিক রূপটাই দেখলেন না,দেখলেন নিমাই-এর অন্তরে যন্ত্রণা ক্লিষ্ট জীবের জন্য
ভিক্ষা গ্রহনের পর সামান্য বিশ্রাম করা হলে ভারতীজী নিমাই-এর সঙ্গে আলাপ করতে বসলেন।
নানান শাস্ত্রীয় প্রসঙ্গের পর নিমাই তাঁর সন্ন্যাসের অধিকার সম্বন্ধে প্রশ্ন করলেন। ভারতীজী বললেন,
“তুমি বিধবা মায়ের একমাত্র অবলম্বন। তাছাড়া
তোমার সাধ্বী স্ত্রী এখনও পুত্র মুখদর্শন করেনি। এই অবস্থায় তাদের অনুমতি বিনা সংসার ত্যাগ করে যাওয়া অনুচিত। ” এরপর নানান শাস্ত্রীয় যুক্তি
প্রদর্শন করে নিমাই দেখালেন যখন সংসার অন্ধকূপের মত বোধ হয় এবং ঈশ্বরের জন্য ব্যাকুলতায় ঐহিক কোন কিছুই আর প্রিয় বলে বোধ হয় না, তখন শাস্ত্রীয় যুক্তির উল্লঙ্ঘন ঘটে
এবং সংসার ত্যাগের অধিকার জন্মায়। বৃদ্ধ সন্ন্যাসী
নিমাই-এর অন্তস্পর্শী কথা শুনে চুপ করে রইলেন।
নিমাই তাঁর সংকল্প হতে বিচ্যুত হলেন না।

এদিকে শচীমা বড়ই ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। একদিন অবসরে নিমাইকে কাছে পেয়ে ,তাঁর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে তাঁর এই মন খারাপের কারণ
জানতে চাইলেন। নিমাই এইরকমই এক সুযোগের
অপেক্ষায় ছিলেন। শচীমা-এর মন বুঝে তিনি সন্ন্যাসের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। ষোল বছর আগে তাঁর এক ছেলে সংসার ত্যাগ করে চলে গেছে। আর এইটি ছিল তাঁর একমাত্র অবলম্বন।
সেও সংসার ত্যাগ করতে চায়। ডুকরে কেঁদে উঠলেন শচীমা।নিমাই একটু সময় নিয়ে মাকে শান্ত
হবার সুযোগ দিলেন। তারপর উচ্চ আধ্যাত্মিক
তত্ত্বকথায় মাকে সান্তনা দিতে লাগলেন। বোঝাতে
লাগলেন জগতের অনিত্যতা ও কর্মফলের বন্ধন।

কে তুমি তোমার পুত্র কে বা কার বাপ।
মিছা তোর মোর করি কর অনুতাপ।।
কি নারীপুরুষ কিবা কে বা কার পতি।
শ্রীকৃষ্ণ চরণই অন্য নাহি গতি।।
সেই মাতা সেই পিতা সেই বন্ধুজন।
সেই হর্তা সেই কর্তা সেইমাত্র ধন।।
তা বিনু সকলই মিছা কহিনু এ তত্ত্ব।
তা বিনু সকল মিথ্যা  সকল জগত।।
পুত্র স্নেহে কর মোরে যত বড় ভাব।
শ্রীকৃষ্ণ চরণ হৈলে কত হৈত লাভ।।
সংসারে আরতি করি মরিবার তরে।
শ্রীকৃষ্ণ আরতি করি ভব তরিবারে।।

ধীরে ধীরে শচীমায়ের মনে জগতের অনিত্যতার ভাব প্রতিফলিত হতে লাগল।তাঁর অন্তরে প্রতিভাত
হতে লাগল শ্রীকৃষ্ণ বই জগতে আর কোন আশ্রয় নেই। একমাত্র তাঁকে অবলম্বন করলেই সংসারের দুঃখ যন্ত্রণার হাত হতে মুক্তি পাওয়া যায়,সমস্ত কর্ম
বন্ধনের পারে যাওয়া যায়। আর তাঁর আদরের নিমাই সেটাই করতে চাইছে। তিনি বাধা দেওয়ার কে! অন্তরের গভীরে সন্তান হারানোর বেদনা অসহ্য
বোধ হলেও তিনি তাঁর প্রাণের ধন নিমাই-এর কথাই
ভাবতে লাগলেন। নিমাইয়ের অন্তরে যে বৈরাগ্যের
উদয় হয়েছে, তাকে দমন করে, তাকে সংসারে বেঁধে রাখলে তার যন্ত্রণা বাড়বে বই কমবে না। বাৎসল্যভাবের আধিক্যে এমন তাঁর নিজের সুখদুঃখ তুচ্ছ বলে মনে হতে লাগল। সন্তানের   আনন্দই তাঁর কাছে একমাত্র কাম্য বলে মনে হল।
তিনি নিমাইকে সন্ন্যাসের অনুমতি দিলেন কিন্তু আরো কিছুদিন তাঁর কাছে থাকতে অনুরোধ করলেন।নিমাইয়ের অভীপ্সা পূর্ণ হল। তিনি মায়ের পায়ে মাথা রেখে বারবার প্রণাম করতে লাগলেন
আর শচীমা তাঁর মাথায় হাত রেখে তাঁর সর্ববিদ কল্যাণ কামনায় আশীর্বাদ করলেন।
     লোকের মুখে মুখে নিমাই-এর সন্ন্যাসের খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। দেবী বিষ্ণুপ্রিয়া তখন বাপের বাড়ীতে ছিলেন। তাঁর বয়স তখন সবে চোদ্দ বছর,লোকের মুখে স্বামীর সন্ন্যাসের সংকল্পের খবর শুনে দ্রুত শ্বশুরবাড়ী ফিরে এলেন। সেদিন রাত্রে খাওয়াদাওয়ার পর নিমাই যখন শয়নকক্ষে
বিশ্রাম করছেন তখন বিষ্ণুপ্রিয়া স্বামীর পদসেবা করতে করতে নিজের হৃদয়ের আর্তি তাঁর প্রেমের দেবতার কাছে নিবেদন করলেন এবং নিমাইয়ের রাতুল শ্রীচরণ অশ্রুধৌত করতে লাগলেন। নিমাইয়ের কোমল হৃদয়ে বড় ব্যাথা লাগল। বিষ্ণুপ্রিয়াকে কাছে টেনে নিলেন,গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে পরম প্রেমময় বাক্যে তাঁকে উচ্চ আধ্যাত্মিক তত্ত্ব বোঝাতে লাগলেন।

জগতে যতেক দেখ, মিছা করি সব লেঘ,মিছা করি
করহ গেয়ান।
মিছা পতি সুতনারী,পিতামাতা যত বলি,পরিণামে কে হয় কাহার।।
শ্রীকৃষ্ণ চরণ বহি,আর তো কুটুম্ব নাহি,যত দেখ সব মায়া তার।
কি নারী পুরুষ দেখ, সভারি সে আত্মা এক,মিছা মায়া বন্ধে হয় দুই।
শ্রীকৃষ্ণ সভার পতি আর সব প্রকৃতি এই কথা না বুঝয়ে কোই।।

পরম বিশুদ্ধা-হদয়া দেবী বিষ্ণুপ্রিয়া স্বামীর মতই বৈরাগ্যের উদয় হল। বৃদ্ধা শাশুড়ী সন্তান হারিয়ে কি পরিমান যন্ত্রণায় পড়বেন তা ভেবে তিনি ব্যাকুল হলেন। নিমাই মৃদু হেসে তাঁকে আশ্বস্ত করলেন যে তিনি পূর্বেই মায়ের অনুমতি পেয়েছেন। তখন দেবী বিষ্ণুপ্রিয়া সীতার ন্যায় গৃহত্যাগ করে তাঁর অনুগামিনী হয়ে তাঁকে সেবা করার অনুনতি প্রার্থনা করলেন। কিন্তু নিমাই তাঁকে সন্ন্যাসের কঠিন নিয়ম বোঝাতে লাগলেন। সন্ন্যাসীর নারীমুখ দর্শন মানা
ইত্যাদি।  তিনি আরও বললেন, “আমি যখন চলে যাব তখন মাকে এবং গৃহদেবতার দেখাশুনার ভার তোমার। সেটাই হবে তোমার পরম সাধন। “

এদিকে শ্রীবাস অঙ্গনে কীর্তন হয় প্রতিদিন। কিন্তু ভক্তদের হৃদয়ে যেন কাঁটা ফুটে আছ। নিমাই সন্ন্যাস নেবে ; তাদের ছেড়ে চলে যাবে।  একথা তাঁরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। একদিন তাঁরা সবাই মিলে নিমাইকে বোঝাতে এলেন যাতে তিনি সন্ন্যাস না নেন। ভক্তদের দুঃখে নিমাই অত্যন্ত দুঃখিত হলেন কিন্তু নিজের সংকল্প হতে বিচলিত হলেন না। তাদের তিনি বর্তমান সমাজের অবস্থা ও
নানান তত্ত্ব কথা শুনিয়ে তাঁদের শান্ত করলেন।

দিন যায়। নিমাইয়ের মনে উদ্বেগ,ব্যাকুলতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি হতে লাগল।তবুও বাহিরে তিনি শান্ত ভাব বজায় রেখেছেন। তিনি জানেন ,যদিও
স্নেহময়ী জননী তাঁকে সন্ন্যাস গ্রহনের অনুমতি দিয়েছেন তবুও তাঁর সামনে গৃহত্যাগ করে যাওয়া কখনই সম্ভব হবে না। তাই তাঁকে গোপনে গৃহত্যাগ করতে হবে। আর এরকমই চির কাল হয়ে এসেছে।
কে আর ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সন্ন্যাস নেয়। তাই তিনি
সুযোগের অপেক্ষায় রইলেন। দেখতে দেখতে মাঘ মাস তো শেষ হয়ে এলো। তিনি স্থির করলেন মাঘ মাসের সংক্রান্তির দিন যেদিন সূর্য মকররাশি থেকে কুম্ভরাশিতে গমন করছে সেদিন বড়ই শুভ দিন। সেদিন তিনি গৃহত্যাগ করবেন।

তার আগের দিন রাত্রি থাকতে শয্যাত্যাগ করলেন
নিমাই। শয্যায় নিশ্চিন্দ নিদ্রায় রয়েছেন প্রেমময়ী
স্ত্রী দেবী বিষ্ণুপ্রিয়া। শয়নকক্ষ থেকে বেড়িয়ে এসে হাতে মুখে জল দিয়ে তিনি গৃহদেবতা রঘুনাথের কক্ষের সামনে এসে উপস্থিত হলেন। মৃদু হাততালি দিয়ে বন্ধ দরজার সম্মুখে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করলেন। গৃহত্যাগ ও সন্ন্যাসের অনুমতি প্রার্থনা করে তাঁর ওপর বৃদ্ধা জননী ও যুবতী স্ত্রীর ভার সমর্পন করলেন। তারপর এলেন জননীর শয়নকক্ষের সামনে। বদ্ধ দরজার সামনে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে জননীর উদ্দেশ্যে বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলেন। তাঁর দুচোখের কোল বেয়ে অশ্রুধারা নেমে এল। মনকে দৃঢ় করে চোখের জল মুছে ফেললেন। তারপর গৃহের বাইরে এসে জননী ও জন্মভূমির উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে রাস্তায় নামলেন। পরনে তাঁর একটিমাত্র বস্ত্র – সম্বল হীন। শীতের রাত্রি তখনও ভোর হয়নি তিনি ছুটে চললেন গঙ্গার উদ্দেশ্যে। দুকুল ভাসিয়ে বয়ে চলেছে পতিতপাবনী গঙ্গা। এক মুহুর্তও অপেক্ষা না করে
ঝাপিয়ে পড়লেন নিমাই। সাঁতার কেটে চললেন ওপারের উদ্দেশ্যে।  তাঁর মত বলিষ্ঠ দক্ষ সাঁতারু নদীয়ায় একটিও ছিল না। ভোরের আকাশ পরিষ্কার হয়ে এসেছে। এসে উঠলেন. কাটোয়ায় শ্রীমৎ স্বামী কেশব ভারতীজীর আশ্রমের লক্ষ্যে।

बंगळुरू येथील प्रसिद्ध नारायणा हृदयालय रुग्णालयाचे प्रमुख डॉ

बंगळुरू येथील प्रसिद्ध नारायणा हृदयालय रुग्णालयाचे प्रमुख डॉ. देवी शेट्टी यांच्याशी विप्रो येथील कर्मचार्‍यांनी हृदयविकार आणि त्यासंबंधी घ्यावयाच्या उपायांसंदर्भात केलेले मार्गदर्शन.

प्र. – हृदयाची काळजी कशी घ्यावी?
उ. – १) योग्य खान-पान, कमी कार्बोहाड्रेटस, जास्त प्रोटीन आणि कमी तेल.
२) आठवड्यातून किमान अर्धा तास चालणे, लिफ्टचा वापर न करणे, एका ठिकाणी जास्त वेळ बसू नये.
३) स्मोकिंग बंद करावी.
४) वजन नियंत्रणात ठेवणे.
५) बी. पी. (ब्लडप्रेशर) आणि शुगर नियंत्रणात ठेवणे.
प्र. – नॉनव्हेजमध्ये मासे हृदयासाठी चांगले असतात का?
उ. – नाही
प्र. – एखाद्या तंदरुस्त व्यक्तीला अचानक हृदयविकाराचा झटका का येतो?
उ. याला सायलेंट अटॅक म्हणतात. त्यामुळे वय वर्षे ३० नंतर नियमित चेकअप करावे.
प्र. – हृदयविकार हा अनुवंशिक आजार आहे का?
उ. -नाही..!
प्र. – हृदयावरील तणाव कमी करण्यासाठी काय केले पाहिजे.
उ. – आयुष्याकडे पाहण्याचा दृष्टिकोन बदलायला हवा. प्रत्येक गोष्ट मिळालीच पाहिजे असा अट्टाहास करू नये.
प्र. –  चालणे चांगले की जॉगिंग? जिममध्ये व्यायाम केल्यास हृदयासाठी चांगले असते का?
उ. – चालणे कधीही चांगलेच. जॉगिंंगमुळे शरीराच्या जॉईंट्सना इजा पोहोचू शकते.
प्र. – कमी रक्तदाब असलेल्या व्यक्तींना हृदयविकार होतो का?
उ. – शक्यता फारच कमी.
प्र. – कोलेस्ट्रॉल वाढण्याची प्रक्रिया कधी होते. ३० वर्षांनंतर कोलेस्ट्रॉलची काळजी घ्यावी का?
उ. – शरीरात लहानपणापासूनच कोलेस्ट्रॉल असते.
प्र. – अनियमित खाण्यामुळे हृदयावर काय परिणाम होतो.
उ. – अनियमित खात असा आणि त्यातही जंकफूड असेल तर पचनसंस्थेमध्येच गडबड होते.
प्र. – औषध न घेता कोलेस्ट्रॉल कसा नियंत्रणात आणावा?
उ. – खाण्यावर नियंत्रण, नियमित चालणे आणि आक्रोड खाणे.
प्र. – हृदयासाठी कोणते अन्न चांगले आणि वाईट आहे?
उ. – फळे आणि भाज्या हृदयासाठी चांगल्या. तेल सर्वांत वाईट.
प्र. – कोणते तेल चांगले? सूर्यफूल, शेंगदाणा, सोयाबीन, ऑलिव्ह ऑईल?
उ. – सवर्च तेल वाईट.
प्र. – नियमित वैद्यकीय तपासणी म्हणजे काय?
उ. – वय वर्षे ३० नंतर सहा महिन्यांतून एकदा रक्त तपास करवी, शुगर आणि कोलेस्ट्रॉल, बी.पी. चेक करावा. डॉक्टरांच्या सल्ल्याने ट्रेड मील आणि इको टेस्ट करावी.
प्र. – हृदयविकाराचा झटका आल्यानंतर प्रथमोपचार काय करावेत?
उ. – त्या रुग्णाला तत्काळ झोपवावे, त्याच्या जिभेखालच्या बाजूला ऍस्पिरीन किंवा सॉरबिट्रेट ही गोळी ठेवावी. वेळ न दवडता आणि ऍम्ब्युलन्सची वाट न पाहता जवळच्या हृदयविकार रुग्णालयात तत्काळ घेऊन जावे. बहुतांशी मृत्यू पहिल्या एक तासात होतात.
प्र. – ऍसिडीटी, गॅसेसमुळे छातीत होणारी जळजळ आणि हृदयविकाराचा त्रास हे कसे ओळखावेत?
उ. – डॉक्टरांकडे जाऊन ई.सी.जी. केल्याशिवाय हे समजणे कठीण आहे.
प्र. – तरुणांमध्ये ३० ते ४० वर्षांच्या आत हृदयविकाराचा झटका येण्याचे प्रमाण का वाढले आहे?
उ. – चुकीची लाईफस्टाईल, स्मोकिंग, जंकफूड, व्यायामाचा अभाव यामुळे अमेरिका आणि युरोपपेक्षा तीनपट जास्तm हृदयविकाराचे रुग्ण India  आहेत.
प्र. – अनेकांचे जीवनमान दगदगीचे आहे. अनेकांना रात्रपाळी करावी लागते. त्याचा परिणाम हृदयावर होतो का?
उ. – जेव्हा तुम्ही तरुण असता तेव्हा निसर्ग रक्षण करीत असतो. परंतु जसजसे वय वाढत जाते, तसा शरीरराचाही आपण आदर केला पाहिजे. यात बदल हवा.
प्र. – जवळच्या नातेवाईकांमध्ये लग्न केल्यामुळे जन्मलेल्या मुलाला हृदयाचा काही आजार असू शकतो का?
उ. – होय! काही प्रमाणात मुलांमध्ये ही लक्षणे दिसू शकतात.
प्र. – उच्च रक्तदाब म्हणजे बी. पी. (ब्लडप्रेशर) नियंत्रित ठेवण्यासाठी घेण्यात येणार्‍या औषधांचे साईड इफेक्ट दिसतात का?
उ. – होय! अनेक औषधांचे साईड इफेक्ट असतात. मात्र, सध्या अनेक सुधारणा झाल्यामुळे आधुनिक औषधे अधिक चांगली आहेत.
प्र. – जास्त चहा, कॉफी घेतल्यामुळे हार्टऍटॅक येतो का?
उ. – नाही!
प्र. – अस्थमाचा आजार आणि हृदयविकाराचा काही संबंध आहे का?
उ. – नाही!
प्र. – केळी खाल्ल्यामुळे बी. पी. नियंत्रणात येतो का?
उ. – नाही!
प्र. – जंकफूड म्हणजे काय?
उ. – फ्राईड केलेेले मॅकडोनल्डस आणि तत्सम ठिकाणी बनविले जाणारे अन्न, समोसा आणि मसाला डोसाही.
प्र. – नियमित चालण्यासाठी वेळ मिळाला नाही आणि एकाच जागी खूप वेळ बसून काम करावे लागत असेल तर काय करावे?
उ. – एकाच जागी तासाभरापेक्षा जास्त वेळ बसू नये. जागेवरच थोडा वेळ उभे राहावे किंवा एका खुर्चीवरून दुसर्‍या खुर्चीवर बसले तरीही चालते, पण आठवड्यातून पाच दिवस किमान अर्धा तास चालल्यास उत्तमच!
टीप : मित्रांनो, आजपर्यंत आपण विनोद, वात्रटिका, कविता, शेरोशायरी तसेच काही पांचट विनोद वाचून हसून मजा केली;
परंतु आपल्या स्वत:च्या शरीराबद्दल आपण कधीच विचार केला नाही.
तरी हा मेसेज वाचताना तुमचे पाच ते दहा मिनिटे नक्कीच गेले असतील.
परंतु हा मेसेज वाचल्यामुळे माझ्या मित्रांनाच काय, सर्वांनाच याचा फायदा होईल…..
*कारण माझ्या या ग्रुपच्या सर्व मित्रांचे जीवन अमूल्य आहे म्हणून ही पोस्ट केलीय!!*

মাস্টার ও প্রসন্ন আসিয়া দেখিলেন ঠাকুর তাঁহার ঘরে দক্ষিণদিকে দালানে রহিয়াছেন। তাঁহারা আসিয়া তাঁহার চরণ বন্দনা করিলেন।

“তব কথামৃতং তপ্তজীবনং, কবিভিরীড়িতং কল্মষাপহম্‌ ৷
শ্রবণমঙ্গলং শ্রীমদাততং, ভুবি গৃণন্তি যে ভূরিদা জনাঃ ৷৷”
কাছাকাছি দিন থেকে-
দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও ‘দেবী চৌধুরাণী’ পাঠ

প্রথম পরিচ্ছেদ
১৮৮৪, ২৭শে ডিসেম্বর

মাস্টার, প্রসন্ন, কেদার, রাম, নিত্যগোপাল, তারক, সুরেশ প্রভৃতি
আজ শনিবার, ২৭শে ডিসেম্বর, ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দ, (১৩ই পৌষ) শুক্লা সপ্তমী তিথি। যীশুখ্রীষ্টের জন্ম উপলক্ষে ভক্তদের অবসর হইয়াছে। অনেকে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখিতে আসিয়াছেন। সকালেই অনেকে উপস্থিত হইয়াছেন। মাস্টার ও প্রসন্ন আসিয়া দেখিলেন ঠাকুর তাঁহার ঘরে দক্ষিণদিকে দালানে রহিয়াছেন। তাঁহারা আসিয়া তাঁহার চরণ বন্দনা করিলেন।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে শ্রীযুক্ত সারদাপ্রসন্ন এই প্রথম দর্শন করেন।
ঠাকুর মাস্টারকে বললেন, “কই, বঙ্কিমকে আনলে না?”
বঙ্কিম একটি স্কুলের ছেলে। ঠাকুর বাগবাজারে তাঁহাকে দেখিয়াছিলেন। দূর থেকে দেখিয়াই বলিয়াছিলেন, ছেলেটি ভাল।
ভক্তেরা অনেকেই আসিয়াছেন। কেদার, রাম, নিত্যগোপাল, তারক, সুরেন্দ্র (মিত্র) প্রভৃতি ও ছোকরা ভক্তেরা অনেকে উপস্থিত।
কিয়ৎক্ষণ পরে ঠাকুর ভক্তসঙ্গে পঞ্চবটীতে গিয়া বসিয়াছেন। ভক্তেরা চতুর্দিকে ঘেরিয়া রহিয়াছেন, কেহ বসিয়া — কেহ দাঁড়াইয়া। ঠাকুর পঞ্চবটীমূলে ইষ্টকনির্মিত চাতালের উপর বসিয়া আছেন। দক্ষিণ-পশ্চমদিকে মুখ করিয়া বসিয়া আছেন। সহাস্যে মাস্টারকে বলিলেন, “বইখানা কি এনেছ?”
মাস্টার — আজ্ঞা, হাঁ।
শ্রীরামকৃষ্ণ — পড়ে আমায় একটু একটু শোনাও দেখি।
[শ্রীরামকৃষ্ণ ও রাজার কর্তব্য ]
ভক্তেরা আগ্রহের সহিত দেখিতেছেন কি পুস্তক। পুস্তকের নাম “দেবী চৌধুরানী”। ঠাকুর শুনিয়াছেন, দেবী চৌধুরানীতে নিষ্কামকর্মের কথা আছে। লেখক শ্রীযুক্ত বঙ্কিমের সুখ্যাতিও শুনিয়াছিলেন। পুস্তকে তিনি কি লিখিয়াছেন, তাহা শুনিলে তাঁহার মনের অবস্থা বুঝিতে পারিবেন। মাস্টার বলিলেন, “মেয়েটি ডাকাতের হাতে পড়িয়াছিল। মেয়েটির নাম প্রফুল্ল, পরে হল দেবী চৌধুরানী। যে ডাকাতটির হাতে মেয়েটি পড়েছিল, তার নাম ভবানী পাঠক। ডাকাতটি বড় ভাল। সেই প্রফুল্লকে অনেক সাধন-ভজন করিয়েছিল। আর কিরকম করে নিষ্কামকর্ম করতে হয়, তাই শিখিয়েছিল। ডাকাতটি দুষ্ট লোকেদের কাছ থেকে টাকা-কড়ি কেড়ে এনে গরিব-দুঃখীদের খাওয়াত — তাদের দান করত। প্রফুল্লকে বলেছিল, আমি দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন করি।”
শ্রীরামকৃষ্ণ — ও তো রাজার কর্তব্য।
মাস্টার — আর-এক জায়গায় ভক্তির কথা আছে। ভবানী ঠাকুর প্রফুল্লর কাছে থাকবার জন্য একটি মেয়েকে পাঠিয়ে দিছলেন। তার নাম নিশি। সে মেয়েটি বড় ভক্তিমতী। সে বলত, শ্রীকৃষ্ণ আমার স্বামী। প্রফুল্লর বিয়ে হয়েছিল। প্রফুল্লর বাপ ছিল না, মা ছিল। মিছে একটা বদনাম তুলে পাড়ার লোকে ওদের একঘরে করে দিছল। তাই শ্বশুর প্রফুল্লকে বাড়িতে নিয়ে যায় নাই। ছেলের আরও দুটি বিয়ে দিছল। প্রফুল্লর কিন্তু স্বামীর উপর বড় ভালবাসা ছিল। এইখানটা শুনলে বেশ বুঝতে পারা যাবে —
“নিশি — আমি তাঁহার (ভবানী ঠাকুরের) কন্যা, তিনি আমার পিতা। তিনিও আমাকে একপ্রকার সম্প্রদান করিয়াছেন।
প্রফুল্ল — একপ্রকার কি?
নিশি — সর্বস্ব শ্রীকৃষ্ণে।
প্রফুল্ল — সে কিরকম?
নিশি — রূপ, যৌবণ, প্রাণ।
প্রফুল্ল — তিনিই তোমার স্বামী?
নিশি — হাঁ — কেননা, যিনি সম্পূর্ণরূপে আমাতে অধিকারী, তিনিই আমার স্বামী।
প্রফুল্ল দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিল, ‘বলিতে পারি না। কখনও স্বামী দেখ নাই, তাই বলিতেছ — স্বামী দেখিলে কখনও শ্রীকৃষ্ণে মন উঠিত না।’
মূর্খ ব্রজেশ্বর (প্রফুল্লের স্বামী) এত জানিত না!
বয়স্যা বলিল, ‘শ্রীকৃষ্ণে সকল মেয়েরই মন উঠিতে পারে; কেন না, তাঁর রূপ অনন্ত, যৌবন অনন্ত, ঐশ্বর্য অনন্ত।’
এ-যুবতী ভবানী ঠাকুরের চেলা, কিন্তু প্রফুল্ল নিরক্ষর — এ-কথার উত্তর দিতে পারিল না। হিন্দুধর্ম প্রণেতারা উত্তর জানিতেন। ঈশ্বর অনন্ত জানি। কিন্তু অনন্তকে ক্ষুদ্র হৃদয় পিঞ্জরে পুরিতে পারি না, কিন্তু সান্তকে পারি। তাই অনন্ত জগদীশ্বর হিন্দুর হৃৎপিঞ্জরে সান্ত শ্রীকৃষ্ণ। স্বামী আরও পরিষ্কার রূপে সান্ত। এইজন্য প্রেম পবিত্র হইলে স্বামী ঈশ্বরে আরোহণের প্রথম সোপান। তাই হিন্দু-মেয়ের পতিই দেবতা। অন্য সব সমাজ, হিন্দু সমাজের কাছে এ-অংশে নিকৃষ্ট।
প্রফুল্ল মূর্খ মেয়ে, কিছু বুঝিতে পারিল না। বলিল, ‘আমি অত কথা ভাই বুঝিতে পারি না। তোমার নামটি কি, এখনও তো বলিলে না?’
বয়স্যা বলিল, ভবানী ঠাকুর নাম রাখিয়াছিলেন নিশি। আমি দিবার বহিন নিশি। দিবাকে একদিন আলাপ করিতে লইয়া আসিব। কিন্তু যা বলিতেছিলাম শোন। ঈশ্বরই পরম স্বামী। স্ত্রীলোকের পতিই দেবতা। শ্রীকৃষ্ণ সকলের দেবতা। দুটো দেবতা কেন ভাই? দুই ঈশ্বর? এ ক্ষুদ্র প্রাণের ক্ষুদ্র ভক্তিটুকুকে দুই ভাগ করিলে কতটুকু থাকে?
প্রফুল্ল — দূর! মেয়েমানুষের ভক্তির কি শেষ আছে?
নিশি — মেয়েমানুষের ভালবাসার শেষ নাই। ভক্তি এক, ভালবাসা আর।”
[আগে ঈশ্বরসাধন — না আগে লেখাপড়া ]
মাস্টার — ভবানী ঠাকুর প্রফুল্লকে সাধন আরম্ভ করালেন।
“প্রথম বৎসর ভবানী ঠাকুর প্রফুল্লের বাড়িতে কোন পুরুষকে যাইতে দিতেন না বা তাহাকে বাড়ির বাহিরে কোন পুরুষের সঙ্গে আলাপ করিতে দিতেন না। দ্বিতীয় বৎসর আলাপ পক্ষে নিষেধ রহিত করিলেন। কিন্তু তাহার বাড়িতে কোন পুরুষকে যাইতে দিতেন না। পরে তৃতীয় বৎসরে যখন প্রফুল্ল মাথা মুড়াইল, তখন ভবানী ঠাকুর বাছা বাছা শিষ্য সঙ্গে লইয়া প্রফুল্লের নিকটে যাইতেন — প্রফুল্ল নেড়া মাথায় অবনত মুখে তাহাদের সঙ্গে শাস্ত্রীয় আলাপ করিত।
“তারপর প্রফুল্লের বিদ্যাশিক্ষা আরম্ভ। ব্যাকরণ পড়া হল, রঘু, কুমার, নৈষধ, শকুন্তলা। একটু সাংখ্য, একটু বেদান্ত, একটু ন্যায়।”
শ্রীরামকৃষ্ণ — এর মানে কি জানো? না পড়লে শুনলে জ্ঞান হয় না। যে লিখেছে, এ-সব লোকের এই মত। এরা ভাবে, আগে লেখাপড়া, তারপর ঈশ্বর; ঈশ্বরকে জানতে হলে লেখাপড়া চাই। কিন্তু যদু মল্লিকের সঙ্গে যদি আলাপ করতে হয় তাহলে তার কখানা বাড়ি, কত টাকা, কত কোম্পানির কাগজ — এ-সব আগে আমার অত খবরে কাজ কি? জো-সো করে — স্তব করেই হোক, দ্বারবানদের ধাক্কা খেয়েই হোক, কোন মতে বাড়ির ভিতর ঢুকে যদু মল্লিকের সঙ্গে আলাপ করতে হয়। আর যদি টাকা-কড়ি ঐশ্বর্যের খবর জানতে ইচ্ছা হয়, তখন যদু মল্লিককে জিজ্ঞাসা কল্লেই হয়ে যাবে! খুব সহজে হয়ে যাবে। আগে রাম, তারপরে রামের ঐশ্বর্য — জগৎ। তাই বাল্মীকি ‘মরা’ মন্ত্র জপ করেছিলেন। ‘ম’ অর্থাৎ ঈশ্বর, তারপর ‘রা’ অর্থাৎ জগৎ — তার ঐশ্বর্য!
ভক্তেরা অবাক হইয়া ঠাকুরের কথামৃত পান করিতেছেন।
“ওঁ নিরঞ্জনং নিত্যমনন্তরূপং ভক্তানুকম্পাধৃতবিগ্রহং বৈ।
ঈশাবতারং পরমেশমীড্যং তং রামকৃষ্ণং শিরসা নমামি।।”

Swami Viveknanda. [কর্মজীবনে বেদান্ত] "আমরা অজ্ঞানবশতঃ মনে করিতেছি আমরা যেন বদ্ধ, আর কখন কখন সাহায্যের জন্য চীৎকার ও ক্রন্দন করিতেছি।

[কর্মজীবনে বেদান্ত]°•°•°•°
“আমরা অজ্ঞানবশতঃ মনে করিতেছি আমরা যেন বদ্ধ,
আর কখন কখন সাহায্যের জন্য চীৎকার ও ক্রন্দন করিতেছি।
কিন্তু বাহির হইতে কোন সাহায্য পাওয়া যায় না, সাহায্য পাওয়া যায় ভিতর হইতে।
জগতের সকল দেবতার নিকট উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করিতে পারো।
আমি অনেক বৎসর ধরিয়া এইরূপ ক্রন্দন করিয়াছি;
অবশেষ দেখিলাম, সাহায্য পাইয়াছি।
কিন্তু এই সাহায্য ভিতর হইতে আসিল , আর ভুলবশতঃ এতদিন যাহা করিতেছিলাম, তাহা নষ্ট করিতে হইল।
ইহাই একমাত্র উপায়।
নিজের চারিদিকে যে-জাল বিস্তার করিয়াছিলাম, তাহা আমাকেই ছিন্ন করিতে হইবে, আর তাহা করিবার শক্তিও আমার ভিতরে রহিয়াছে।
এ-বিষয়ে আমি নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারি যে, আমার জীবনের ভালমন্দ কোন ভাবই বৃথা যায় নাই—আমি সেই অতীত শুভাশুভ উভয়বিধ কর্মেরই সমষ্টি-স্বরূপ।
আমি জীবনে অনেক ভুল করিয়াছি, কিন্তু ঐগুলির একটিও যদি বাদ পড়িত, তাহা হইলে আমি আজ যাহা হইয়াছি, তাহা হইতাম না।
আমার জীবনে আমি বেশ সন্তুষ্ট। আমার এ-কথা বলিবার উদ্দেশ্য ইহা নয় যে, তোমরা বাড়ি গিয়া নানাপ্রকার অন্যায় কাজ করিতে থাকো, আমার কথা এইরূপে ভুল বুঝিও না।
আমার বলিবার উদ্দেশ্য এই, কতকগুলি ভুলচুক হইয়া গিয়াছে বলিয়া একেবারে বসিয়া পড়িও না, কিন্তু জানিও পরিণামে তাহাদের ফল শুভই হইবে।
অন্যরূপ হইতে পারে না, কারণ মঙ্গল ও পবিত্রতা আমাদের প্রকৃতিসিদ্ধ ধর্ম, আর কোন উপায়েই সেই প্রকৃতির অন্যথা হয় না। আমাদের যথার্থ স্বরূপ সর্বদা একই-প্রকার।”
           —Swami Vivekananda
[ ভক্তিযোগ প্রসঙ্গে ]•••••
  ‘ভগবান্,
     তুমি ইহা রক্ষা কর এবং উহা আমাকে দাও;
ভগবান্,
আমি এই ক্ষুদ্র প্রার্থনা নিবেদন করিতেছি,
পরিবর্তে তুমি আমার দৈনন্দিন জীবনের অভাব পূরণ করিয়া দাও;
হে ভগবান্, আমার মাথা-ধরা সারাইয়া দাও ইত্যাদি’
 
        —এইরূপ প্রার্থনা ভক্তি নয়।
এগুলি ধর্মের নিম্নতম সোপান, কর্মের নিম্নতম রূপ।
যদি কোন মানুষ দেহকে তৃপ্ত করিতে––দেহের ক্ষুধা মিটাইতেই সমস্ত মানসিক শক্তি নিয়োগ করে, তাহা হইলে তাহার সহিত পশুর কি প্রভেদ?
ভক্তি উচ্চতর বস্তু, স্বর্গৈষণা অপেক্ষাও উচ্চতর।
স্বর্গ বলিতে খুব বেশী মাত্রায় ভোগ করিবার স্থান বুঝায়। তাহা কি করিয়া ভগবান্ হইতে পারে?
একমাত্র মূঢ় ব্যক্তিরাই ইন্দ্রিয়-ভোগের পশ্চাতে ধাবিত হয়। ইন্দ্রিয়-কেন্দ্রিক জীবন যাপন করা সহজ।
পান-ভোজন-ক্রিয়ারূপ পুরাতন অভ্যস্ত পথে ভ্রমণ করা কঠিন নয়। কিন্তু আধুনিক দার্শনিকগণ বলিতে চান, ‘এই অনায়াস-সাধ্য ভাবগুলি গ্রহণ কর এবং সেগুলির উপরই ধর্মের ছাপ দিয়া দাও।’
এই ধরনের মতবাদ বিপজ্জনক।
ইন্দ্রিয়-ভোগে মৃত্যু।
আধ্যাত্মিক স্তরে যে জীবন, তাহাই যথার্থ জীবন। অন্য ভোগভূমির জীবন মৃত্যুরই নামান্তর।
আমাদের এই জাগতিক জীবনকে একটি শব্দে বর্ণনা করা যাইতে পারে, উহা ‘অভ্যাসের ব্যায়ামাগার’।
যথার্থ জীবন উপভোগ করিতে হইলে আমাদিগকে ইহার ঊর্ধ্বে উঠিতে হইবে।
যতক্ষণ ছোঁয়াছুঁয়ি তোমার ধর্ম, এবং রান্নার হাঁড়ি তোমার ইষ্ট, ততক্ষণ তুমি আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ করিতে পারিবে না।
ধর্মে ধর্মে যে দ্বন্দ্ব—তাহা অর্থহীন, কেবল কথার সংঘর্ষ মাত্র।
প্রত্যেকেই ভাবে, ‘ইহা আমার মৌলিক চিন্তা’; এবং সে চায়—সবকিছুই তাহার মতানুসারে চলুক। এই ভাবেই ধর্মবিরোধের সূত্রপাত।
অপরকে সমালোচনা করিবার সময় আমরা সর্বদা নির্বোধের মত নিজের চরিত্রের একটি মাত্র বিশেষ উজ্জ্বল দিক্‌কেই সমগ্র জীবন বলিয়া ধরিয়া লই এবং উহার সহিত অপরের চরিত্রের অনুজ্জ্বল দিক্‌টি তুলনা করি।
ব্যক্তিগত চরিত্র বিচার করিবার সময় আমরা এ-ভাবে ভুল করিয়া বসি।
           —–Swami Viveknanda

রামকৃষ্ণসঙ্ঘের মত বিশ্বখ্যাত একটি প্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন অন্তরালবর্তিনী ও নীরব সর্বময়ী নেত্রী ।

নেপথ্যচারিণী ”শ্রীমা ”

********************

রামকৃষ্ণসঙ্ঘের মত বিশ্বখ্যাত একটি প্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন অন্তরালবর্তিনী
ও নীরব সর্বময়ী নেত্রী ।
রামকৃষ্ণ – বিবেকানন্দ প্রমুখের দ্বারা জীবনকালে পূজিতা ও বন্দিতা হয়েও কখনও তাঁর মধ্যে কোনও অহঙ্কারের প্রকাশ দেখা যায় নি ।
জীবন কালে রামকৃষ্ণ সংঘে তিনি ছিলেন সর্বদাই নেপথ্যচারিণী , কিন্তু সর্বত্রই তাঁর উপস্থিতি ছিল অপ্রতিরোধ্য ভাবে বাগ্ময় ।
এখানেই তাঁর অসাধারণ ব্যাক্তিত্বের রহস্য ।
তিনি এইভাবেই আত্মবিলয়ের মন্ত্রে হয়েছিলেন স্বয়াংসিদ্ধা । মা এর এই আত্মবিলয়ের শক্তি দেখে শিহরিত হয়েছিলেন নিবেদিতা ।
জীবন রহস্যের মূলকথা এক সন্তান কে ব্যক্ত করে মা বলেছিলেন ; ” ঝড়ের এঁটোপাত হয়ে থাক — তোমার অস্তিত্ব থাকবে , ব্যক্তিত্ব থাকবে না , তা হলে তোমার সব জ্বালা যাবে । ”
মেয়েদের জন্য বিশেষ করে মা বলেছিলেনঃ ” সন্তোষের সমান ধন নেই , আর সহ্যের সমান গুন নেই । ” ” শ , ষ ,স — তিনটে স । যে সয় সেই রয় ”
এই বাক্য গুলি দেখে আমরা যেন না মনে করি , মেয়েদের অবদমিত করে রাখতে চেয়েছেন তিনি। নারীশিক্ষা ও নারীর স্বাধীন চেতনা ও চিন্তার ওপর তাঁর প্রবল অনুরাগ ছিল ।
মেয়েদের শিক্ষা ও আত্মনির্ভরশীলতার তিনি ছিলেন পূর্ন সমর্থক । সমর্থন শুধু মুখেই ছিলনা , অনেক মানুষের কাছে সমালোচনার স্বীকার হয়েও তিনি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী দের নিবেদিতার বিদ্যালয়ে শিক্ষার ব্যাবস্থা করেন । সে কালের পরিপ্রেক্ষিতে তা দুঃসাহসের পরিচায়ক ছিল । তিনি কিন্তু তাঁর দৃঢ়তায় অবিচল থেকেছিলেন । আবার পতির প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততায় নিজেকে পূর্ণ ভাবে উজাড় করে দিলেও তিনি ছিলেন একই সঙ্গে আসাধারণ স্বাধীন চিন্তার অধিকারিণী এবং অসাধারণ মর্যাদাময়ী । ।

পূর্ণাত্মানন্দজী

Design a site like this with WordPress.com
Get started